জন্ম নিবন্ধন সনদ জালিয়াতি করে বিয়ে!


প্রকাশিত : ডিসেম্বর ৭, ২০১২ ||

শ্যামনগর প্রতিনিধি: জন্ম নিবন্ধন সনদ জালিয়াতি করে চৌদ্দ বছর বয়সী শিশু কন্যার বয়স বাইশ বছর দেখানো হয়েছে। তারপর প্রচুর অর্থকড়ির প্রলোভনে তাকে পাত্রস্থ করা হয়েছে এক গৃহস্থ পরিবারে। ঘটনাক্রমে পাত্রের বয়স পাত্রীর পিতার বয়সের চেয়েও বেশী দাড়িয়েছে। শুরু থেকেই ওই কারণে শিশুটির পিতা বিয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কিন্তু বিধি বাম। শেষ রক্ষা হলোনা মেধাবী শিশুর।

মামলায় জড়িয়ে পিতা ভারতে পালিয়ে থাকার সুযোগকে মোক্ষম মনে করে ওই শিশুকে পাত্রস্থ করা হলো। তাড়াহুড়া করার কারণে মালেশিয়া প্রবাসী পাত্রের সাথে তার বিয়ে দেয়া হলো মোবাইলে। পরিস্থিতি সামলানোর কৌশল হিসেবে পাত্র’র অনুপস্থিতিতেই তাকে পাঠিয়ে দেয়া হলো শ্বশুরগৃহে। শেষ পর্যন্ত শ্বশুর বাড়িতে অবরুদ্ধ থাকার কারণে সদ্য জেএসসি পেরুনো শিশুটির লেখাপড়াও বন্ধ রয়েছে।

সাড়া জাগানিয়া এ ঘটনাটি ঘটেছে শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী ইউনিয়নের জয়াখালী গ্রামে। এমন অপকর্মের সংশি¬ষ্টদের বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও শিশুকন্যাকে ফিরে পেতে তার অসহায় বাবা এখন অন্যের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

জানা যায়, জয়াখালী গ্রামের এশার আলী ও খাদিজা বেগম দম্পতির শিশু কন্যা ইয়াসমিনারা। সে গত ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত জুনিয়র দাখিল পরীক্ষায় ফয়সালাবাদ মুস্তাফাবিয়া আলিম মাদরাসা থেকে জিপিএ চার পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। সাধারণ বিজ্ঞানসহ পরীক্ষায় কয়েকটি বিষয়ে সে এ+ নম্বর পেয়েছে। শিশু কন্যাকে ফিরে পেতে অন্যের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানো তার পিতা এমার আলী বিদ্যালয়ের প্রত্যায়নপত্র নিয়ে হাজির হলে দেখা যায়, সেখানে তার জন্ম তারিখ পাচঁ জানুয়ারি উনিশ শত আটানব্বই। বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের ওয়েব সাইটে যেয়েও শিশুটির বয়স অভিন্ন বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। কিন্তু আশ্চর্য্যজনকভাবে শিশু ইয়াসমিনারা ইতির একটি জন্ম নিবন্ধন সনদ জোগাড় করে (সেখানে তার বয়স পাঁচ জানুয়ারি উনিশ শত বিরানব্বই) তড়িগড়ি করে বিয়ে দেয়া হয় বলে তার পিতার অভিযোগ।

এশার আলী আরও অভিযোগ করে জানান, তার মেয়েকে একই গ্রামের জবেদ আলী শেখের পরিবার তারই শিশু কন্যাকে বিদেশ প্রবাসী পুত্র বনি আমিনের বউ হিসেবে পেতে উঠে পড়ে লাগে।

নাছোড়বান্দা ঐ পরিবারের সদস্যরা নানাভাবে চেষ্টার শেষ পর্যায়ে তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার মতপার্থক্যকে কাজে লাগায়। তার অভিযোগ তিনি বিয়েতে সম্মত না হওয়ায় পাত্র তার স্ত্রীকে অঢেল টাকা পয়সা দিয়ে রাজি করায়। কিন্তু কোনভাবে কিছু করতে না পেরে একটি হত্যা মামলায় জড়িয়ে ভারতে পালিয়ে থাকার সুযোগে ঐ চক্রটি তার শিশু কন্যাকে পুত্রবধূ করে নিয়ে যায়। তিনি দেশে ফিরে ঐ ঘটনার প্রতিবাদ করে শিশুকন্যাকে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি নিতে থাকার খবরে বনি আমিনের পরিবার তার স্ত্রী’র সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করিয়ে জেল হাজতে পাঠিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয় বলেও তার অভিযোগ।

এশার আলী জানান, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের জন্ম নিবন্ধন সনদে তার শিশু কন্যার বয়স ০৫/০১/১৯৯৮ থাকলেও সেখানে ফ্লুইড ব্যবহার করে ৯৮ এর স্থলে ৯২ লেখা হয়েছে। গত ১৯/০৫/১২ তারিখে মালেশিয়া প্রবাসী বনি আমিনের সাথে বিয়ে মোবাইলে তার শিশু কন্যার বিয়ে হয় দাবি করে এশার আলী জানায়, তার কন্যা অত্যন্ত মেধাবী বলে তার স্বপ্ন ছিল তাকে লেখাপড়া করানোর। কিন্তু বনি আমিনের বড় ভাই শেখ মতলেব হোসেন বনি আমিনের দ্বারা নির্দেশিত হয়ে টাকার জোরে জন্ম নিবন্ধন সনদ জালিয়াতি করে তার শিশু কন্যাকে বিয়ে কতে বাধ্য করেছে।

বিয়ের পর কন্যাকে ফিরে পেতে তার তৎপরতা দেখে বনি আমিন তার স্ত্রী খাদিজার সহায়তায় খুলনার এক পেশাদার খুনিকে দিয়ে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে শ্যামনগর থেকে খুলনা নিয়ে যায় বলেও এশার আলীর অভিযোগ। এক পর্যায়ে হত্যার রাতে খুলনার দৌলতপুর থানা পুলিশের সহায়তায় তিনি জীবনে বেঁচে যান। অর্থের কাছে নতি স্বীকার করে পিতার চেয়ে বয়সে বড় পাত্রের সাথে বিয়েতে বসতে বাধ্য করা হয়েছে তার শিশু কন্যাকে। তিনি দাবি করেন, যে পুত্র বনি আমিন, তার পিতা এবং বড় ভাই শেখ মতলেব হোসেন ও তারই (এশার আলী) কাদিজা এমন নাক্কারজনক ঘটনার সাথে জড়িত। তাই তিনি অবিলম্বে অভিযোগের তদন্তপূর্বক এমন একটি দুস্কর্মের সাথে জড়িত সবার বিরুদ্ধে প্রশাসনসহ সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এশার আলী জানান, তার মেয়ের সাথে যে ছেলে বিয়ে করেছে, সে এখনও বিদেশে অবস্থান করছে। তাই নাম মাত্র বিয়ে হওয়ার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণসহ তার শিশুকে তার কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আবারও তার বিদ্যালয়ে যাতায়াতে সবার সাহায্য প্রার্থনা করছেন তিনি।

এ বিষয়ে বিয়ে পড়ানো মৌলভী মাও. ইদ্রিস আলী জানান, তিনি বিয়েতে সম্মত না হওয়ায় পাত্রের পরিবারের পক্ষ থেকে যে জন্ম নিবন্ধন সনদ দেয়া হয় সেখানে কনের বয়স বাইশ বছর হওয়ায় তিনি বিয়ে পড়ান। এখন পর্যন্ত তার কাছে ঐ সনদের ফটোকপি সংরক্ষিত রয়েছে বলে তার দাবি।

এদিকে পাত্র বনি আমিনের বড় ভাই শেখ মতলেব হোসেন মুটোফোনে জানান, তিনি সব কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকায় তারা মেয়েটির সাথে ভাইয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এতে কোন জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি নিরুত্তর থাকেন।