কলারোয়ায় খাটালের নামে রাজস্ব ফাঁকির মহোৎসব


প্রকাশিত : জুলাই ২৯, ২০১২ ||

ডেস্ক রিপোর্ট : কলারোয়া সীমান্তে ভারতীয় গরুর শুল্ক আদায় সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কাজে খাটাল মালিক নামে চোরাচালানীদের সম্পৃক্ত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে ঈদ-উল-ল ফিতর উপলক্ষ্যে খাটাল মালিকরা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে গরু নিয়ে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব লোপাট করছে। সংশ্লি¬ষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯২ সাল থেকে ভারতীয় গরুর শুল্ক নিয়ে বৈধতা দেওয়া শুরু হয়। শুল্ক নিয়ে সরকার গরু আনার বৈধতা দিলেও সীমান্তের ঘাট মালিকরা সরকারের পাশাপাশি গরু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা চাঁদা আদায় অব্যাহত রাখে। এমনকি সরকারি শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হলেও স্বার্থান্বেষী চোরাচালানী ঘাট মালিকদের টাকা ফাঁকির কোন পথ ছিল না। আর গরুর ঘাট চালানোর এই কাজে অবশ্য অসাধু সীমান্তরক্ষীদের বরাবর সহায়তা লক্ষ্য করা গেছে। ভারতীয় গরু আসার দরুন কিছু টাকা প্রাপ্তি অসাধু সীমান্তরক্ষীদের মূল লক্ষ্য। তাই কোন গরু ব্যবসায়ী ঘাট মালিকদের টাকা দিতে অস্বীকার করলে সীমান্তরক্ষীরা তাদের গরু আটক করে কাস্টমসে জমা দেয়। এতে ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই কোন গরু ব্যবসায়ী টাকা না দিয়ে অসাধু ঘাট মালিকদের বিরোধিতা করতে চায় না। পত্র পত্রিকায় বহুবার সরকারের পাশাপাশি ভারতীয় গরুর জন্য টাকা আদায়কারী সীমান্তের ঘাট মালিকদের নাম প্রকাশ হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি। বরং বরাবর গরুর ঘাট মালিকদের রক্ষায় অন্যদের নামে জিডি করে দায় সারা হয়েছে। আর বর্তমানে সীমান্ত অতিক্রমের পরে ভারতীয় গরুগুলো রাখা হচ্ছে সেই পুরাতন চোরাচালানী ঘাট মালিকদের নিয়ন্ত্রিত খাটালে। গরু রাখার জন্য তৈরি এক ধরণের ”গোয়াল ঘর” কে খাটাল নামে অভিহিত করা হয়েছে। ভারত থেক্ েআগত সমস্ত গরু সেই এলাকার খাটালে রাখতে বাধ্য হচ্ছে গরু ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে কলারোয়া সীমান্তের গাঁড়াখালীর ইয়ার আলীর খাটাল, রাজপুরের মনিরুলের খাটাল, হিজলদীর মনির খাটাল, চান্দুড়িয়ার বেলালের খাটালে ভারত থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫/৬ শত গরু পাচার হয়ে আসছে। কিন্তু কোন ক্রমে শতাধিক গরুর বেশী করিডোরে শুল্ক দেওয়া হচ্ছে না। গরু না দেখে খাটাল থেকে পাঠানো শ্লিপের উপর ভিত্তি করে খাটাল মালিকদের পাঠানো লোকের কাছ থেকে গরু প্রতি ৫শ টাকা নিয়ে সোনবাড়িয়া কাস্টমস করিডোর থেকে শুল্ক আদায়ের রশিদ দেওয় হচ্ছে। গরুর শুল্ক ৫শ টাকা হলেও খাটাল মালিকরা গরু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে গরু প্রতি এক হাজার পাঁচশ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গরু ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে। বাকী গরুর পিঠে ভূয়া নাম্বার লিখে এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে নাম্বার না লিখে প্রকাশ্য রাজপথ দিয়ে গরুগুলো দেশের অভ্যান্তরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর এভাবে লাখ লাখ টাকার শুল্ক ফাকি দেওয়া হচ্ছে। আর চোরাচালানী খাটাল মালিক, অসাধু সীমান্ত রক্ষী, পুলিশ, প্রভাবশালী ব্যাক্তি ও কতিপয় নামধারী সাংবাদিক এই টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নিচ্ছে। এই খাটাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে কার্যত গরু থেকে চোরাচালানী ঘাট মালিকদের টাকা নেওয়ার বৈধতা দেওয়া হয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গরু ব্যবসায়ীরা জানান। এদিকে সোনাবাড়িয়া কাস্টমস করিডোরে শুল্ক নেওয়ার দায়িত্ব পালন করছে স্থানীয় কৃষি ব্যাংকের গার্ড শহিদুল ইসলাম। কাস্টমস সুপার মাসে একবার এসে অথবা সাতক্ষীরায় বসে হাজার হাজার ফাঁকা রশিদের পৃষ্ঠায় স্বাক্ষর করে তা ব্যাংক গার্ড শহিদুল ইসলামের কাছে পাঠান। আর ব্যাংক গার্ড শহিদুল ইসলাম ৫’শ টাকা নিয়ে শুল্ক দাতার নাম লিখে খাটাল মালিকদের পাঠানো লোকের হাতে শুল্ক আদায়ের রশিদ প্রদান করেন। মেয়াদকাল ৪ দিনব্যাপী হওয়ায় একই রশিদে একাধিক গরু নিয়ে যেতে চোরাচালানীদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না। আর অসাধু সীমান্তরক্ষী ও পুলিশের সংগে চুক্তি থাকার কারণে বর্তমানে গরুর পিঠে ভূয়া নাম্বর লিখে/নাম্বার না লিখে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিপুল পরিমাণ গরু দেশের অভ্যন্তরে নিয়ে যেতে অসুবিধা হচ্ছে না বলে একাধিক সীমান্তবাসী অভিযোগ করেন। এ ব্যাপারে কলারোয়া কাকডাঙ্গা সীমান্তের গাঁড়াখালীর গরুর খাটাল মালিক ইয়ার আলী গরু প্রতি দেড় হাজার টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, কাস্টমস করিডোরের শুল্ক ৫শ টাকা হলেও খরচের জন্য বিজিবি এর পক্ষ থেকে তাদের সাড়ে ৮শ থেকে ৯শ টাকা নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত সাড়ে ৩শ/৪শ টাকা হারে আদায়কৃত বিপুল অংকের টাকা কার পকেটে যায়- সেই প্রশ্নটি এড়ায়ে যান। অনেক গরুর পিঠে নাম্বার না লেখার কথা স্বীকার করে খাটাল মালিক ইয়ার আলী বলেন, তড়িঘড়ির কারণে এটা ঘটে। একইভাবে উপজেলার রাজপুর, হিজলদী ও চান্দুড়িয়া খাটালে বেপরোয়াভাবে শুল্ক ফাঁকির কারবার চলছে বলে সংশি¬ষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এদিকে সোনাবাড়িয়া কাস্টমস করিডোর অফিসে কর্মরত ব্যাংক গার্ড শহিদুল ইসলাম গরুর শুল্ক ফাঁকির কথা স্বীকার করে বলেন, গত ৩১ জানুয়ারি কাকডাঙ্গা বিজিবি ২৯৩ গরুর শুল্ক আদায়ের জন্য শ্লিপ পাঠান। কিন্তু বেলা দেড়টায় কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শুল্ক আদায় ব্যবস্থা দেখতে এলে কাকডাঙ্গার অপর এক বিজিবি সদস্য এসে সকালে পাঠানো ২৯৩ গরুর শ্লিপ পাল্টে ৬৮৬ গরুর শ্লি¬প দিয়ে যান। কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আ ন ম তরিকুল ইসলাম কাস্টমস করিডোর পরিদর্শনের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, কাস্টমস সুপারের স্বাক্ষর না করা ফাঁকা কাগজপত্রের মাধ্যমে ব্যাংক গার্ড শহিদুল ইসলামের শুল্ক আদায় সহ বিভিন্ন অনিয়মের কথা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এ ব্যাপারে সোনাবাড়িয়া কাস্টমস করিডোরের সুপারের সংগে কথা বলার জন্য চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায় নি। এদিকে, জাতীয় চোরাচালান প্রতিরোধ কমিটির ৫১তম সভায় ১৩নং অনুচ্ছেদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক অননুমোদিত বীটসমূহ বাতিল/বন্ধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। কলারোয়ার কাকডাঙ্গা সীমান্তে গাঁড়াখালিতে ইউপি সদস্য এ’জাতীয় একটি বীট পরিচালনা করছেন। গত ১৭ জুন কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ৭১০ নং স্মারকে ( সূত্র ঃ খুলনা বিভাগীয় কমিশনার , স্মারক নং ০৫-৪৪.০০১.০২.০০.০১৯.২০১২-৫৭০, তাং ২ জুলাই ২০১২ ) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান, উপজেলার কেঁড়াগাছি ইউনিয়নের ইয়ার আলি সরকার বা টাস্ক ফোর্সের কোন অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘ ৭ বছর ধরে খাটাল/বীট পরিচালনা করে আসছেন। এরপরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্থানীয়দের প্রশ্ন, ইয়ার আলির খুঁটির জোর কোথায়?