ফিরে দেখা ২০১২: জেলায় ৩৬টি ধর্ষণ, দু’টি ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড়


প্রকাশিত : January 3, 2013 ||

এম জিললুর রহমান: সদ্য বিদায় হওয়া ২০১২ সালে জেলায় ৩৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তবে পুলিশের খাতায় ৩৬টি ধর্ষণের রেকর্ড থাকলে বাস্তবতার সাথে কোন মিল নেই। অনেক ধর্ষণ বা ইভটিজিং এর ঘটনা পুলিশ আমলে না নেওয়ায় তাদেরকে আদালতের দারপ্রান্তে পৌঁছাতে হয়েছে।

এছাড়াও অনেক ধর্ষণের ঘটনা ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে চাঁদা আদায়ের মত ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি ধর্ষকরা স্ব-ইচ্ছায় ধর্ষণের চিত্র ইন্টারনেটে ছেড়ে দিয়েছে। ফেলে আসা ২০১২ সালে সাতক্ষীরা জেলায় এমন ঘটনা ঘটেছে খুব বেশি। ধর্ষিতার পরিবার অসহায় ও গরিব হওয়ায় ধর্ষকদের বিরুদ্ধে তেমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশের পর পুলিশ তৎপর হয়ে দুই একটি ঘটনা আমলে নিয়ে মামলা রেকর্ড করা ছাড়াও দুই একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে।

পুলিশের গত বছরের ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ ধর্ষণের চিত্র থেকে দেখা গেছে, বছরব্যাপী সদর থানায় ৭টি, কলারোয়া থানায় ৩টি, পাটকেলঘাটা থানায় ১টি, তালা থানায় ২টি, দেবহাটা থানায় ৩টি, আশাশুনি থানায় ৫টি, কালিগঞ্জ থানায় ৭টি ও শ্যামনগর থানায় ৮টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। গত বছরে ধর্ষণের ঘটনায় শীর্ষে রয়েছে শ্যামনগর থানা। এরপর সদর ও কালিগঞ্জ থানার অবস্থান।  গত বছরে সবচেয়ে কম ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে পাটকেলঘাটা থানায়, ১টি।

সূত্র জানায়, ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে জেলায় ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৪টি। এরমধ্যে দেবহাটায় ১টি, কালিগঞ্জে ১টি ও শ্যামনগরে ২টি। ফেব্র“য়ারি মাসে আশাশুনি থানায় ১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। মার্চ মাসে জেলায় ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে সর্বাধিক ৮টি। এরমধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ২টি, কলারোয়ায় ২টি, দেবহাটায় ১টি, কালিগঞ্জে ২টি ও শ্যামনগরে ১টি ধর্ষণের ঘটনা রয়েছে। ফেলে আসা বছরের এপ্রিল মাসে জেলায় ধর্ষণের ঘটনা রয়েছে ৫টি। এরমধ্যে কলারোয়ায় ১টি, পাটকেলঘাটায় ১টি, আশাশুনিতে ১টি ও শ্যামনগরে ২টি। মে মাসের চিত্র একই। ৫টি ধর্ষণের মধ্য দিয়ে পার করা হয়েছে এ মাসটি। এরমধ্যে তালায় ২টি, আশাশুনিতে ১টি, কালিগঞ্জে ১টি ও শ্যামনগরে ১টি ঘটনা রয়েছে। জুন মাসে ২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে সাতক্ষীরা জেলায়। এরমধ্যে আশাশুনি ও কালিগঞ্জে ১টি করে ঘটনা রয়েছে। তবে জুলাই মাসে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আগস্টে ১টি ধর্ষণের ঘটনা রয়েছে। সেটি দেবহাটা থানায়। সেপ্টেম্বর মাসে জেলায় ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২টি। এরমধ্যে সাতক্ষীরা সদর ও শ্যামনগর থানায় একটি করে ধর্ষণের ঘটনা রয়েছে। অক্টোবর মাসে জেলা পুলিশের ধর্ষণের ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে ৫টি ঘটনা। এরমধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ৩টি ও কালিগঞ্জে ২টি। নভেম্বর মাসে জেলায় ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২টি। এরমধ্যে সদরে ১টি ও শ্যামনগরে ১টি করে ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ গেল বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরেও কোন ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি।

এদিকে ফেলে আসা বছরের প্রথম মাসের ১টি ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনার ঝড় ওঠে। গত ৪ জানুয়ারি সাতক্ষীরা শিল্পকলা একাডেমীতে ছাত্রলীগের ৬৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে আসা খুলনার এক নৃত্য শিল্পীর গান গাওয়া শেষে তাকে ছাত্রলীগের নেতা জুয়েল ও পলাশ তাদের বাড়িতে নিয়ে ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টির পাশাপাশি মামলা হয়। দেশ কাপানো আলোচিত এ ঘটনায় পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎকালিন জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পলাশকে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে প্রেরণ করে। এসময় দলীয় ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় কমিটি সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্তি ঘোষণা করেন। পরে ধর্ষিতার পরিবারকে ম্যানেজ করে মামলাটি নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়।

সে রেশ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবারো ওই বছরের মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে কালিগঞ্জের উপজেলা ভাইচ চেয়ারম্যান, কালিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাঈদ মেহেদী আশাশুনির এক স্কুল শিক্ষার্থীকে প্রেমের টোপ দিয়ে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগ উঠে। সাতক্ষীরা শহরের হোটেল সম্রাটে তাকে নিয়ে সময় কাটানোর সময় জনতার ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে জাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। এসময় কোর্টের সামনে জনতা গণধোলাই দিয়ে সাঈদ মেহেদিকে পুলিশে সোপর্দ করে। এক পর্যায়ে কালিগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের কমিটি বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়। দেশব্যাপী সাতক্ষীরার আলোচিত এ ঘটনায় থানা পুলিশ মামলা নেয়নি। অবশেষে আদালতে মামলা হলেও পুলিশ তদন্ত করতে গিয়ে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে। ফলে মামলাটি আদালতে ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়। বর্তমানে বিচার বঞ্চিত এ পরিবারটি এখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে। গেল বছরের শেষ সময়ে সাঈদ মেহেদির ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা নির্যাতিত ওই পরিবারের মেয়েটিকে ফের অপহরণ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়।