কালিগঞ্জের কুশলিয়া স্কুল এন্ড কলেজে অডিট নিয়ে তোলপাড়, দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে ১০ লাখ টাকার মিশন


প্রকাশিত : ডিসেম্বর ১৩, ২০১২ ||

ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি: কালিগঞ্জ উপজেলাধীন দক্ষিণ শ্রীপুর কেএমএল উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন টিমের অডিটকে কেন্দ্র করে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, কয়েকজন প্রভাষক ও সহকারি শিক্ষকদের বিধি বহির্ভুত নিয়োগের তথ্য স্পষ্ট হওয়ার পাশাপাশি অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির অনুমোদন নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র ও প্রতিষ্ঠানের আভ্যন্তরীণ তদন্ত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, দক্ষিণ শ্রীপুর কেএমএল উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন যাবত সরকারি বিধি বিধান লংঘন করে শিক্ষক নিয়োগ, ডোনেশনের নামে অর্থ বাণিজ্য, অনিয়মতান্ত্রিকভাবে সভাপতি মনোনয়নসহ বিভিন্ন অনিয়ম চলছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নানা অনিয়ম করে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিসহ চিহ্নিত কিছু ব্যক্তি কোটি টাকার অর্থ বাণিজ্য করেছে বলে এলাকায় ব্যাপক জনশ্র“তি আছে।

সূত্র জানায়, দক্ষিণ শ্রীপুর কেএমএল উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগের জন্য ০৩/১০/২০০৩ তারিখে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। অধ্যক্ষ পদে ৯ জন প্রার্থী আবেদন করেন। ১২/১২/২০০৩ তারিখে অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষায় ৬ জন প্রার্থী এবং মৌখিক পরীক্ষায় মাত্র ৩ জন প্রার্থী অংশগ্রহণ করেন। উক্ত তিন জনের মধ্যে একেএস সফিকুজ্জামান ৩৯ নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন, আবু রাইহান সিদ্দিকী ৩০.৪ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় এবং আহছান রউফ ২৬.৪ নম্বর পেয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। নিয়োগ পরীক্ষায় উপস্থিত ডিজি’র প্রতিনিধি প্রথম স্থান অর্জনকারী একেএস সফিকুজ্জামানকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে ডিজি’র প্রতিনিধির নির্দেশ অমান্য করে তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটি সরকারি বিধি লংঘন করে প্রথম স্থান অর্জনকারী একেএস সফিকুজ্জামানের পরিবর্তে অধ্যক্ষ পদে আবু রাইহান সিদ্দিকীকে নিয়োগ দেন। পরবর্তীতে একেএস সফিকুজ্জামান সাতক্ষীরার বিজ্ঞ আদালতে বিষয়টির প্রতিকার চেয়ে মামলা দায়ের করেন। এর প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ বিচারক আবু রাইহান সিদ্দিকীকে প্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। ম্যানেজিং কমিটি অধ্যক্ষ আবু রাইহান সিদ্দিকীকে সাময়িক বহিষ্কার করেন। পরবর্তীতে স্থানীয় সাংসদ চাপ প্রয়োগ করে মামলার বাদী একেএস সফিকুজ্জামানকে মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য করেন। এছাড়াও সাংসদের নির্দেশে দক্ষিণ শ্রীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের তৎকালীন সভাপতি কাজী নওশাদ দিলওয়ার বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ আবু রাইহান সিদ্দিকীর সাময়িক বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার করে প্রতিষ্ঠানে যোগদানের ব্যবস্থা করে দেন।

কলেজ শাখার ভুগোল বিষয়ের প্রভাষক পদে নিয়োগের জন্য গত ০৬/০৮/১৯৯৭ তারিখে দৈনিক জনকন্ঠ পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এর প্রেক্ষিতে ৩ জন প্রার্থী আবেদন করেন। তারা হলেন পঙ্কজ কুমার রায়, সুষমা রাণী মন্ডল ও রবিউল ইসলাম। এর মধ্যে পঙ্কজ কুমার মন্ডল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং সুষমা রাণী মন্ডল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলে অনার্সসহ মাস্টার্স ডিগ্রী পাশ এবং তাদের একাডেমিক রেজাল্টে একটি প্রথম বিভাগসহ অন্যগুলোতে দ্বিতীয় বিভাগ। অপর প্রার্থী রবিউল ইসলাম ডিগ্রী (পাস) কোর্সে তৃতীয় বিভাগে পাশ করার পর এমএসসি শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় আবেদন করেন। গত ৩০/০৮/৯৭ তারিখে যখন ভূগোল বিষয়ের প্রভাষক পদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় তখন রবিউল ইসলাম এমএসসি শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। অথচ, যোগ্য দু’জন প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও বড় অংকের অর্থের বিনিময়ে অবৈধভাবে ছাত্র থাকা অবস্থায় রবিউল ইসলামকে প্রভাষক পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়। তিনি বর্তমানে বহাল তবিয়তে কর্মরত থেকে সহকারি অধ্যাপকের স্কেলে বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন।

কলেজ শাখায় ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে নিয়োগের জন্য ২৮/১০/১৯৯৮ তারিখে শুধুমাত্র আঞ্চলিক পত্রিকা দৈনিক পূর্বাঞ্চল এ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এর প্রেক্ষিতে ৩ জন আবেদন করেন। তারা হলেন মহসীন উদ্দীন, মোসলেম উদ্দীন ও আয়ুব আলী। এর মধ্যে মহসীন উদ্দীন ও মোসলেম উদ্দীন ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে অনার্সসহ মাস্টার্স পাশ। অপরদিকে আয়ুব আলী আরবী সাহিত্যে মাস্টার্স পাশ। অথচ ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ্য দু’জন প্রার্থীকে বাদ দিয়ে আরবী সাহিত্যে মাস্টার্স পাশ আয়ুব আলীকে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ প্রদান করা হয়। তাছাড়া নিয়োগ পরীক্ষায় ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে ডিজি’র বিষয় বিশেষজ্ঞ ছিল না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে তিনি বর্তমানে বহাল তবিয়তে ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত থেকে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন।

কলেজ শাখায় ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে নিয়োগের জন্য ২১/২/২০০০ তারিখে দৈনিক পূর্বাঞ্চল পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। ৩ জন প্রার্থী আবেদন করেন। এর মধ্যে শামছুন্নাহার ¯œাতক (সম্মান) পাশ, শহিদুল ইসলাম এইচএসসি পাশ এবং আসাদুজ্জামান ছিলেন এমএ পাশ।  সরকারি বিধি বিধানের কোন তোয়াক্কা না করে এইচএসসি পাশ ও ¯œাতক পাশ করা দু’প্রার্থীকে দিয়ে কোরাম পূরণ করে মো. আসাদুজ্জামানকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে নিয়োগ দেয়া হয়। অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া আসাদুজ্জামান এখন সহকারি অধ্যাপকের স্কেলে বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন।

প্রতিষ্ঠানের স্কুল শাখায় সহকারি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান কাজী সাইফুল্যাহ। তার নিয়োগের সময় ৩ জন প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও তার আত্মীয় তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হওয়ার সুবাদে নিয়োগে দুর্নীতি ও অনিয়ম হচ্ছে এরকম বিষয় নিশ্চিত হয়ে অন্য প্রার্থীরা মৌখিক পরীক্ষা না দিয়ে চলে যান। কাজী সাইফুল্যাহ একমাত্র প্রার্থী হিসেবে মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে তাকেই নিয়োগ দেয়া হয়। কলেজ শাখার কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়ের প্রভাষক রওনাকুল ইসলাম ও স্কুল শাখার কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়ের সহকারি শিক্ষক আব্দুল কাদের ভুয়া কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ দিয়ে চাকুরী করছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কম্পিউটার সনদের সাথে তাদের দাখিলকৃত সনদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। তাদের দু’জনের জাল সনদ জমা দিয়ে নিয়োগ নিয়েছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।

এছাড়াও কলেজ শাখার যুক্তিবিদ্যার প্রভাষক নারায়ন চন্দ্র সরকার, ব্যবস্থাপনা বিষয়ের আয়ূব আলী, স্কুল শাখার সহকারি শিক্ষক মুরশিদা খাতুন এর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অসংগতি রয়েছে বলে জানা গেছে।

অধ্যক্ষ আবু রাইহান সিদ্দিকী গত ২০/০৬/২০০৭ এবং ২১/০৬/২০০৭ তারিখে পরিচালক, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ঢাকা-১০০০ এর পরিদর্শন টিমের কাছে উপরিউক্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য গোপন করে প্রতিবেদন নিয়েছেন। গত ০৬ ও ০৭ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ ও তার সহকারি মোখলেছুর রহমান তদন্ত কার্য সম্পন্ন করেছেন। তারা নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে অসঙ্গতি পেয়েছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও একান্ত বিশ্বাসভাজন কয়েকজন শিক্ষক দুর্নীতির বিষয়টি যাতে অডিট টিমের প্রতিবেদনে না আসে সে জন্য দোঁড়ঝাপ শুরু করেছেন। তারা ইতোমধ্যে পরিদর্শন টিমকে ম্যানেজ করার জন্য ১০ লাখ টাকার বাজেট হাতে নিয়েছেন। সে জন্য অনেকটা প্রকাশ্যেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীদের নিকট থেকে টাকা উত্তোলন করছেন। বাধ্যতামূলকভাবে টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে কতিপয় শিক্ষক ও কর্মচারীর মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টির প্রতিকার চেয়ে দক্ষিণ শ্রীপুর কেএমএল উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির অভিভাবক সদস্যসহ কয়েকজন অভিভাবক শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক, সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন জানানোর পাশাপাশি বিভিন্ন দপ্তরে অনুলিপি প্রদান করেছেন।

এ ব্যাপারে দক্ষিণ শ্রীপুর কেএমএল উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ আবু রাইহান সিদ্দিকীর কাছে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে চাইলে তিনি বলেন, আপনি যে সাংবাদিক আমি বুঝব কি করে? তারপর পত্রিকার নামসহ পুনরায় পরিচয় দিলে তিনি একই কথা বলেন। তা হলে আপনাকে আমি কি ভাবে বুঝাবো। এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান শিক্ষক বলেন, আপনার কোন কিছু জানার ইচ্ছা থাকলে স্কুলে আসবেন। মোবাইল ফোনে তিনি কোন তথ্য দিতে রাজি হননি।এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরিক্ষক আবুল কালাম আজাদ সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অডিট করার কথা স্বীকার করে বলেন, অনেক ত্র“টি পাওয়া গেছে, তবে সব ত্র“টি ডায়েরি না দেখে বলা যাবে না। এখন আমি বাহিরে আছি। তিনি পরে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করেন।



error: Content is protected !!