কলারোয়ার সোনাবাড়িয়া মঠ সংরক্ষণে উদ্যোগ নেই


প্রকাশিত : ডিসেম্বর ৩, ২০১২ ||

জাভিদ হাসান: ইতিহাসের সাথে প্রকৃতি যাঁদের সমান ভাবে টানে তাঁদেরকে আসতে হবে কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া গ্রামে। এখানে রয়েছে টেরাকোটার নির্মাণ শৈলীর অপূর্ব নিদর্শন। প্রায় আড়াই’শ বছর আগে রড সিমেন্টের ঢালাই বা কড়ি বর্গাবিহীন নির্মিত কলারোয়ায় সোনাবাড়িয়া মঠ বা শ্যামসুন্দর মন্দিরের তিনতলা ভবন কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সংস্কারের অভাবে ভবনের উপর গাছপালা জন্মে, ফাটল ধরে ও লোনায় ধ্বসে পড়তে শুরু করেছে। ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে সোনাবাড়িয়া মঠ’র নাম লিপিবদ্ধ রয়েছে কলারোয়া উপজেলায় রক্ষিত এক নজরে বোর্ডে। এই মঠের গায়ে খোদাই করা শিলালিপিতে শ্যাম সুন্দর নবরতœ মন্দির নামাঙ্কিত রয়েছে। এই মঠের মূল ভবনের গা ঘেঁষে পশ্চিমে জগন্নাথের মন্দিরের ছাদ ও দেওয়ালের অংশ বিশেষ ধ্বসে পড়েছে। পূর্ব দিকে ধবংস স্তূপের উপর নতুন করে শিব মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। দক্ষিণে রয়েছে আর একটি ধ্বসে পড়া ভবনের অংশ বিশেষ। যার কোন সঠিক পরিচয় পাওয়া যায় নি। ভবনে ব্যবহৃত ইটে খোদাই করা লেখার বেশীর ভাগ স্থান লোনায় ক্ষয়ে বিনষ্ঠ হয়ে গেছে। তবে যেটুকু লেখা অবশিষ্ট আছে তা এখনকার মত বাংলা হরফে নয়। কিছু শব্দ বর্তমান বাংলার মত হলেও অনেক অক্ষর একেবারে বুঝা যায় না। বাংলা হরফের আদি রূপ বলে স্থানীয় ইতিহাস ও ভাষাতত্ত্ব শিক্ষকরা মনে করেন। আর হরফের এই রূপ দেখে এর নির্মাণ কাল ৪/৫’শ বছর আগে কেউবা ৭/৮’শ বছর আগে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন তারা। তবে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাবেক উপ-পরিচালক মোশারফ হোসেনের লেখা ‘প্রতœতাত্ত্বিক জরিপ প্রতিবেদন বৃহত্তর খুলনা’ বইয়ের ৯৪ পৃষ্ঠার দ্বিতীয় কলামে উল্লে¬খ করা হয়েছে, এ মন্দির ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে জনৈক হরিরাম দাশ (মতান্তরে দুর্গাপ্রিয় দাশ) নির্মাণ করেছিলেন। যেটি সতীশ চন্দ্র মিত্রের বইয়েও লেখা রয়েছে। আর এই মঠের বিশেষত্ব হচ্ছে এর তিনতালা ভবনের ছাদ কোন রড়, সিমেন্টের ঢালাই বা কড়ি বর্গা ছাড়াই নির্মিত হয়েছে। মঠের মূল ভবনের নীচতলায় ১৪ কুঠুরি এবং দ্বিতীয় তলায় ১৪ কুঠুরি। তৃতীয় তলায় রয়েছে ৭ কুঠুরি রয়েছে। আড়াই বর্গ হাতের এসব ক্ষুদ্রাকৃতির কুটুরি নির্মাণের উদ্দেশ্য সর্ম্পকে কিছু জানা যায় নি। এসব কুঠুরির মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে অন্ধকোটা। এত অন্ধকার যে দিনের বেলায়ও কিছুই দেখা যায় না। দিনের বেলায়ও আলো ছাড়া এ ঘরে প্রবেশ বিপদজনক। কারণ অন্ধকোটার মধ্যস্থলে রয়েছে ইদাঁরা। পড়ে গেলে জীবন্ত ফেরার কোন সম্ভাবনা নেই। তাই দর্শনার্থীরা কেউ আলো ছাড়া অন্ধকোটায় প্রবেশ করে না। কারণ আগেই পার্শ্ববর্তী লোকজন বহিরাগতদের সর্তক করতে ভুল করে না। এছাড়া মঠের চূড়ায় বজ্র নিরোধক দণ্ডের সংগে পাশের পুকুরের পানির নীচের মাটিতে সংযোগ শিকলটি ছিঁড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটির চতুর্দিকে আরো মন্দির ছিল বলে শোনা য়ায়। এরকম বেশ কিছু ধবংস স্তূপ পাশে দেখা যায়। কিন্তু মঠের মূল ভবনের উপর গাছপালা লতাগুল্ম জন্মেছে। লোনা ধরে ক্ষয় শুরু হয়েছে ভবনের। প্ল¬াস্টার খসে পড়ছে। ভবনটির অসংখ্য স্থানে ফাটল ধরেছে। যে কোন সময় ধ্বসে পড়তে পারে ভবনটি। তবে এই ধ্বংস স্তূপটি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। স্থানীয় প্রবীণ হিন্দুরা জানায়, এক সময় রামকৃষ্ঞ পরমহংস এসে এই মঠে দুই মাস অবস্থান করেন। তাই হিন্দু ধর্মাম্বলীদের কাছে এটি পবিত্র মন্দির। এজন্য  বিপদজনক হয়ে পড়া মঠ ভবনের পাশে টিনশেড নির্মাণ করে স্থানীয় হিন্দু ধর্মাম্বলীরা বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পূজা অর্চনা করে আসছে। এছাড়া ঐতিহাসিক নিদর্শনটি দেখতে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানের হিন্দুধর্মীয় পূণ্যার্থীরা আসেন। এমনকি ভারতের বেলুড় মঠ, আমেরিকা, ব্রিটেন, সিংগাপুর অবস্থিত মঠের মহারাজেরা বিভিন্ন সময়ে সোনাবাড়িয়া মঠ পরিদর্শন করে গেছেন। সম্প্রতি ব্রিটেনের অধিবাসী ভারতের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ডেভিট ম্যাকাসিন এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি দেখতে আসেন। কিস্তু দর্শনার্থী এসব গুণিজন ছাড়াও সাধারণ দর্শনার্থীদের এক দণ্ড বিশ্রামের কোন ব্যবস্থা নেই মঠ চত্বরে। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে এই মঠ দেখতে সোনাবাড়িয়া ঘুরে যান প্রতœতত্ত্ব বিভাগের সাবেক উপ-পরিচালক ও পুরাতত্ত্ব বিষয়ক লেখক মোশারফ হোসেন। সাথে ছিলেন খুলনা জাদুঘরের একটি টিম। সে সময় প্রতœতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক মঠ সংরক্ষণের এগিয়ে আসার আশ্বাস শুনা যায়। এরপরে দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও মঠ রক্ষায় কোন সরকারি বা বেসরকারি কোন উদ্যোগ নেওয়া হয় নি। ফলে ক্রমান্বয়ে বিনষ্ট হচ্ছে সুরম্য ভবনটি। শতশত বছরের ধর্মীয় স্মৃতি চিহ্নটি রক্ষায় হিন্দু সম্প্রদায় সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।