সুন্দরবনে ছয় মাসে বাঘের আক্রমণে ১৪ বনজীবী নিহত


প্রকাশিত : আগস্ট ৩, ২০১২ ||

শ্যামনগর প্রতিনিধি : সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম সুন্দরবনে বাঘের উপদ্রব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বনবিভাগ সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, গত ছয় মাসে অন্তত বিশ জন বনজীবী বাঘের আক্রমণের শিকার হয়েছে। তবে ভাগ্যক্রমে বেশ কয়েকজন বনজীবী বেঁচে আসতে সক্ষম হলেও চৌদ্দ জন বনজীবী বাঘের কবলে প্রাণ হারায়।

বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনের গুরুখ্যাত আবু কওছার মোড়ল (৬৮) মধু আহরণের ফাশ নিয়ে বনে যাওয়ার পর ২০১১ সালের ৩১ ডিসেম্বর নিহত হন।

সঙ্গীদের নৌকায় অপেক্ষায় রেখে অনতিদূরের শব্দের কারণ দেখতে যেয়ে ধলের খাল সংলগ্ন বাদাতলী খাল এলাকায় তিনি বাঘের আক্রমণে শিকার হন। মাত্র এক থেকে দেড় মিনিটের ব্যবধানে সহযোগীরা অসীম সাহসী কওছার মোড়লের সাহায্যে এগিয়ে এলেও শুধুমাত্র তার অক্ষত মৃতদেহ উদ্ধারের সুযোগ পেয়েছিল।

পরবর্তীতে গত ৫ ফেব্র“য়ারি বনবিভাগের অনুমতি নিয়ে কাঁকড়া শিকারে যায় কালিঞ্চি গ্রামের রমেশ মুন্ডা। কিন্তু আঠারবেঁকী এলাকায় পৌঁছে তিনি বাঘের কবলে পড়ে সহযোগীদের সাহায্যে সে যাত্রায় রমেশ প্রাণে রক্ষা পেলেও মারাত্মকভাবে আহত হন।

এছাড়া গত ২৬ জানুয়ারি অবৈধভাবে সুন্দরবনে যেয়ে কাঠ কাটার সময় মাথাভাঙা খালের ভারানী খাল এলাকা থেকে বাঘের কবলে পড়ে প্রাণ হারায় আইয়ুব গাজী।

এ ঘটনার দু’দিন পর ২৮ জানুয়ারি নব মুসলিম আব্দুর রহমান অবৈধভাবে সুন্দরবনে মাছ শিকারে যেয়ে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য ভারানীখালের নুচোখালী এলাকায় বনে ওঠেন। এসময় বাঘের আক্রমণে তিনি মারাত্মক আহত হন। দীর্ঘ দুই মাস অচেতন অবস্থায় তীব্র মৃত্যু যন্ত্রণা নিয়ে শ্যামনগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

একই দিন অর্থাৎ ২৮ জানুয়ারি কয়রার বিনাপানি এলাকার বিশ্বনাথ মুন্ডা (৩১) বৈধভাবে বনে যেয়ে জাবা নদীর বাওন এলাকায় বাঘের আক্রমণে নিহত হন।

এছাড়া ৩ এপ্রিল কালিঞ্চি গ্রামের আমির হোসেন বৈধভাবে মাছ শিকারের জন্য বনে যেয়ে বাইনতলা খাল এলাকায় বাঘের আক্রমণে নিহত হন।

২৩ এপ্রিল পঞ্চাশ বছর বয়সী পূর্ব কৈখালী গ্রামের আব্দুল করিম গাজী মাইটভাঙা এলাকায় বাঘের কবলে পড়ে প্রাণ হারান। তিনি বৈধভাবে সুন্দরবনে প্রবেশ করেছিল বলে বনবিভাগ সূত্র জানায়।

পরবর্তীতে ১৪ মে মাছ শিকারের জন্য জ্বালানি সংগ্রহ করতে অবৈধভাবে বনে উঠে সোরা গ্রামের শহর আালী (৫৫) কাঁকড়াতলী এলাকায় বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান।

এঘটনার আগের দিন রবিবার বৈধভাবে সুন্দরবনে কাঁকড়া শিকারের জন্য যায় পঞ্চান্ন বছর বয়সী হারেজ গাজী। কিন্তু মুহুর্তের অসতর্কতায় সাত সঙ্গীর মাঝখানে থেকেও তিনি বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান। তিনি সুন্দরবনের ভিমরুলখালী এলাকায় বাঘের কবলে পড়েন।

তার আগের দিন অর্থাৎ ১২ মে বৈধভাবে বনে যায় পশ্চিম কৈখালী গ্রামের আজিবার সরদার। বাবা, দাদা আর অপর এক ভাইয়ের মত তিনিও বাঘের কবলে প্রাণ বিসর্জন দেন সুন্দরবনে। বড় উলুখালী এলাকায় তিনি বাঘের আক্রমণের শিকার হন।

এছাড়া গত ২ জুন বৈকেরীর কেওড়াতলী খাল এবং ২৫ জুন দাড়গাং এলাকায় বৈধ পাশ নিয়ে বনে যেয়ে মাছ শিকারের সময় যথাক্রমে টেংরাখালী গ্রামের ইস্রাফিল হোসেন (৩৫) ও কালিঞ্চি গ্রামের আব্দুল মজিদ (৩৪) নিহত হন বাঘের আক্রমণে।

এছাড়া গত ১৫ জুলাই বৈধভাবে সুন্দরবনে মাছ ধরেত যেয়ে আমজাদ গাজী (৪৫) নামের এক জেলে বাঘের আক্রমণে নিহত হন। তিনি শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী ইউনিয়নের যাদা গ্রামের কেনা গাজীর পুত্র। এছাড়া আরও অনেকে অবৈধভাবে সুন্দরবনে প্রবেশ করার কারনে বাঘের আক্রমণের শিকার হলেও আইনগত জটিলতার কারণে হাসপাতাল বা লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করে বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

উল্লেখ্য, এর আগে ২০১১ সালে মোট আঠার জন বাঘের আক্রমণের শিকার হলেও নিহত হয়েছিল নয় জন। সে তুলনায় গত ছয় মাসে বাঘের আক্রমণে নিহতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেড়েছে বলে বন বিভাগ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে।

এদিকে অনুসন্ধান এবং সুন্দরবনে যাতায়াতকারী জেলে বাউয়ালীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মাঝে মধ্যে মধু ভাঙতে কিংবা মাছ শিকারে যেয়ে বনজীবীরা বাঘের কবল পড়লেও অধিকাংশ সময় তারা সুন্দরবন থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে যেয়ে বাঘের আক্রমণের শিকার হন।