সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী


প্রকাশিত : অক্টোবর ২৬, ২০১২ ||

ডা. সুব্রত ঘোষ: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী একটি জেলা শহর সাতক্ষীরা। এ শহরের ্প্রাণকেন্দ্রে খুলনা-সাতক্ষীরা সড়কের গা ঘেষে দীর্ঘ প্রাচীর ঘেরা, শাল মেহগিনি আর নারকেল বিথী সুশোভিত ছায়া ঢাকা পাখি ডাকা মনোমুগ্ধকর পরিবেশে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সুবিশাল দ্বিতল ভবন দুটি অবস্থিত (বর্তমানে আংশিক তিন তলা করা হয়েছে)। হাঁটি হাঁটি পা পা করে আমাদের প্রিয় বিদ্যালয়টি আজ ৫০ টি বসন্ত পার করেছে। মাথা উচুঁ করে দম্ভ ভরে সে আজ তার ৫০ তম জন্ম বর্ষিকীর কথা জানান দিচ্ছে। ১৯৬২ থেকে ২০১২। ঠিক ৫০ টি বছর। এ সময়টিতে এ বিদ্যালয়টি তৈরী করেছে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য মেধাবী মুখ- যাঁরা নিজ গুণে আলোকিত করে চলেছে আমাদের প্রিয় পৃথিবীটাকে তাঁদের মেধা-মনন-একাগ্রতা-নিষ্ঠা দিয়ে। পৃথিবীর যে প্রান্তেই ছাড়য়ে থাকুক না কেন তাঁরা গর্ব করে বলতে পারে- আমরা সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। এটাই আমাদের পরিচয়ের একটা বড় মাধ্যম। স্থানীয় এলাকাবাসীর অক্লান্ত পরিশ্রম আর পরম মমত্বে গড়ে ওঠা এই বিদ্যালয়টি হয়ে উঠেছে সাতক্ষীরা বাসীর আশা আকাঙ্খার প্রতীক।

কর্তৃত্ব ও দলাদলি সেই সৃষ্টির পর থেকেই মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে। আর প্রশাসন এবং সাধারণের দুরত্বটা সচেতন ভাবে রক্ষা করা হয় আমাদের দেশে অনেক আগে থেকেই। সাতক্ষীরার আধুনিক জীবনাচার শুরু হয়েছিল যার হাতে তিনি জমিদার প্রাণনাথ রায় চৌধুরী। তিনি আরো অনেক জনহিতকর কাজের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেন পি.এন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। শহরের দক্ষিন প্রান্তের এই স্কুল ছিল শহর ও শহরতলী অঞ্চলের ছাত্রদের এক মাত্র ভরসা। ফলে নিরুপায় হয়ে শহরের অন্যপ্রান্তের ছাত্রদের বিদ্যালয়ে পড়বার জন্য অনেক দূর থেকে আসতে হতো। এ বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন হলো যখন- তখনকার কথা। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ধুমধাম করে স্কুলটির শতবর্ষ উদযাপন করল। সাতক্ষীরা মহাকুমার প্রশাসক হিসেবে তখন দায়িত্ব পালন করছিলেন এ.কে.এন. সিদ্দিক উল্লাহ। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মহকুমা প্রশাসককে এই আয়োজন থেকে যথাসাধ্য দূরে রাখলেন। অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল আর মহাকুমা প্রশাসকের মনে একটা দাগ কেটে গেল। সে দাগ অবহেলার কারণে অভিমানের দাগ। বেশ কিছুদিন তার মাথায় এই দাগের বেদনা চলতে থাকলো। অবশেষে বেদনা থেকে জন্ম নিলো নতুন চিন্তা। নতুন আর একটা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার করে একটি বিদ্যালয়ের অহমিকা দূর করার চিন্তা। সমমনা শিক্ষানুরাগী সমাজসেবকদের সাথে তিনি এই সমস্যা নিয়ে আলোচনা শুরু করেন এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যে সিদ্ধান্তে উপনিত হন যে সাতক্ষীরা শহরের উত্তর প্রান্তে আর একটি হাইস্কুল স্থাপন অতি জরুরী।

মহাকুমা প্রশাসক জনাব এ.কে.এন সিদ্দিক উল্লাহ স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিদের আহবান করলেন নতুন আর একটি বিদ্যালয় স্থাপনের কাজ শুরু করার জন্য। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রতিষ্ঠিত হলো সাতক্ষীরা টাউন হাই স্কুল। মধ্যবিত্ব পরিবারের এই উদ্যোক্তাদের আবেগের কমতি না থাকলেও আর্থিক সংগতি তেমন ছিল না। অনেকেই তাঁদের স্ত্রীর গহনা বিক্রী এবং বন্ধক রেখে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক খরচের টাকা যোগাড় করেন। স্কুল প্রতিষ্ঠায় বিশেষ সহায়তা প্রদান করেন খুলনা জেলার তৎকালীন এ ডি সি জনাব আব্দুর রব চৌধুরী। তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রাক্তন সচিব ও প্রাক্তন সাংসদ এবং বর্তমানে সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবি ও সরকারের এমিকাস কিউরি।

১ জুলাই ১৯৬২ তারিখ থেকে নতুন এই বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে পাঠদান শুরু হ’ল। গঠন করা হ’ল বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটি। বিদ্যালয় পরিচালনার প্রথম সংগঠনিক কমিটি তৈরী হয়েছিল এরকম- সভাপতিঃ জনাব এ.কে.এন. সিদ্দিক উল্লাহ, মহকুমা প্রশাসক, সাতক্ষীরা, সম্পাদকঃ জনাব মো. সোলায়মান, সদস্যঃ জনাব আব্দুল গফুর এম.এন.এ, সদস্যঃ জনাব আব্দুল আহাদ খান, সদস্যঃ জনাব হায়দার আলী খান চৌধুরী, সদস্যঃ জনাব আবুল ওয়ারেস খান, সদস্যঃ জনাব আহম্মদ মিয়া, সদস্যঃ জনাব আরিফ খান (বিদ্যালয়ের এসএসসি ১৯৬৬ ব্যাচের ছাত্র প্রকৌশলী মো. আবিদ হাসান খান এর পিতা), সদস্যঃ জনাব আব্দুল ওহিদ খান। এই সকল গুণীজনের কেউই আজ আর বেঁচে নেই- তবে বেঁচে আছে তাদের আম্লাান কীর্তি সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়।

১৯৬২ সালে সাতক্ষীরা টাউন হাইস্কুলে যারা প্রথম শিক্ষক কর্মচারী হিসাবে যোগদান করেন তারা হলেন-

প্রধান শিক্ষকঃ জনাব শেখ আব্দুল করিম, সহকারী শিক্ষকঃ জনাব মো. ইউনুস আলী, পুরাতন সাতক্ষীরা, সহকারী শিক্ষকঃ    জনাব মোঃ মহাতাব মল্লিক, মল্লিক পাড়া, সহকারী শিক্ষকঃ জনাব আব্দুল আজিজ শেখ, ইন্দিরা, সহকারী শিক্ষকঃ        জনাব জহুরুল হুদা, দেবহাটা, সহকারী শিক্ষকঃ জনাব মাহবুব হোসেন, পুরাতন সাতক্ষীরা, সহকারী শিক্ষকঃ জনাব আব্দুর রহমান, ইটাগাছা, সহকারী শিক্ষকঃ জনাব আব্দুল হক খান চৌধুরী, কাটিয়া, অফিস সহকারীঃ জনাব আব্দুল কাইয়ুম, পিওনঃ জনাব আব্দুল আলিম, লাবসা। বিদ্যালয়ের গর্বিত প্রথম ছাত্রের নাম লিয়াকত আলী খান চৌধুরী (পীয়ারা)।

বিদ্যালয়ে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল প্রধান সড়কের পূর্ব পাশে প্রধান শিক্ষকের বর্তমান বাসভবন এলাকায়, চাঁচের বেড়া আর গোলপাতার ছাউনি বিশিষ্ট শ্রেণী কক্ষে। এ বিদ্যালয়টির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার জনাব আলী আহম্মদ। বিদ্যালয়টির মোট জমির পরিমান ৯ একর ৫৬ শতক। এর মধ্যে ৭ একর ২ শতক জমি স্থানীয় বিভিন্ন জনের কাছ থেকে আত্মীকরণ করা। অবশিষ্ট ২ একর ৫৪ শতক এর মধ্যে ৮৭ শতক জমি দান করেন বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সম্পাদক জনাব মো. সোলায়মান। পরিচালনা পর্ষদের সদস্য জনাব আহম্মদ মিয়া দান করেন ২ বিঘা জমি। সভাপতির অনুরোধক্রমে আত্মীকরণকৃত ৭ একর ২ শতক জমির টাকা আব্দুল গফুর, এম.এন.এ (বাটকেখালী) ব্যক্তিগত তহবিল থেকে দান করেন। প্রতি বিঘা জমির দাম ধরা হয়েছিল ৭১৫ টাকা। বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন জনাব শেখ আব্দুল করিম। তারপর পর্যায়ক্রমে জনাব প্রতাপচন্দ্র (পি.সি) পাটওয়ারি, জনাব শেখ গহর আলী, জনাব মো. আবুল হোসেন, এরপর ১৯৬৮ সালে বিদ্যালয় সরকারী হলে জনাব আজিজুর রব প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। যাদের কাছ থেকে জমি আত্মীকরণ করা হয় তারা হলেন, ফুটবল মাঠ এলাকা জনাব আব্দুল আলি দালাল, বর্তমান বিদ্যালয় ভবন এলাকা জনাব দীনেশচন্দ্র দত্ত (কর্মকার), বিদ্যালয়ের সম্মুখ ভাগ অর্থাৎ দক্ষিণ পাশের মাঠ জনাব আবেদার রহমান ও জনাব আনন্দ।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পাটওয়ারি স্যার ছিলেন খুব কড়া শাসক, তবে ছাত্ররা তাঁর বাসায় গিয়ে বন্ধুর মত ব্যবহার পেত। স্যারের ছেলে যশুয়া পাটওয়ারিও এই বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। বিদ্যালয়ের প্রথম দিকের শিক্ষকদের মধ্যে অনাথ স্যার, সুজা স্যার, দুলাল স্যার, রাজ্জাক স্যার, ছাত্রদের মানসপটে আজও বেঁচে আছেন বেশ উজ্জ্বল ভাবেই। অনাথ স্যারের পুরা নাম ছিল অনাথ বন্ধু বোস। পড়াশুনার বাইরেও তিনি স্কুলের নুতন বিল্ডিং তৈরীতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন ছাত্রদের কাছে বন্ধুর মতো। আমের মৌসুমে তার বাড়ীতে গিয়ে দল বদ্ধভাবে ঝুড়ি ঝুড়ি আম খেত বিদ্যালয়ের ছাত্ররা।

পাকিস্তান আমলে সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে ক্লাস শুরুর আগে এসেম্বলীতে অবিভক্ত পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত ‘পাক সর জমিন সাদ বাদ…’ গাইতে হতো। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জনাব পাটওয়ারি ছাত্রদেরকে এই সংগীত সঠিক ভাবে গাইতে শেখাতেন। উনি নিজেও ভালো গান গেতেন। এ খবর মহাকুমা প্রশাসকের কাছে চলে গেলে, সাতক্ষীরা মহাকুমার স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের মুল অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত পরিবেশনার দায়িত্ব পড়েছিলো নব নির্মিত এই স্কুলের উপর। নূতন স্কুল হিসেবে আমাদের এই স্বীকৃতি বিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য ছিল অত্যন্ত গর্বের। ১৯৬২ সালের ইন্টার স্কুল ফুটবল প্রতিযোগীতায় এই বিদ্যালয়ের ছাত্ররা তৎকালীন পরাক্রমশালী প্রাননাথ হাইস্কুলকে ৪-০ গোলে পরাজিত করে। নূতন স্কুলের এই সাফল্য বিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সকলকে বেশ আড়োলিত করেছিলো।

তৎকালীন সাতক্ষীরা মহকুমার একটি বিদ্যালয় সরকারিকরণের প্রস্তাব এলে বিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের কর্তারা কেউ কেউ তাদের কর্তৃত্ব হারাবার এবং শিক্ষকদের অনেকেই চাকুরী হারাবার আশঙ্কা করতে থাকেন। পি.এন হাইস্কুল এবং টাউন হাইস্কুল দুটো স্কুলের মধ্যেই এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলতে থাকে। এ সময় টাউন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন জনাব মো. আবুল হোসেন। জনাব আবুল হোসেন, তখনকার সহকারী শিক্ষক জনাব হাবিবুল হুসাইন ও পরিচালনা পর্ষদের কিছু সদস্যের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১ মে ১৯৬৮ তারিখে সাতক্ষীরা টাউন হাইস্কুল সরকারিকরণ হয়। ১৯৬৮ সালের এক বছর বিদ্যালয়টি “টাউন সরকারি বিদ্যালয়” নামে চলে। পরে “সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়” নামকরণ হয়। বিদ্যালয় সরকারি হলে প্রথম প্রধান শিক্ষক হিসেব যোগ দেন জনাব আজিজুর রব। আজিজুর রব স্যারের পরে আসেন জনাব আব্দুর রশিদ স্যার তারপর আবার আবুল হোসেন স্যার প্রধান শিক্ষক হন। বিদ্যালয়টি সরকারি হলে কোন শিক্ষক-কর্মচারী চাকুরীচ্যুত হননি। বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সম্পাদক জনাব মো. সোলায়মান (পলাশপোল) ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বৃহত্তর খুলনা জেলার প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সম্পাদক। সাতক্ষীরার প্রথম বইয়ের দোকান “নিউ বুক হাউজ” ছিলো তার নিজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।

সে সময়ে পাকিস্তানের যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন খুলনার খান এ সবুর। তার রাজনীতি নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে বিতর্ক থাকলেও, সে সময়ে তিনি এই স্কুলের নূতন ভবনের জন্য বিশেষ অনুদানের ব্যাবস্থা করেন। তিনি এই স্কুল পরিদর্শন করতে আসেন। তার এই পরিদর্শন উপলক্ষে স্মৃতি প্রস্তরফলক স্থাপিত হয়েছিল- তবে আমাদের নষ্ট রাজনৈতিক সাংস্কৃতির কারণে প্রস্তরফলকের অস্তিত্ত্ব আজ আর নেই।

১৯৭১ -এ তদানিন্তন পশ্চিম পাকিস্তানীদের অমানুষিক অত্যাচার, নির্যাতন এবং শোষনের বিরুদ্ধে বীর বাঙালীরা ক্ষেপে উঠে ছিনিয়ে নিয়েছিল তাদের স্বাধীনতা, তাদের সার্বভৌমত্ব- একটি স্বাধীন পতাকা- স্বাধীন অস্তিত্ত্ব। তবে স্বাধীন বাংলাদেশের অকৃতজ্ঞ মানুষ আজ ভুলতে বসেছে শহীদদের আত্মদানের কথা। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো আজ পর্যন্ত সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পিছনে শহীদদের গনকবর সংরক্ষণ করা হয়নি। নির্মাণ করা হয়নি কোন স্মৃতিসৌধ। স্বাধীনতার রজত জয়ন্তীতে গণকবরে শায়িত শহীদদের প্রথমবারের মত স্মরণ করা হয়। সরকারি কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ইউনিটের সদস্যবৃন্দ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা শহীদদের প্রতি পুষ্পাঞ্জলি অর্পনের মধ্য দিয়ে প্রথম বারের মত শ্রদ্ধা নিবেদন করে, তারপর আর কেউ গণকবরে ফুল দেয়নি। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন বা বিদ্যালয়ের নিজস্ব উদ্যেগেও একাত্তরের এই বদ্যভূমিটি সংরক্ষণের কোন উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। এই বিদ্যালয়ের অসংখ্য ছাত্র-শিক্ষক দেশ মাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে গিয়ে শহীদ হন বিদ্যালয়ের ছাত্র সিরাজুল ইসলাম (গেজেট নং ১৭৯ সাতক্ষীরা সদর উপজেলা)। বিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই। আবার অনেকেই আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন বীরের বেশে। বিদ্যালয়ের  আমরা আমাদের এই পূর্বসূরী মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তরের গহীন থেকে শ্রদ্ধা জানাই। সেই সাথে বিদ্যালয়ের পিছনের গণকবরটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে কিংবদন্তীর ইতিহাসটি প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চালিত করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করছি। বিদ্যালয়ের যে সকল ছাত্র-শিক্ষক মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের গেজেট অনুসারে তাঁদের নাম ও গেজেট নং উল্লেখ করা হলো। মো. বদরুল ইসলাম খান (গেজেট নং ১০ সাতক্ষীরা সদর উপজেলা), মো. কাছেদ আলী (গেজেট নং ১১ সাতক্ষীরা সদর উপজেলা), মো. রফিকুজ্জামান খোকন (গেজেট নং ১২ সাতক্ষীরা সদর উপজেলা), মো. আব্দুর রশিদ (গেজেট নং ১৮ সাতক্ষীরা সদর উপজেলা), মো. কামরুল ইসলাম খান (গেজেট নং ২০ সাতক্ষীরা সদর উপজেলা), মো. খায়রুল বাসার (গেজেট নং ২২ সাতক্ষীরা সদর উপজেলা), শেখ মোতাহার হোসেন (গেজেট নং ৩৪ সাতক্ষীরা সদর উপজেলা), মো. খায়রুল বাসার (গেজেট নং ১৭৩ সাতক্ষীরা সদর উপজেলা), মো. ইমাম বারী (গেজেট নং ১৮১ সাতক্ষীরা সদর উপজেলা), মৃত মোস্তাফিজুর রহমান (গেজেট নং ২১৮ সাতক্ষীরা সদর উপজেলা), এ. কে. এম. আমিরুল জুলফিকার বাবু (গেজেট নং ২২৩ সাতক্ষীরা সদর উপজেলা), মো. জামাত আলী ঢালী (গেজেট নং ২২৭ সাতক্ষীরা সদর উপজেলা), মোস্তফা নুরুল আলম (গেজেট নং ২৯৮ সাতক্ষীরা সদর উপজেলা), মাহাফিজুর রহমান (গেজেট নং ১০৩৫ কলারোয়া উপজেলা), মাসুদ খান চৌধুরী (গেজেট নং ২১ সাতক্ষীরা সদর উপজেলা)। সাতক্ষীরা জেলায় ন্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন এই বিদ্যালয়েরই ছাত্র মো. কামরুল ইসলাম খান।

আমি (বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৯ সালে এসএসসি পাশ করি), আমার বাবা ডা. সুশান্ত ঘোষ (বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৭ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন, বর্তমানে সাতক্ষীরাতে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্র হিসেবে সাতক্ষীরাবাসীকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করে আসছেন), কাকা সুনীল ঘোষ (বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন) এবং ছোট ভাই সংগীত শিল্পী সৌগত ঘোষ দ্রুত (বিদ্যালয় থেকে ২০০৯ সালে এসএসসি পাশ  করে) এই বিদ্যালয়েরই আশীর্বাদে আজ আলোকিত। বাবার মুখে বলতে শুনেছি বিদ্যালয়ের তৎকালীন আধা কাঁচা ভরনটি পাকা করতে আমার বাবা-কাকার মত অসংখ্য ছাত্র স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে রাজমিস্ত্রী সেজে লেগে গিয়েছিলেন স্থায়ী ভবন নির্মানে। এভাবে এলাকাবাসী-ছাত্র আর শিক্ষকদের প্রচেষ্টার প্রতীক আজকের এই বিদ্যালয়টি।

অনেক মধুর স্মৃতির পাশাপাশি অনেক বেদনার স্মৃতি জড়িয়ে আছে বিদ্যালয়কে ঘিরে। মনে পড়ে সাদা জামা আর সবুজ প্যান্টের সেই স্কুল ড্রেসের কথা। নিজের অবচেতন মন হয়তবা আবারও ফিরে যেতে চায় সেই দিন গুলোতে। কালের আবর্তনে হয়তবা একদিন এই স্মুতিগুলোও ঝাপসা হয়ে যাবে, এভাবে পৃথিবীর নিয়মে নতুনদের জায়গা দিতে পুরাতনকে বিদায় নিতে হয় চিরতরে। সবচেয়ে বেদনার স্মৃতি ১৯৯৯ সালের ৯ মে আমার সহপাঠী দেবব্রত মল্লিকের সড়ক দূর্ঘটনায় পতিত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু। ওর মৃত্যুর মাত্র ক’দিন পরই আমাদের এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছিল। দেবব্রত’র মৃত্যু আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে আরেকবার মনে করিয়ে দেয় নিরাপদ সড়কের কথা। গত কয়েক বছর যাবত বিদ্যালয়ের এসএসসি ব্যাচ ’৯৯ এর ছাত্র সহকারি জজ আনিস এবং আরও কিছূ বন্ধুদের উদ্যোগে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে বিজ্ঞান, মানবিক ও বানিজ্য প্রতিটি বিভাগে একজন করে মেধাবী ছাত্রকে দেবব্রত মল্লিক স্মৃতি বৃত্তি প্রদান সহপাঠিদের প্রতি আমাদের কর্তব্যবোধকে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেয়।

মনে পড়ে স্কুলে পড়–য়া অবস্থায় নওশের আলী স্যারের মৃত্যু। আমাদের স্কুলকে একটুও বিশৃঙ্খল হতে দেননি যিনি একটি মুহূর্তের জন্যও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা জামায়েত আলী স্যার, দু’টি পা হারিয়ে আজ যিনি অচল। স্যারের মুখে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনে ক্লাসের ভিতরই কেমন যেন শিহরিত হয়ে উঠতাম আমরা। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠা হয়তবা তাঁর অনুপ্রেরণাতেই। মাজেদ স্যার- যাঁর বিজ্ঞান চিন্তা এবং গবেষনাধর্মী অনুসন্ধিৎসু মন আমাদেরকে অজানা কে জানার আগ্রহকে বাড়িয়ে তুলত অনেকাংশে। মনে পড়ে রাজ্জাক স্যারের ইংরেজী পড়ানো। তিনি যেন তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ইংরেজীর মত দুর্বোধ্য ভাষাকে অতি সহজেই আমাদের আত্মস্থ করাতেন। হাবিবুল হুসাইন স্যার- স্কুলের সাথেই বাড়ি হওয়াতে এবং আমার বাবার স্যার হবার সুবাদে কারণে-অকারণেই তাঁর বাসায় যেয়ে হাজির হলে একটুও বিরক্ত হতে দেখিনি কখনোই বরং আমাকে বরণ করতেন হাসি মুখে। ইউনুস আলী স্যার এবং সুরাত আলী স্যার- সেই ৩য় শ্রেণী থেকেই আমাকে পরম ¯েœহে আগলে রাখতেন আর ডাক্তার বলে ডাকতেন। আব্দুর বহমান স্যার- স্কুলে ভর্তি হবার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর বিদায় নেয়া আমাকে পরিচিত করিয়েছিল “ফেয়ারওয়েল” শব্দটির সাথে। মরহুম খোদা বখ্শ স্যার- নিজের স্বমহিমায় নিজের পঙ্গুত্বকে কখনোই বুঝতে দেননি যিনি। স্যারের যে একটি পা নেই তা বুঝতেই আমাদের কেটে গিয়েছিল অনেক বছর। নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য- আমার শিক্ষা জীবনের প্রথম প্রধান শিক্ষক। গল্পে শোনা বা বইতে পড়া হেড মাস্টার চরিত্রের সাথে তাকে মেলাতে চেষ্টা করতাম বার বার। মনোরঞ্জন রিশ্বাস- এক কঠোর প্রধান শিক্ষকের প্রতিকৃতি। ১৯৯৬ সালে অষ্টম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় বিদ্যালয়ের নিয়ম বহির্ভূত কার্যকলাপের জন্য সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বহি®কৃত হয়েছিলাম। হতভম্ব হয়ে স্যার শুধু বলেছিলেন, “তোর কাছ থেকে কখনও এটা আশা করিনি”। রনজিৎ কুমার রায়- একটি মানুষ একাধারে কঠোর একাধারে বন্ধু; তার এক অনন্য উদাহরণ। পড়া না পারলে রেগে গিয়ে তিনি বলতেন “ হবি নি তো চোর, খাবি নি তো চুরি করে”। আজও তাঁর কথাগুলো আমার কানে বাজে। হরি নারায়ণ চক্রবর্তী- পন্ডিত স্যার নামের মাঝে বলতে গেলে হারিয়েই গিয়েছিল তার আসল নামটি। হয়তবা এই মধুর নামের সম্বোধনে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন তিনি। মাত্র কিছুদিন আগে তিনি পরলোকগমন করেন। ৫০ বছর পূর্তি উৎসবটি দেখে যেতে পারলেন না তিনি। তার ক্লাসে ‘মনে কর যেন বিদেশ ঘুরে মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে’ -এর মত দূর কোন কল্পলোকে হারিয়ে যেতাম অবচেতন মনে।  মনে পড়ে দশম শ্রেণীতে ইমু কবিতাটি দিনের পর দিন মুখস্থ না করতে পারায় কতবার জোড়া বেতের বাড়ি খেয়ে হাত লাল করেছি কবির স্যারের কাছে। আমার চরম দূর্দিনের সময় আমার প্রতি তার অকুন্ঠ সমর্থনে তার প্রতি আমার সকল ক্ষোভ প্রশমিত হয়ে যায়। খুঁজে পাই নতুন এক কবির আহমেদকে। বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রিতীর এক জলন্ত উদাহরণ কোরবান আলী স্যার। পবিত্র হজ্জ্ব থেকে ফিরে বিদ্যালয়ে সৌদি থেকে খোরমা এনে খেতে দিলেন। প্রথমটির গৌরবময় অংশীদার ছিলাম আমি। বাংলা সাহিত্যের ক্লাসগুলোতে জাদুকরের মত বশীভূত করে রাখতেন আবুল কাশেম (১) স্যার। আবুল কাশেম (২)- বিদ্যালয়ে তিনি আসার আগে আর একজন আবুল কাসেম শিক্ষক হিসেবে কর্মরত থাকায় ২ নং কাশেম স্যার হিসেবে পরিচিতি পেলেও কাজে কর্মে ব্যক্তিত্বে তিনি ছিলেন নাম্বার ১। ছোট খাট গড়নের হামিদ স্যার সাদা পাঞ্জাবি আর হেলমেট পড়ে একটি ৫০ গাড়ি চালিয়ে প্রতিদিনই ঝাউডাঙ্গা থেকে আসতেন। ‘এবার থাম এক দো!!!’ শরীরচর্চা শিক্ষক হিসেবে যার হাতে মার খেতাম প্রায়ই- শরীরচর্চা শেষে ‘ছুটির জন্য প্রস্তুত ছু——টি’। সেই ছুটিতে আছেন প্রভাস চন্দ্র বিশ্বাস স্যার। পড়া না পারলে সুন্দর করে কান দুটো টেনে দুই গালে দুটো থাপ্পর মেরে ইংরেজী গ্রামার বইটা হাতে ধরিয়ে বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে দিতেন পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষক হওয়া নূর মোহাম্মদ স্যার। এখন বুঝি স্যারের মার না খেলে হয়তবা ইংরেজী মাধ্যমে পড়াটাই হতো না। সদাহাস্য মতিউর রহমান স্যার- হাসি মুখে বিদ্যালয় ক্যাম্পাসটিকে ভরিয়ে রাখত সারাক্ষন। আমিনুর রহমান স্যার- স্যারকে হাসতে দেখেছে এমন লোকের সংখ্যা হাতে গোনা, তবে আমি সেই সৌভাগ্যবানদের একজন। তবে আমিনুর রহমান স্যার ছিলেন পড়া লেখার সাথে নো কম্প্রোমাইজ প্রকৃতির। আবুল খায়ের স্যার- ছোট হুজুর নামের ভারে আসল নামটি চাপা পড়ে গিয়েছিল। কৃষি শিক্ষক হিসেবে যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন মোস্তফা খাইরুল আরবার স্যার। সাঈদ স্যারের রসায়ন ক্লাসে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় টেস্টটিউব ফেটে শ্রেণীকক্ষের ছাদে উৎপাদ লেগে যাবার ঘটনা আজও মনে পড়ে। তার ক্লাসে ফাঁকি দেওয়া যেত বলে আমরা তাকে খুব ভালবাসতাম- অপেক্ষায় থাকতাম ওনার ক্লাসের। আনিসুর রহমান স্যারের সামাজিক বিজ্ঞান ক্লাসগুলোর কথা আজও ভুলিনি। কিছুদিনের জন্য ইংরেজী আর গনিতের শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম মাহবুবুর রহমান স্যারকে যদিও তিনি অর্থনীতির শিক্ষক ছিলেন। আরিফুল ইসলাম স্যার- আমরা পেয়েছি ইংরেজী শিক্ষক হিসেবে পরবর্তীতে তিনি সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অসম্ভব রোমান্টিক মনের মানুষ স্যার। স্যারের রোমান্টিকতা সম্পর্কে অনেক কিছুই আমি এবং আমরা জানি কিন্তু জনসমক্ষে বলা যাবে না। একমাত্র মহিলা শিক্ষক সুহেলী সুলতানা ম্যাডাম। আমাদের হাজার খানেক পুরুষের মাঝে তিনি একমাত্র মহিলা প্রতিনিধি যিনি প্রতিনিধিত্ব করতেন মহিলা সমাজের। মায়ের পরম মমতা দিয়ে আমাদেরকে ভালবাসতেন ম্যাডাম। অলক চন্দ্র তরফদার স্যার- শিক্ষক হিসেবে কেমন ছিলেন জানি না তবে তার ভয়েস ছিল, মানে গর্জন ছিল- এটুকুই বলব। যদিও স্যারের ক্লাস খুব বেশি পাইনি আমি তাই তার সংস্পর্শেও খুব বেশি যাবার সৌভাগ্য হয়নি আমার। আবুল হাসান স্যার- এ সহপাঠীকে সমান্য আঘাত করলে তার নালিশে স্কুলে প্রথম দিন  এসেই আামাকে বেত মেরে নিজের উপস্থিতির জানান দিয়েছিলেন।  স্যারের কাছে আমি কৃতজ্ঞ কারণ তিনিই প্রথম আমাকে বিউটি বোন (কলার বোন) চিনিয়েছিলেন। ২ জন শিক্ষকের কথা একটু বিশেষভাবে বলব। মননে যাঁদের রেখেছি আদর্শ করে। তাঁদের কাছ থেকে আদর আর অবহেলা না পেলে আমি হয়ত এত দূর আসতেই পারতাম না। রমেশ চন্দ্র বিশ্বাস স্যার ও কিশোরী মোহন সরকার স্যার। হ্যাঁ, তাঁরা আমাকে অসম্ভব আদর করতেন- ভাল বাসতেন একথা কখনোই অস্বীকার করবো না তবে কিছু কারণে তাঁদের প্রতি আমার একটা নীরব অভিমান রয়ে গেছে আজও। তবে তাঁদেরকে বিশেষভাবে স্মরণ করে অন্য শিক্ষকদেরকে একটুও ছোট করছি না আমি।

১৯৯৮-৯৯ সালের সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বার্ষিকী “প্রতিবিম্ব” তে সার্বিক সহযোগীতা করেও সম্পাদনা পরিষদে ছাত্র সদস্য হিসেবে না থাকতে পাররা আক্ষেপ আমার কোন দিনই যাবে না। সম্পাদনা পরিষদে ছাত্র সদস্য হিসেবে থাকার আশ্বাসে এক বুক আশা নিয়ে ছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর হয়নি। হয়ত আমি অযোগ্য ছিলাম। তবে সেই দিনের প্রতিজ্ঞা আর জেদই আমাকে লেখা-লেখিতে অনুপ্রাণিত করেছে শতগুনে। এযাবত কালে আমার সম্পাদনায় আলোর মুখ দেখেছে অনেক জাতীয় মানের পত্রিকা-স্মরণিকা-বার্ষিকী। টুকটাক লেখালেখি ছাঁপা ও হয় মাঝে মধ্যে মাঝারি কিংবা শ্রেষ্ঠ মানের কিছু জাতীয় পত্রিকায়। তবে সেই আক্ষেপ আর মেটে না। আরেকবার আমি, আমার সহপাঠি সুমন ও সাগর মিলে জাতীয় টেলিভিশন স্কুল বিতর্কে অংশগ্রহনের জন্য আবেদন করলাম সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে (তখন নিজের পকেট থেকে ৩০ টাকা খরচ করে কুরিয়ার করে ঢাকায় টেলিভশন ভবনে পাঠিয়েছিলাম আবেদন পত্র)। বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে আমন্ত্রন আসল জাতীয় টেলিভিশন স্কুল বিতর্কে আমাদের বিদ্যালয়ের অংশগ্রহনের জন্য। বিধি বাম, আমরা যেতে পারলাম না। আমরা তখন দশম শ্রেণীর ছাত্র। কিন্তু জাতীয় টেলিভিশন স্কুল বিতর্কে পাঠান হল এসএসসি পরীক্ষার্থীদের; ভাল করার প্রত্যয়ে। এই ঘটনা দুইটি আমার কাছে আমার স্কুল জীবনের সেরা অপ্রাপ্তি হয়ে আছে আজও। তবে এই ঘটনা দু’টির ব্যর্থতাকেই পাথেয় হিসেবে নিয়ে আগামী দিনের সাফ্যল্যের আশায় আজও পথ চলছি।

মনে পড়ে পিয়ন আব্দুল আলীমের কথা- তার ভাঙা ভাঙা ইংরেজী আর হাস্যরসবোধ আমাদেরকে আনন্দ দিত সারাক্ষণ। দারোয়ান আবুল কাশেম ভাইকে ভোলার নয়। নৈশপ্রহরী তরতাজা যুবক অকালে মৃত্যুবরনকারী আব্দুর রউফ আর বয়স-সংসারের ভারে ন্যুজ ব্দ্ধৃ ছমিরউদ্দিন চাচার কথাও ভুলিনি। মনে পড়ে ঝাড়–দার ঊষা রাণী শীল দিদি আর মালী সালেহা আপার কথা। মনে পড়ে চটপটি আর সিংগাড়া বিক্রেতা কালাম ভাইয়ের কথা।

আমার সহপাঠিদেরকে মনে করার চেষ্টা করছি। পরছি না সবার চেহারাকে মনের মধ্যে আনতে। মাত্র ক’বছরেই ভুলতে বসেছি তাদের কথা। জানিনা তারা কে কাথায় আছে? কেমন আছে? আমি তোমদের স্মরণ করছি বন্ধুরা। তোমাদের কি আমার কথা মনে আছে? ক্লাসের সবচেয়ে ডানপিটে ছেলেটার কথা? বন্ধুরা এসো শত ব্যস্ততা ভুলে একটু সময় করে একে অপরকে স্মরণ করি যে যেখানেই- বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকি না কেন। এসো সবাই মিলে সাতক্ষীরার অবহেলিত-দুঃখী মানুষ গুলোর জন্য কিছু করি যার যার সাধ্যমত। সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় পরিবারের প্রাক্তন ও বর্তমান সকলের মঙ্গল কামনা করছি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে- প্রয়াত সকলের আত্মা শান্তি পাক। এসো সকলে মিলে আমাদের প্রাণপ্রিয় বিদ্যালয়টির ৫০ বৎসর পূর্তির উৎসবটি সফল করে সাতক্ষীরাবাসীকে আমাদের নিজেদের সদম্ভ উপস্থিতি জানান দেই আরও একবার।

২০১২ সাল। কালের পরিক্রমায় ১৯৬২ সালের টাউন হাই স্কুল আজ আর নেই, তবে তা আজ সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় নামে আলোকিত করে চলেছে সাতক্ষীরাবাসীদেরকে। সেই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে বরাবরের মত আজও আমরা গর্বিত। যাদের পরামর্শ, আর্থিক সাহায্য, দান অনুদান ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তাঁদের কাছে এবং যাদের শ্রমে, সহযোগিতায় এ যাবৎ এগিয়ে এসেছে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসবের এই সন্ধিক্ষণে। আলোকিত মানুষ গড়তে প্রতিষ্ঠানটি আরও সক্রিয় হোক। এই হোক আমাদের  প্রত্যাশা। আমাদের প্রাণের বিদ্যালয়ের ৫০ বছর পূর্তি। আশাকরি আমরা সবাই মিলে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫০ বছর পূর্তিতে আগামী ২৮ অক্টোবর একটা জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একটি প্রাণের উৎসব পালন করতে পারব। পুরাতন ছাত্রদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে আমাদের সকলের প্রিয় ক্যাম্পাস।

লেখকঃ কলামিস্ট, সমাজকর্মী, সংগঠক এবং চিকিৎসক- সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। বসধরষ: ংঁনৎধঃড়থরষরশধ@ুধযড়ড়.পড়স

তথ্যসূত্রঃ

১। জনাব মো. আবুল হোসেন। সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসাবে ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে যোগদান এবং প্রধান শিক্ষক হিসাবে ২৩ মার্চ ১৯৯৬ সালে অবসর গ্রহণ করেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণ- তারিখ ৫/১০/১২  দুপুর ১২ টা ১২.৪৫টা।

২। জনাব হাবিবুল হুসাইন। ১৯ জুন ১৯৬৬ সালে সহকারী শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। পরে সরকারী প্রধান শিক্ষক এবং প্রধান শিক্ষক হিসাবে ৩০ আগষ্ট ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে অবসর গ্রহণ করেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণ- তারিখ ৬/১০/১২ বিকাল ৫টা-৬টা।

৩। জনাব মোঃ ইউনুস আলী। সহকারী শিক্ষক হিসাবে ১ জুলাই ১৯৬২ খ্রিঃ যোগদান করেন। যে দিন প্রথম ক্লাশ শুরু হয় বিদ্যালয়ে। অবসর ১৯৯৮ খ্রিঃ। সাক্ষাৎকার গ্রহণ- তারিখ ৪/১০/১২  বিকাল ৫ টা-৬টা।

৪। জনাব মো. আব্দুর রহমান। সহকারী শিক্ষক হিসাবে যোগদান ১ জুলাই ১৯৬২। অবসর ১৯৯২ খ্রিঃ। সাক্ষাৎকার গ্রহণ- তারিখ ৫/১০/১২  সকাল ৯.৩০টা-১০টা।

৫। ডা. সুশান্ত ঘোষ, পিতা- মৃত কালি পদ ঘোষ, মাতা- মৃত সুবর্না ঘোষ, আলিপুর, সতিক্ষীরা। তিনি ১৯৬৭ সালে এই বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। বর্তমানে চিকিৎসক হিসেবে সাতক্ষীরাবাসীকে চিকিৎসাসেবা প্রদান করছেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণ- তারিখ- ১০/০১/১২ বিকাল ৫.৩০টা-৬টা।

৬। জনাব পল্টু বাসার, পিতা- মো. সোলায়মান, পলাশপোল। তিনি ১৯৭৫ সালে এই বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। বর্তমানে শিক্ষকতা পেশার সাথে জড়িত এবং বিভিন্ন গবেষনাধর্মী কাজে অভিজ্ঞ। সাক্ষাৎকার গ্রহণ- তারিখ- ৩/১০/১২ বিকাল ৫.৩০টা-৬টা।

৭। প্রকৌশলী মো. আবিদ হাসান খান, ১৯৬২ সালে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর পরই সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন। তিনি ১৯৬৬ সালে এই বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। তিনি বিদ্যালয়ের অন্যতম উদ্যোক্তা জনাব আরিফ খানের পুত্র। সাক্ষাৎকার গ্রহণ- তারিখ- ১৪/০৯/১২ বিকাল ৫.৩০টা-৬টা।