গডফাদার সবুর বেপরোয়া: সদর সাব রেজিষ্টারের উপ হামলা, পুলিশ মোতয়েন


প্রকাশিত : জানুয়ারি ৮, ২০১৩ ||

নিজস্ব প্রতিনিধি: দৈনিক পত্রদূত’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক স ম আলাউদ্দিন হত্যা মামলার চার্জশীটভুক্ত আসামি, তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী, গডফাদার আব্দুস সবুর ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে হামলা চালিয়ে সাব রেজিস্ট্রারকে লাঞ্ছিত করেছে। গতকাল সোমবার দুপুরে প্রকাশ্যে এই হামলা চালানো হয়।

এ সময় অফিসের স্টাফ, দলিল লেখকসহ জমি ক্রেতা বিক্রেতাদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। তাৎক্ষণিকভাবে খবর পেয়ে সদর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই সটকে পড়ে সন্ত্রাসীরা। পরে সদর থানার ওসি গাজী মোহাম্মাদ ইব্রাহীম ও ওসি (তদন্ত) আমিনুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে সেখানে নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

সাতক্ষীরা সদর সাব রেজিস্ট্রার আ ব ম খায়রুজ্জামান জানান, শহরের কাটিয়া গ্রামের কৃষ্ণ পদ মিত্রের ছেলে দীনবন্ধু মিত্র সদরের মাগুরা গোপিনাথপুর মৌজার ২০.৬০ ডেসিমেল, বিনেরপোতা মৌজার বরফ ফ্যাক্টরিসহ ২৪.৭৫ ডেসিমেল ও পারুলিয়া মৌজার ৮.২৫ ডেসিমেল মোট ৮৯.১০ ডেসিমেল জমি ন্যাশনাল ব্যাংক সাতক্ষীরা শাখায় মটগেজ দিয়ে ৩ কোটি ৬২ লক্ষ ৮৫ হাজার টাকা লোন গ্রহণের জন্য উক্ত ব্যাংকের নামে মটগেজ ও পাওয়ার নামা দুটির দলিল গতকাল দুপুরে রেজিস্ট্রির জন্য দাখিল করেন।

দলিল প্রস্তুতকারী লেখক মনোয়ার হোসেন দলিল দাখিলের পর তা দেখে শুনে দলিল দুটি ছাড় করা হয়। যার সিরিয়াল নং- ১৩৮ ও ১৩৯। দলিল দুটির রেজিস্ট্রির কার্যাদি সম্পন্ন হচ্ছে। এমন সময় দুপুর আড়াইটার দিকে আব্দুস সবুর নামের এক ব্যক্তি তার ছেলে আবু সাঈদসহ ১০/১২ জন সন্ত্রাসী সঙ্গে নিয়ে অফিসে এসে ওই দলিলে ঘুষ দাবির কথিত অভিযোগ তুলে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজসহ মারমুখি আচরণ করতে থাকে। নানাভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে সদর থানার এসআই বছিরসহ সঙ্গীয় ফোর্স ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই ভেগে পড়ে সন্ত্রাসীরা।

সাব রেজিস্ট্রার অভিযোগ করে বলেন, আলিপুরের আব্দুস সবুর বিগত ২ মাস পূর্বে ব্যাংক থেকে ১ কোটি টাকার লোন নিতে কমিশনে ঢাকায় যেয়ে একটি দলিল রেজিস্ট্রি করেন। অফিসের তৎকালিন করণিক শেখ শাহাদাৎ হোসেনের সাথে যোগসাজশ করেই দলিলটি রেজিস্ট্রি করা হয়। তখন আমি নতুন কাউকে চিনতাম না। আব্দুস সবুর আবারো সাড়ে ৩ কোটি টাকার লোন নেওয়ার জন্য আরও একটি মটগেজ দলিল রেজিস্ট্রি করতে আমাকে চাপ সৃষ্টি করছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে হল মার্কের দুর্নীতির পর থেকে প্রতিটি ব্যাংক মটগেজ দলিল রেজিস্ট্রি করতে সামগ্রিক কাগজপত্র প্রস্তত ছাড়াই দলিল রেজিস্ট্রি করা হলে দায়ভার সাব রেজিস্ট্রারকে বহন করতে হবে এমন আদেশ সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আমাদেরকে দেওয়ার পর বিধি মোতাবেক আব্দুস সবুরের সাড়ে ৩ কোটি টাকার ব্যাংক মটগেজ দলিলটি রেজিস্ট্রি করা আমার পক্ষে সম্ভব না হওয়ায় তিনি কথিত ঘটনার অভিযোগ তুলে তাকে হেনস্থা করা হয়েছে বলে জানান। তিনি আরও বলেন, জমি নেই অথচ ভূয়া কাগজপত্র দিয়ে ব্যাংক থেকে লোন নিতে সহযোগিতা বা দলিল রেজিস্ট্রি না করায় তিনি এভাবেই আস্ফালন করলেন, কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করেনি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আলোচিত ওই দলিলটির লেখক মনোয়ার হোসেন হলেও দলিলে স্বাক্ষর করেন এ্যাড শেখ সিরাজুল ইসলাম।

জানা গেছে, দলিল লেখক মনোয়ার হোসেন অফিসের পূর্বের করণিক বহু অপকর্মের হোতা শেখ শাহাদাৎ হোসেনের আপন ভাগ্নি জামাই। সম্প্রতি দুর্নীতির দায়ে শেখ শাহাদাৎ হোসেন স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়ায় আমাকে হেনস্থা করতে সুদূর প্রসারি পরিকল্পনার এটি একটি অংশ।

উল্লেখ্য, আব্দুস সবুর দেশের শীর্ষ চোরাকারবারিদের  অন্যতম। আশির দশকে বাকাল ইসলামপুর চর দখল করতে সাবুর আলীর ছেলে শফিকুল ইসলামকে পুড়িয়ে হত্যা করে বলে অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ৯৬ সালের ১৯ জুন রাত ১০টায় সদর থানার পাশে অবস্থিত দৈনিক পত্রদূত’র তৎকালিন অফিসে কর্মরত অবস্থায় ভোমরা বন্দরের প্রতিষ্ঠাতা, দৈনিক পত্রদূত সম্পাদক স ম আলাউদ্দিনকেদ্ধুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ওই মামলার চার্জশীটভুক্ত আসামী সবুর। ৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর দুপুরে শহরের ইটাগাছা এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুস সোবহান খোকনের বাড়িতে হামলা চালিয়ে দিন দুপুরে বসত বাড়ি ভাংচুর করে। এ ঘটনায় আব্দুস সবুরের ভাই আব্দুর রউফকে সহযোগিতার অভিযোগে তৎকালিন সহকারি পুলিশ সুপারকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। ১৯৯৯ সালের ২৬ জুলাই শহীদ স ম আলাউদ্দিন হত্যা মামলায় তৎকালিন বিজ্ঞ দায়রা জজ তার জামিন বাতিল করলে কয়েক হাজার সন্ত্রাসী নিয়ে কোর্টের সামনে প্রকাশ্যে মহড়া দিয়ে ১৪ জন বিচারককে ৬ ঘণ্টা আদালতের মধ্যে জিম্মি করে রাখে। ওই দিন রাতে খুলনা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলে সন্ত্রাসীরা সটকে পড়ে। গেল বছরের মাঝামাঝি সময়ে আব্দুস সবুরের ছেলে আবু সাঈদের ব্যবহৃত অস্ত্র হারানোর নাটক করে দেশব্যাপী তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে দেয়। এ ঘটনায় সদর থানার তৎকালিন ওসি আসলাম খানকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। সর্বশেষ তার দলিল রেজিস্ট্রি না করায় গতকাল দিনে দুপুরে সাতক্ষীরা সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে হামলা চালিয়ে সাব রেজিস্ট্রারকে লাঞ্ছিত করার ঘটনা নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে জেলাবাসীকে। প্রকাশ্য দিবালোকে সন্ত্রাসী গডফাদার আব্দুস সবুর ও তার ছেলে আবু সাঈদসহ ১০/১২ জন সন্ত্রাসী তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে আস্ফালন করতে করতে বেরিয়ে যাওয়ায় প্রসাশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সদর সাব রেজিস্ট্রার জানান, সার্বিক বিষয়টি সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক, সদর ইউএনও এবং জেলা রেজিস্ট্রারকে অবহিত করা হয়েছে। তাদের পরামর্শ ক্রমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সদর থানার ওসি গাজী মোহাম্মাদ ইব্রাহীম রেজিস্ট্রি অফিসে হামলার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আমি নিজেই তদন্ত করেছি। কর্তৃপক্ষ এজাহার দিলে মামলা নেওয়া হবে। এদিকে রাতে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা পরিষদে বিষয়টি আপোষ মিমাংসা করা হয়েছে বলে একটি নির্ভরযোগ্য সুত্র জানিয়েছে।