ভোমরা বন্দরের পার্কি ইয়ার্ড নির্মাণ ঠিকাদার ও নির্বাহী প্রকৌশলীকে বরখাস্তের নির্দেশ : শুল্ক স্টেশনগুলো পূর্ণাঙ্গ বন্দরে উন্নীত করার কাজ অব্যাহত রয়েছে : নৌপরিবহনমন্ত্রী


প্রকাশিত : জুলাই ২৯, ২০১২ ||

নিজস্ব প্রতিনিধি : নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, বর্তমান সরকারের সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে পাঁচটি শুল্ক স্টেশনকে পূর্ণাঙ্গ বন্দরে রূপান্তর করা হয়েছে। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া শুল্ক স্টেশনগুলো স্থলবন্দরে উন্নীত করার কাজ অব্যাহত রয়েছে। নদী ও খাল খননে ১১ হাজার কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। নদীমাতৃক এদেশের মানুষের নদী ছাড়া পরিবহন খাতে সাশ্রয়ী কোন পথ নেই। আগামী এক যুগের মধ্যে ভোমরা বন্দরকে বেনাপোল বন্দরের সমপোযোগী করে তোলা হবে।

কোলকাতা থেকে ভোমরা বন্দরের দূরত্ব কম ও পদ্মা সেতু নির্মাণ হলে ঢাকার সঙ্গে ভোমরার দূরত্ব কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, আগামীতে দেশের যে কোন বন্দরের চেয়ে ভোমরা শ্রেষ্ঠ বন্দরে পরিণত হবে।

গতকাল শনিবার সকাল ১১টায় ভোমরা স্থলবন্দর পরিদর্শনকালে রিজু এন্টারপ্রাইজের দোতলার ছাদে শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে আয়োজিত এক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

ভোমরা স্থলবন্দর শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এবাদুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন জেলা পরিষদ প্রশাসক মুনছুর আহমেদ, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক  ও  ভোমরা সিএণ্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আশরাফুজ্জামান আশু, জেলা মটর শ্রমিক ই্উনিয়নের সভাপতি রবিউল ইসলাম রবি, ভোমরা স্থলবন্দর শ্রমকি ফেডারেশনের কার্যকরী পরিষদের সদস্য ডা. মুনছুর আহমেদ, জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও ভোমরা ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম প্রমুখ।

যারা পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে দুর্নীতির কথা বলছেন তাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, বিএনপি নেতা মওদুদ আহম্মেদ ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত সহকারি ছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি লণ্ডনে বসে মুক্তিযুদ্ধের তহবিল গঠনে তোলা টাকা আত্মসাত করেছিলেন। এজন্য দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধু তাকে জেলে পাঠিয়েছিলেন। তার শ্বশুর পল্লী কবি জসীমউদ্দিনের আহবানে বঙ্গবন্ধুই মওদুদ আহম্মেদকে জেল থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করেন। রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের সময়ে দুর্নীতির দায়ে মওদুদ আহম্মেদ আবারো গ্রেপ্তার হলে তিনি হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। হুসাইন মোহাম্মদের শাসনামলে উপরাষ্ট্রপতি থাকাকালীন দুর্নীতির দায়ে তিনি পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগদান করেন। মানি লণ্ডারিং মামলায় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর ছয় বছর জেল হয়েছে। দুর্নীতির দায়ে তারেক রহমানের সাজা অবশ্যম্ভাবী। সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী আকবর আলীর সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে ডেনমার্ক অনুদানের টাকা ফেরৎ নিয়ে গিয়েছিল। তাই যাদের সময়ে দুর্নীতির পাহাড় গড়া হয়েছে তাদের মুখে বরাদ্দ পাওয়ার আগেই পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ মানায় না। তদন্ত কার্যক্রমকে প্রভাবমুক্ত রাখতে মন্ত্রী আবুল হোসেন পদত্যাগ করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, টাকা পাওয়ার আগে দুর্নীতির প্রশ্ন ওঠে না।

মন্ত্রী বলেন, ২০০১ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দুর্নীতির দায়ে বিশ্বব্যাংক সাতটি প্রকল্প বাতিল করেছিল। এরপর থেকে এখনো পর্যন্ত বিশ্ব ব্যাংক বাংলাদেশে যোগাযোগ খাতে কোন অনুদান দেয়নি। পদ্মা সেতুর দুর্নীতি নিয়ে চুক্তি বাতিল করার কথা যারা বলছে তাদের দুর্নীতির কারণে যোগাযোগ খাতে বিশ্বব্যাংক কোন অর্থায়ন করেনি। বর্তমান সরকার পদ্মা সেতু নিজেদের অর্থায়নে করতে চায় এই মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, দেশের বেসরকারি পর্যায় থেকে এ ব্যাপারে ব্যাপক অর্থায়নের সাড়া পাওয়া গেছে।

তিনি আরও বলেন, ৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও দু’ লাখ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। তাদের আত্মত্যাগ ও ইজ্জাতের মূল্য দিতে বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে বিরোধীদল রাজনীতির নামে গাড়ি পোড়ানো এমনকি চালককে পুড়িয়ে হত্যা করছে। তাই জনগণকে সাথে নিয়ে এ ধরনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের প্রতিহত করা হবে।

মন্ত্রী আরো বলেন, বাংলাদেশেন ২৪ হাজার কিলোমিটার নদীপথের মধ্যে তিন হাজার ৬০০ কিলোমিটারের অস্তিত্ব রয়েছে। বঙ্গবন্ধু নদী ও খাল খনন করে জোয়ার আনার জন্য প্রথমে সাতটি ড্রেজার কিনেছিলেন। এরপর তিনটি ড্রেজার কেনা হয়েছে। বর্তমানে আরো তিনটি ড্রেজার কেনা হয়েছে। বেসরকারিভাবে ১৭টি ড্রেজার মেশিন নদী খননে ব্যবহার করা হচ্ছে। আরিচাসহ কয়েকটি নদীতে ফেরী পারাবারের সমস্যা নিয়ে মন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর আমলে আটটি, জিয়াউর রহমানের আমলে দু’টি, এরশাদের আমলে নয়টি ও শেখ হাসিনা বর্তমানে দু’টি ফেরী কিনেছিলেন। চারদলীয় জোটের পাঁচ বছরসহ বিগত ১০ বছরে কোন ফেরী তৈরি করা হয়নি। বর্তমানে আরো পাঁচটি ফেরী নির্মাণ করা হয়েছে। নয়টি ফেরী নির্মাণাধীন রয়েছে। কয়েক বছর আরাফাত রহমান কোকোর লাইসেন্সপ্রাপ্ত দু’টি ফেরী পাঁচবার দুর্ঘটনা কবলিত হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, কোকো-৪ ডুবে যাওয়ায় ৮৫ জনের সলিল সমাধি হয়েছিল। তিনি ২৫০ মেট্রিক টন ওজনের মালবাহী দু’টি জাহাজ কোরিয়াতে নির্মাণ করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন। চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের সকল সুবিধার বিষয়গুলো বিবেচনা করায় অসন্তোষ কমেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মন্ত্রী ব্যবসায়ী ও জনসাধারণের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সাতক্ষীরা পুলিশ সুপারকে ভোমরায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের নির্দেশ দেন। এ ছাড়া তিনি জমি অধিগ্রহণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সদস্যদের যোগত্য অনুযায়ী বন্দরে চাকুরি দেওয়ার প্রতিশ্র“তিসহ বন্দরে ট্রাক টার্মিনাল, অতিরিক্ত গুদাম নির্মাণ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, শ্রমিকদের বিশ্রামাগার নির্মাণের কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করা হবে বলে জানান। এ ছাড়া শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও ভোমরা বন্দর দিয়ে যাতে সকল শ্রেণির পণ্য আমাদানি রপ্তানি করা যায় তা গুরুত্ব সহকারে দেখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সাবেক সাংসদ ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মুনসুর আহম্মদ বলেন, এ বন্দরকে নিয়ে বহুবার চক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু ঐক্যবদ্ধ থাকার কারণে তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। অধিগ্রহণকৃত অর্পিত সম্পত্তির মালিকদের ক্ষতিপূরণ ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চাকুরি দিতে হবে।

সদর উপজেলা চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বলেন, বন্দর ব্যবহারকারীদের স্বার্থে ভোমরা-সাতক্ষীরা সড়কে দু’বছর আগে পাঁচ কোটি ও গত বছর আরো দু’কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনা ভোমরাকে পূর্ণাঙ্গ বন্দরে রূপান্তরের ঘোষণা দিলেও চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার কারণে তা বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি এ বন্দরকে পূর্ণাঙ্গ বন্দরে রূপান্তরের জন্য মন্ত্রীর আরো বেশী সহযোগিতা আহবান জানান।

জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বলেন, ওয়ার হাউজ নির্মাণের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের পরিবারের সদস্যদের যোগ্যতার ভিত্তিতে চ্াকুরিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অত্র এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিল থেকে একজন শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য বরাদ্দ পাঁচ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করতে হবে।

মটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি রবিউল ইসলাম জানান, সাতক্ষীরা থেকে চিংড়ি বিদেশে রপ্তানি করে কোটি কোটি টাকার বিদেশী মুদ্রা অর্জিত হয়। অথচ সাতক্ষীরার কোন উন্নয়ন হয় না। গত সাড়ে তিন বছরে মেডিকেল কলেজ নির্মাণ, ভোমরা বন্দরের উন্নয়নসহ বিভিন্ন কাজের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভোমরার সড়ক ও ওয়ার হাউজ নির্মাণের কাজ স্বচ্ছতার সঙ্গে করতে হবে। শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থে ভোমরায় ট্রাক টার্মিনাল গড়ে তুলতে হবে।

ভোমরা কাস্টমস এণ্ড ক্লিয়ারিং এজেন্ট এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুজ্জামান আশু বলেন, একটি মহল চারটি মামলা করে ওয়ার হাউজ নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ বাধাগ্রস্ত করতে চেয়েছিল। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে মহাজোটের নেতা কর্মীরা ভোমরা বন্দরে নির্যাতিত হয়েছিল। সম্প্রতি এক বিএনপি নেতা অস্ত্র ঠেকিয়ে তার কাছ থেকে টাকা ছিনতাই করেছে। তিনি ভোমরা বন্দরে ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন, শ্রমিকদের জন্য বিশ্রামাগার, শৌচাগার, জরাজীর্ণ ভোমরা শুল্ক অফিসের নতুন ভবন নির্মাণ, আরো দু’টি গুদাম ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণের দাবি জানান। তিনি ভোমরা বন্দর যাতে ব্যক্তি মালিকানায় না যায় তার জন্য মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

ভোমরা বন্দর শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী কমিটির সদস্য মুনসুর আহম্মেদ জানান, কিছু লোক ভোমরা বন্দরের উন্নয়নে চক্রান্ত করছে।

এর আগে মন্ত্রী ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ভোমরা বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্যে চার কোটি টাকা ব্যয়ে ওয়ার হাউজের পার্কি ইয়ার্ডের ইটের সোলিং এর কাজের গুনগত মান দেখে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এসময় তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী আলী হোসেনকে বরখাস্তের নির্দেশ দেন। তার সঙ্গে ছিলেন নৌ পরিবহন সচিব আব্দুল মান্নান হাওলাদার। পরে তিনি ভোমরা সিএণ্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশন মিলনায়তনে এক মতবিনিময় সভায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন।