গোলাখালীর চিংড়িঘেরের বেড়িতে অবস্থান নেয়া বাঘটি মৃত্যুর প্রহর গুণছে


প্রকাশিত : জুলাই ২২, ২০১২ ||

সামিউর মনির: সুন্দরবন ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসা অভুক্ত আর অসুস্থ রয়েল বেঙ্গল টাইগারটি মৃত্যুর প্রহর গুনছে। দৃশ্যত শিকার ধরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা বিশালাকৃতির এ পুরুষ বাঘটি গতকাল সকাল থেকে শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন লাগোয়া গোলাখালী গ্রামের মন্টু মিয়ার চিংড়িঘেরের রাস্তায় অবস্থান নিয়ে আছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার সকালে বাঘটি সুন্দরবন হতে বের হয়ে আসার পর থেকে গোলাখালী এলাকার বিভিন্ন চিংড়িঘেরের রাস্তায় রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাঘুরি করছে। বাঘটিকে সরাসরি পর্যবেক্ষণকারীরা ধারণা করছে সুন্দরবনের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগারটি যেকোন মুহুর্তে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারে।

এছাড়া ক্রমেই চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা বাঘটির জন্য খাদ্য সরবরাহ এবং তাকে উদ্ধারপূর্বক চিকিৎসা প্রদানের ব্যাপারে বনবিভাগ বা ডব্লিউটিপি কোন পক্ষেরই গতকাল পর্যন্ত তৎপর হতে দেখা যায়নি।

এদিকে টানা তিনদিন ধরে সুন্দরবন ছেড়ে বাঘটির লোকালয়ের খুব কাছে অবস্থান নেওয়ার ঘটনায় গোলাখালীসহ আশপাশের গ্রামজুড়ে তীব্র বাঘ আতংক বিরাজ করছে। সরেজিমেন সুন্দরবন সংলগ্ন গোলাখালী গ্রামে যেয়ে দেখা গেছে, সুন্দরবন ছেড়ে আসা বাঘটি গতকাল সকাল সাড়ে ছ’টা থেকে মন্টু মিয়ার চিংড়িঘেরের রাস্তার উপর শুয়ে আছে। গ্রামবাসী আর বনবিভাগের ব্যাপক ডাক-চিৎকার কিংবা বাঁজির শব্দ তাকে যেন ষ্পর্শ করছে না।

বেলা বারটা পর্যন্ত একই জায়গায় অবস্থানের পর বাঘটি কয়েক মুহুর্তের জন্য দশ বার হাত দূরের একটি কাঁকড়া গাছের আড়ালে চলে গেলেও পরক্ষণে সে আবারও রাস্তার উপর চলে আসে। এক পর্যায়ে সাড়ে বারটার দিকে বনবিভাগ ও বিজিবি অধিনায়কের নেতৃত্বে কিছু গ্রামবাসী বাঘটিকে পর্যব্ক্ষেণ করতে তার কাছাকাছি এগিয়ে গেলে সে দুর্বল শরীর নিয়ে কোন রকমে সামনে ত্রিশ চল্লিশ গজ হেটে যেয়ে আবারও রাস্তার উপর শুয়ে পড়ে।

বাঘটি গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সুন্দরবন ছেড়ে লোকলয়ে অবস্থান করছে দাবি করে স্থানীয়রা জানিয়েছে, পনের দিন ধরে একই বাঘ ঐ এলাকায় আসা যাওয়া করছে। বাঘটি অসুস্থ বলে বনবিভাগ ও ডব্লিউটিপি কর্তৃপক্ষকে বার বার বলা হলেও তারা বাঘটির চিকিৎসার কোন উদ্যোগ নেয়নি।

গোলাখালী গ্রামের হরিপদ সরকার জানান, গত দশ বার দিন পূর্বে বাঘটিকে বনের মধ্যে ফেরত পাঠানো হলেও সে আবারও লোকালয়ে ফিরে এসেছে। তিনি দাবি করেন বাঘটি বনের মধ্যে খাবার না পেয়ে বার বার লোকালয়ে আসছে।

একই গ্রামের উপেন গাইন জানান, গত ৯ জুলাই লোকালয়ে আসার পর বাঘটির শরীর স্বাস্থ্য ভাল মনে হলেও বর্তমানে তাকে খুবই ভগ্ন স্বাস্থ্যের মনে হয়েছে। চলাফেরাতে বাঘটির কষ্ট হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। একই গ্রামের জোবেদা বেগম জানান, জীবনে অনেক বাঘ দেখেছি, দুটো সন্তান বাঘের পেটে দিছি, কিন্তু এতো দুর্বল বাঘ এর আগে দেখিনি। কালিঞ্চি গ্রামের কিরণ মন্ডল, ইউনুস আলীসহ অন্যরা জানান, দিনে দিনে বাঘটি চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। সে খাবার না পেয়ে ক্রমেই মৃত্যুর দিকে এগুচ্ছে বলে তারা মন্তব্য করেন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত বনবিভাগের কৈখালী স্টেশন অফিসার আলাউদ্দীন জানান, বাঘটিকে অসুস্থ মনে হওয়ার পরপরই বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। তারপরও কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় টানা তিনদিন ধরে বাঘটি অভুক্ত থাকায় ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। তিনি আরও জানান, যে কোন ধরনের দুর্ঘটনা রোধে গ্রামবাসীকে নিয়ে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বাঘটিকে পাহারা দিয়ে রাখা হয়েছে। তবে বাঘটি যেকোন মুহুর্তে মারা যেতে পারে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি হ্যাঁ সূচক জবাব দেন।

উল্লেখ্য, গত ৮ জুলাই প্রায় ১০/১১ ফুট লম্বা বিশালাকৃতির বাঘটি সুন্দরবন ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসে। এসময় বনবিভাগ ও গ্রামবাসীরা প্রায় চল্লিশ ঘন্টা চেষ্টার পর তাকে বনের ভিতরে পাঠাতে সক্ষম হয়। বাঘটির চলাফেরা ও আচরণ দেখে সে সময় থেকে তাকে অসুস্থ বলে দাবি করা হলেও বন বিভাগ বা ডব্লিউটিপি’র কেউই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। এক পর্যায়ে অভুক্ত অসুস্থ ঐ বাঘটির জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসার ছাগল সরবরাহের পরামর্শ দিলেও ডব্লিউটিপি’র পক্ষ থেকে নিষেধ করা হয়।

এদিকে গতকাল বেলা বারটার দিকে নীলডুমুরস্থ ৩৪ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল রফিকুল ইসলাম, টুআইসি ফারুক ইয়া আজম ও ক্যাপ্টেন শরীফকে নিয়ে বাঘটির অবস্থানস্থল পরির্দশন করেন। ৩৪ বিজিবির সিও জানান, বাঘটিকে  দেখে আপাত দৃষ্টিতে বেশ অসুস্থ মনে হয়েছে। তিনি আরও জানান, বিষয়টি বনবিভাগের রেঞ্জ অফিসারকে অবহিত করে দ্রুত সময়ের মধ্যে বাঘটিকে বাঁচাতে ট্যাংকুলাইজ করার পর চিকিৎসা দেওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।