ভোমরা বন্দর : ফল ও মাছের মধ্যে আসছে মাদক: পকেট ভারী হচ্ছে কাস্টমস কর্মকর্তার


প্রকাশিত : জুলাই ২২, ২০১২ ||

এম জিললুর রহমান : ভোমরা বন্দর ইমিগ্রেশনের দুই রাজস্ব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধে ওজনে ফাঁকি, এক এলসিতে দুই তিন প্রকার পণ্য ও এক পণ্যের স্থানে ভিন্ন ভিন্ন পণ্য আমদানিসহ কুরিয়ারের নামে দৈনিক লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। এতে সরকার প্রতিদিন কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ঘটনাকে ঘিরে বন্দরের ব্যবসায়ী ও কাস্টমসের কিছু কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। বন্দরের সিএণ্ডএফ এসোসিয়েশনের কতিপয় নেতাকে ম্যানেজ করে আখের গুছিয়ে চলেছেন তারা। আলোচিত ওই রাজস্ব কর্মকর্তাদের নাম মঞ্জুরুল হক ও মবিনুল ইসলাম খসরু।

প্রাপ্ততথ্যে জানাগেছে, ভোমরা বন্দর দিয়ে বর্তমানে বিভিন্ন প্রকার মাছ আমদানি করা হচ্ছে। প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারত থেকে আসা এক কেজি রুই মাছ আমদানি করা হলে সরকার ২৬ টাকা রাজস্ব পায়। একই সাথে পাঙ্গাস বোয়াল ফলুই ও পাবদা মাছ আমদানি করা হলে রাজস্ব আসে গড়ে ৩০ টাকা। অন্ধপ্রদেশ থেকে আসা প্রতি কাঠের বাক্সে বা পেটিতে ৪২ কেজি মাছ থাকে, সঙ্গে বরফ দেওয়া থাকে আরও ১০ থেকে ১৫ কেজি। অভিযোগ রয়েছে, পেটি প্রতি রাজস্ব নেওয়া হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ কেজি মাছের। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী ভারত থেকে যে মাছ পেটি বা বাক্স হচ্ছে সেই বাক্সে মাছ থাকে ৬০ কেজি এবং বরফ ২০ কেজি। কিন্তু ৬০ কেজি মাছের স্থানে রাজস্ব নেওয়া হচ্ছে মাত্র ২০ থেকে ২৫ কেজির। বাকিটা বরফ দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বন্দরের ব্যবসায়ীরা জানান, ট্রাক প্রতি কাস্টমস অফিসকে ব্যবসায়ীদের দিতে হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। আর এ টাকা পকেটস্থ করছেন কাস্টমসের ওই কর্মকর্তারা।

সরেজমিনে আরও জানাগেছে, বর্তমানে আম আপেল আঙ্গুর বেদানা কমলা মাল্টাসহ বেশ কিছু ফল আসছে। আরও আসছে টমেটো। এরমধ্যে ফলগুলোর গড় রাজস্ব কেজি প্রতি ৩৭ থেকে ৪০ টাকা। আর টমেটোর কেজি প্রতি রাজস্ব ২২ টাকা। সাম্প্রতিক সময়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কড়াকড়ি আরোপ করায় আমদানিকৃত ফলের মধ্যে নামমাত্র ২/৫ মন টমেটো আমদানি করে বিপুল পরিমান ট্রাক ভর্তি ফল দেখানো হচ্ছে টমেটো হিসেবে। এতে করে বিপুল পরিমান রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। অভিযোগ এখানেই শেষ নয়, এসমস্ত বৈধ আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে সুযোগ হলেই আসছে ফেনসিডিল। ব্যবসায়ী এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, প্রতিদিন বৈধ কাগজপত্রের অন্তরালে এবং বৈধ পথে যেহারে অবৈধ পণ্য ও ফেনসিডিল সরাসরি বন্দর দিয়ে আসছে তা দেখে মনে হয়, যেন সরকার ফেনসিডিল আমদানি বৈধ ঘোষণা করেছে। যার নেই কোন কাগজপত্র, নেই কোন প্রমাণ। শুধু মাত্র দেখা ও শোনা ছাড়া আর কিছুই করণীয় নেই অন্যান্য বৈধ ব্যবসায়ীদের। ভোমরা বন্দরের ভাড়া লাইসেন্সের দুই ব্যবসায়ী মাছের অন্তরালে ফেনসিডিল আমদানি করে চলেছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি। এছাড়াও ফল ও মাছের ট্রাকে আসছে ল্যাগেজ নামক বিভিন্ন উন্নতমানে পোষাক। যা কোন রাজস্বের আওতায় আসছে না। শুধুমাত্র যোগসাজশ করেই পকেট ভরছে কাস্টমসের দুই কর্মকর্তারা। অভিযোগ রয়েছে, ভোমরা বন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা মবিনুল ইসলাম খসরু কয়েক মাস আগে যোগদান করেছেন। তিনি যোগদানের সাথে সাথে সাতক্ষীরা শহর উপকণ্ঠের এক বিলাসবহুল বাগান বাড়িতে সন্ধ্যা মালতি নামের রেস্ট হাউজের এক ফ্লোর মাসিক ৩০ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়ে থাকতেন। একটি প্রাইভেট কার মাসিক ৪০ হাজার টাকা এবং চালকের ও গাড়ির সার্বিক খরচ ওই রাজস্ব কর্মকর্তার এমন চুক্তি ভিত্তিক ভাড়া নিয়ে চলতেন। সেখানে সন্ধ্যার পরপরই রমনিদের আনাগোনাও ছিল। তিনি ভোরেই ভোমরা যেতেন এবং সন্ধ্যার পরপরই বাগানবাড়ির ওই রেস্ট হাউজে চলে আসতেন। গাড়ি বাড়ি আর নিজের খরচ দিয়েই মাসিক খরচ ছিল কয়েক লাখ টাকা। এসব বিষয় নিয়ে ইতোপূর্বে সাংবাদিকরা খোঁজ খবর নেওয়ায় তিনি বাগান বাড়ির রেস্ট হাউজ ছেড়ে এখন ভোমরা বন্দরেই অবস্থান করছেন। বন্দরের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ইতিপূর্বের রাজস্ব কর্মকর্তারা যা করেছেন তা এখন প্রকাশ পাচ্ছে, আর এখন যারা দায়িত্বে আছেন তারা কি করছেন তা মিলবে যখন এখান থেকে চলে যাবে। তার মাসিক বেতন আর ব্যয়ের অসংগতি নিয়ে বন্দর অভ্যন্তরে রয়েছে নানা সমালোচনা।

এদিকে বর্তমান রাজস্ব কর্মকর্তা মঞ্জুরুল হকে সাথে এসমস্ত বিষয়ে কথা বললে তিনি কোন মন্তব্য করেন নি। এছাড়াও বিভিন্ন পণ্যের কেজি প্রতি কত টাকা রাজস্ব জানতে চাইলে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে এড়িয়ে যান।