শ্যামনগরের গোপালপুরে স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন : ‘কুচক্রীদের ষড়যন্ত্র থেমে নেই’


প্রকাশিত : December 15, 2012 ||

সামিউল মনির, শ্যামনগর: শুক্রবার আড়ম্বরপূর্ণভাবে শ্যামনগর সদরের গোপালপুর স্মৃতিসৌধের উদ্বোধন ও ফলক উন্মোচন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ড. মুহা. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার বিকাল পাঁচটায় জাতীয় স্মৃতিসৌধের আদলে নির্মিত উক্ত স্মৃতিসৌধের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এর আগে বিকাল সাড়ে তিনটায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উপজেলা অডিটোরিয়ামে জেলা প্রশাসক ড. মুহা. আনোয়ার হোসেন হাওলাদারের উপস্থিতিতে মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিক, সুশীল সমাজ ও কর্মজীবী প্রতিনিধিদের উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার দৌলতুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে এ সময় আলোচনায় অংশ নেন পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান, প্রাক্তন সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এ কে ফজলুল হক, একাত্তর সালে গোপালপুর যুদ্ধে শহীদ হওয়া বীর যোদ্ধা সুবেদার ইলিয়াস খানের কন্যা দুদক’র উপ-পরিচালক বেগম সেলিনা আক্তার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদর ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান স ম জগলুল হায়দার, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং গোপালপুর যুদ্ধে চার শহীদের দাফনকারী মেহেরুল্লাহ গাইন, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের ডেপুটি কমান্ডার শাহাদৎ হোসেন, বিশিষ্ট সমাজসেবী এস এম আফজালুল হক প্রমুখ।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট শুক্রবার খুব ভোরে পাক বাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার ইলিয়াস খান, ঢাবি ছাত্র আব্দুল কাদের, ঢাবি ছাত্র আবুল কালামসহ আরও এক নাম না জানা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র শহীদ হন। এসব শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে সেখানেই (গোপালপুর) তাদের দাফন করা হয় এবং পাশে একটি শহীদ মিনার গড়ে তোলা হয়। স্বাধীনতার পর থেকে এযাবতকাল বিভিন্ন জাতীয় দিবসে এলাকাবাসী ও মুক্তিযোদ্ধারা উক্ত শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসছে। কিন্তু শহীদ মিনারের পাশ দিয়ে রাস্তা চলে যাওয়ায় ও স্থানীয়রা ঘরবাড়ি গড়ে তোলার কারণে সেখানে জায়গা সংকুলান না শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষদের নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।

এ পর্যায়ে বিষয়টি উপলব্ধিতে করে বর্তমানে শ্যামনগরে ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালনরত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান দৌলতুজ্জামান খান বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আলাচনা করেন। পরক্ষণে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ভগ্নদশায় উপনীত হওয়া শহীদ মিনারের আশাপাশে আরও কিছু জমি বাড়িয়ে সেখানে জাতীয় স্মৃতিসৌধের আদলে একটি শহীদ স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সে অনুযায়ী গত ছয় মাস ধরে নিরলস প্রচেষ্টায় প্রায় বার লক্ষ টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয় শ্যামনগরের গোপালপুর স্মৃতিসৌধ।

আগামী ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় দিবসে নবনির্মিত স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের লক্ষ্যে শুক্রবার শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে গোপালপুর স্মৃতিসৌধটি উদ্বোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়।

এদিকে গোপালপুর স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন এবং ফলক উন্মোচনের যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন হওয়া হওয়া সত্ত্বেও হঠাৎ করে শুক্রবার সকালে তা উদ্বোধন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। জানা যায়, কে বা কারা বৃহস্পতিবার গভীর রাতে উদ্বোধকের নামফলকটি ভেঙে দিয়েছে। প্রত্যুষে খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও মুক্তিযোদ্ধারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়েন। বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জেলা প্রশাসকের সাথে আলাপ আলোচনা করে নুতন একটি নামফলক পুনঃস্থাপন করলে যথাসময়ে গোপালপুর স্মৃতি সৌধের উদ্বোধনের অনিশ্চয়তা দূর হয়।

এদিকে রাতের আধাঁরে গোপালপুর স্মৃতিসৌধের নামফলক ভাঙচুরের ঘটনায় বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ তীব্র ধিক্কার ও নিন্দা জানিয়েছে। স্মৃতিসৌধ উদ্বোধনপূর্ব উন্মুক্ত আলোচনায় বক্তারা এমন নাক্কারজনক ও গর্হিত কাজে জড়িতদের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেন। এছাড়া এমন একটি মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করায় শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের প্রতি শ্যামনগরবাসী কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

এদিকে গোপালপুর স্মৃতিসৌধের নামফলক ভাঙচুরের বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের ডেপুটি কমান্ডার শাহাদাৎ হোসেন বলেন, প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর দেশের হাজার হাজার বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে জাতিকে মেধাশুন্য করার চেষ্টা চালায়। একচল্লিশ বছর পর এমন একটি দিনে শহীদ স্মৃতিসৌধের নামফলক ভাঙচুরের মাধ্যমে বুদ্ধিজীবীদের আর একবার হত্যা করা হলো। তিনি তদন্তপূবর্ক দোষীদের আইনের আনার দাবি জানান।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার দেবী রঞ্জন মন্ডল জানান,  রাতে কে বা কারা এমন অপকর্ম করার পর দুপুরেই নুতন নামফলক লাগিয়ে বিকালে উক্ত স্মৃতি সৌধ উদ্বোধন করা হয়েছে। তবে এ ধরনের গর্হিত কাজ জাতিকে কলংকিত করে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার দৌলতুজ্জামান খান জানান, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে অনুপ্রাণিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আলোচনা করে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের উদ্যোগ নেই। উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের নেতৃবৃন্দের সাথে আলাচনা করেই তা উদ্বোধনের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু অজ্ঞাত ব্যক্তিরা রাতের আঁধারে নামফলক ভেঙে হীনমন্যতার পরিচয় দিয়েছে। দেশ ও জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে উদার ও সহনশীল মনের পরিচয় দিতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।