আজন্মযোদ্ধা ত্রিকালদর্শী এক বটবৃক্ষ


প্রকাশিত : জানুয়ারি ১০, ২০১৩ ||

ডা. সুব্রত ঘোষ: বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী- একটি ইতিহাস, একজন জীবন্ত কিংবদন্তী। ত্রিকালদর্শী এই চিরবিপ্লবী মানুষটি- ১০২ পেরিয়ে আজ ১০৩-এ পা দিল। আজও তিনি নবীন, সেঞ্চুরি পার করে তিনি এগিয়ে চলছেন সন্মুখপানে বীরদর্পে- তেজস্বী, লড়াকু আর সাহসী এক বীর যোদ্ধার মত। বয়সের ভার তাঁর চলার পথকে এতটুকুও বাঁধাগ্রস্থ করেনি- করেনি একটুও অমসৃন। মহীরুহ তিনি, কালোত্তীর্ণ তার জীবন। ছোটখাটো মানুষটির দীর্ঘ সক্রিয় জীবনের মূলে তার ঋজু চরিত্র। স্পষ্টভাষী তিনি, নিজের অবস্থানে বরাবর অবিচল। বজ্র কঠিন চিত্তে লক্ষে অটুট। বিনোদ বিহারী চৌধুরী নামটি কল্পনামাত্র একজন অপরাজেয় মানুষের চিত্রকল ভেসে ওঠে আমাদের সামনে। স্বাধিকার ও মানবমুক্তির সংগ্রামের প্রতিটি পর্বে যিনি ছিলেন বরাভয়। শোষণমুক্ত সমাজের জন্য আমাদের দীর্ঘ অপেক্ষা, স্বপ্ন ও আকাঙ্খা তাঁর হাত ধরেই যেন বাস্তবতার ভিত্তি পায়। নতুন করে আশাবাদী করে তোলে মানুষকে।

প্রথম যৌবনে মাস্টারদা সূর্যসেনের সহযাত্রীরূপে সশস্র স্বাধীনতা সংগ্রামে শামিল হয়ে অর্জন করেছেন আপন অঙ্গীকার ও কর্তব্যে অটল থাকার শিক্ষা। পরবর্তী জীবনে গান্ধীবাদী দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে ত্যাগ ও সেবার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েছেন একই দৃঢ়তায়। ইতিহাসের উত্থান-পতনময় বন্ধুর পথ পরিক্রমায় তার বেদনার্ত চিত্ত কখনও আধিগ্রস্ত হয়নি। করুণাময়ের দাক্ষিণ্যের প্রতি আস্থা আর মানবতার প্রতি বিশ¡াস তার অন্তর্লোকে ইতিবাচক বাতাবরণ বজায় রেখেছে বরাবর। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের সূত্রে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের সব স্বধীনতাকামী মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে তিনি এগিয়েছেন একই ধারাবাহিকতায়। বাংলাদেশের সব সংকটে-বিপদে তিনি রয়েছেন সরব, সচল, সক্রিয়।

মাত্র ষোলো বছর বয়সে তৎকালীন ‘যুগান্ত’ দলে যোগ দিয়ে বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিলেন বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী। এই উপমহাদেশ তখন ব্রিটিশ শাসকদের শৃঙ্খলে বন্দী। দেশ ও জাতিকে পরাধীনতার এই শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার জন্য মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তিনিসহ দেশমাতার মুক্তিকামী বীর সন্তানরা। বিপ্লবের মন্ত্রগুপ্তি নিয়েছিলেন চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের মহানায়ক মাস্টারদা সূর্যসেনের কাছে। ১৯৩০ সালের সেই বিদ্রোহ আজও ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের অংশ। মহাবিপ্লবী মাস্টারদার নেতৃত্বে সেদিন চট্টগ্রামের বিপ্লবী যুবকরা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল, টেলিগ্রাফ ও ট্রেন লাইন উপড়ে ফেলে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেত না বলে প্রচলিত মিথকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে চট্টগ্রামের বিপ্লবী যুবকরা সত্যিই সেদিন ব্রিটিশ-সূর্য ডুবিয়ে দিয়েছিল বঙ্গোপসাগরে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বুকে কাঁপন ধরানো সেই ঘটনায় চারদিন চট্টগ্রাম স্বাধীন ছিল। বিনোদ বিহারী চৌধুরী অস্ত্রাগার আক্রমণে অংশ নিয়েছিলেন এবং চারদিন পরে ঐতিহাসিক জালালাবাদ পাহাড়ে সংঘটিত যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করে আহত হয়েছিলেন।

ত্রিশের বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল বাংলার স্বাধীনতা। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে মুক্ত এলাকা গঠন করে সেই স্বাধীনতা আনয়ন সম্ভব ছিল না। মাস্টারদার ফাঁসিকাষ্ঠে বীরোচিত আত্মদানের পর ব্রিটিশ বাহিনীর চরম দমননীতির মুখে চট্টগ্রাম বিপ্লবের অগ্নিশিখা স্তিমিত হয়ে আসলে আপসের চোরা গলিপথে বেপথু হয়ে যায় স্বাধীনতা সংগ্রাম। সাম্প্রদায়িক ছুুরির কোপে বাংলা দু’টুকরো হয়ে পশ্চিমবঙ্গ ভারতে এবং পূর্ববঙ্গ পাকিস্তান নামক আজব রাষ্ট্রের করদরাজ্যে পরিণত হয়।

মাস্টারদা ও বিনোদ বিহারী চৌধুরীরা যে স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, সেই স্বাধীনতা এলো আরও দু’যুগ পর উনিশশ’ একাত্তর সালে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণ হয় এবং বাঙালির স্বাধীন আবাসভূমি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বিনোদ বিহারী চৌধুরীদের অসমাপ্ত বিপ্লবের পরিসমাপ্তি ঘটে একাত্তরে। বলা হয়ে থাকে ত্রিশের বিপ্লবের সফল উপসংহার একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধু মাস্টারদার সার্থক উত্তরসূরি। বঙ্গবঙ্গুর সত্তার মধ্যে যেন মাস্টারদারই প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়েছিল। মাস্টারদা ও বঙ্গবন্ধুর মধ্যে যে কালিক দূরত্ব সেটা বিনোদ বিহারী চৌধুরীই যেন ঘুচিয়ে দেন সেতুবন্ধ হয়ে। তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগসূত্র রচনা করেন আরেক সেরা বাঙালি মাস্টারদা সূর্যসেনের। মাস্টারদা তার বিপ্লবের দীক্ষাগুরু, তাঁর নেতৃত্বে তিনি পরাধীনতার শৃংখল থেকে বাংলার মুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছেন আর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তিনি বাংলার চূড়ান্ত স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছেন।

আজ ১০ জানুয়ারি বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর ১০৩ তম জš§দিন। ১৯১১ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী থানার উত্তর ভূর্ষি গ্রামে স্বদেশী এবং ব্রিটিশ বিরোধী প্রথম অসহযোগ আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, সৎ ও আদর্শবান আইনজীবি স্বর্গীয় কামিনী কুমার চৌধুরী এবং স্বর্গীয়া বামা চৌধুরীর কোল আলো করে জন্ম নিলেন তাঁদের আট সন্তানদের মধ্যে একজন আমাদের বিনোদ বিহারী চৌধুরী। তার জš§দিন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক আনন্দময় সংবাদ। গত শতকের তিরিশের দশকের একজন বিপ্লবী দুটি রাষ্ট্রবিপ্লবের মধ্য দিয়ে আমাদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত আছেন সৃজন কর্মমুখর সক্রিয়তায়, এ-ও এক বড় ঘটনা। ১০৩ তম জš§দিনে আমরা তাকে প্রাণপূর্ণ অভিনন্দন জানাই।

১৯৩০ সালে বিনোদ বিহারী চৌধুরী সবে কলেজছাত্র। ১২ এপ্রিল স্থানীয় কংগ্রেস ভবনে অনুষ্ঠিত গোপন বৈঠকে ইংরেজ বিরোধী সশস্ত্র অভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ১৮ এপ্রিল মাস্টারদার নেতৃত্বে বিপ্লবীদের সঙ্গে বিনোদ বিহারী চৌধুরীও চট্টগ্রামে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের অস্ত্রাগার আক্রমণ অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। দুটি অস্ত্রাগার দখলের পর মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে ইউনিয়ন জ্যাকের পতাকা নামিয়ে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের পতাকা উত্তোলন করে মাস্টারদা সূর্যসেনকে রাষ্ট্রপতি করে স্বাধীন বিপ্লবী সরকার গঠন করে। বিপ্লবীরা শহরের বাইরে বহুদূরে জালালাবাদ পাহাড়ে রক্ষণব্যূহ গড়ে তোলেন। আধুনিক গেরিলা যুদ্ধে যে রকম রণকৌশল গ্রহণ করা হয়, মাস্টারদাও জালালাবাদ পাহাড়কে পশ্চাদভূমি হিসেবে বেছে নিয়ে সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করে অনুরূপ যুদ্ধকৌশলই অবলম্বন করেছিলেন। ব্রিটিশ শাসন চার দিন অকার্যকর হয়ে পড়েছিল চট্টগ্রামে। মাত্র চারটি দিনের সেই স্বাধীনতা কী বিশাল অনুপ্রেরণার উন্নিত হয়ে উঠেছিল মুক্তিসংগ্রামীদের কাছে, তা হয়তো আজ উপলব্ধি করাও কঠিন। এই সশস্র স্বাধীনতা যুদ্ধ ‘চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ’ নামে আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়। চট্টগ্রাম হয়ে উঠেছিল এই উপমহাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রেরণার নাম।

২২ এপ্রিল ১৯৩০ জালালাবাদ পাহাড়ে ঔপনিবেশিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সূর্যসেনের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মাত্র ৪৫ জন বিপ্লবী, লড়েছিলেন তিন শয়েরও বেশি প্রশিক্ষিত আধুনিক অস্ত্রধারী ব্রিটিশ সেনার বিরুদ্ধে। অসম সেই যুদ্ধে ১২ জন সহযোদ্ধাকে হারিয়েছিলেন স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীরা। আহত হয়েছিলেন বিনোদ বিহারী চৌধুরীসহ আরও তিনজন। ব্রিটিশ বাহিনীর মেশিনগানের গুলি বিনোদ বিহারী চৌধুরীর কণ্ঠ ভেদ করে বেরিয়ে যায়। ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী পালিয়ে যাওয়ার পর গুরুতর আহত বিনোদ বিহারী চৌধুরী জীবিত সহযোদ্ধাদের সাহায্যে পাহাড় থেকে নেমে গ্রামে আশ্রয় নিয়ে প্রাণে বাঁচেন। গুলির ক্ষত শুকানোর পর তিনি ঢাকায় আত্মগোপন করেন। তার বিরুদ্ধে পাঁচ শত টাকার গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। যে চারজন মুক্তিসংগ্রামীর সংস্পর্শে এসে বিপ্লবের পথে যাত্রা করেছিলেন তাঁদের মধ্যে সূর্যসেন, তারকেশ¡র দস্তিদার, রামকৃষ্ণ বিশ¡াস ঝুলেছিলেন ফাঁসিতে, মধুসূদন দত্ত শহীদ হয়েছিলেন জালালাবাদ পাহাড়ে। ১৯৩৩ সালের ১৮ এপ্রিল তিনি ঢাকা থেকে গ্রেফতার হন। তার বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ না থাকায় বেঙ্গল অর্ডিন্যন্স-এ প্রায় ৫ বছর বন্দি জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। ১৯৩৮ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি মুক্তি পান। জেলখানায় পড়াশোনা করে এমএ ও আইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৪০ সালে আইনজীবি হিসেবে চট্টগ্রাম জেলা আদালতে যোগদান করে পরবর্তীতে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন আজ অবধি।

কারামুক্তির পর বিনোদ চৌধুরী কংগ্রেসে যোগ দেন। এরপর আরও কয়েকবার কারাভোগ করতে হয়েছে। কিন্তু সময়, সমাজ ও জীবন যেন কিছুতেই তাঁর জীবনীশক্তি কেড়ে নিতে পারেনি। ফিনিক্স পাখির মতো বারবার ধ্বংসস্তুপের ভেতর থেকে মাথা তুলে জানান দিয়েছেন, ‘আমি আছি।’ ১৯৩৯ সালে চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেস কমিটির সহ সম্পাদক ও ১৯৪০-৪৬ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের নির্বাহী কমিটির সদস্য হন। ১৯৪৬ সালে তিনি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের নির্বাচনে কংগ্রেস দলীয় প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন। সে সময় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য আসন নির্ধারিত ছিল এবং স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত  হতো। একাত্তরের শহীদ এবং গণপরিষদে বাংলা ভাষাকে সমান মর্যাদাদানের প্রস্তাবকারী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নেতৃত্বে বিনোদ বিহারী চৌধুরী আন্দোলন করেন প্রচলিত ধর্মীয় ভিত্তিতে পৃথক নির্বাচনের পরিবর্তে যুক্ত নির্বাচন আদায়ের জন্য। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী বাংলা ভাষার দাবীতে শহীদ বরকতের লাশ দেখে আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে আইন পরিষদের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানীদের শোষন আর গণহত্যার খবর বিশ্ববাসীকে জানানোর উদ্যোগ নেন। ১৯৫৮ সালে আউয়ূব খান সামরিক আইন জারী করে রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করলে বিনোদ বিহারী চৌধুরী রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। ১৯৬৯ সালে আউয়ূব বিরোধী গণ আন্দোলনে অংশগ্রহন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে ভারতের মিজোরাম দিয়ে কলকাতায় উপস্থিত হন এবং শরনার্থী কল্যান সমিতি গঠন করে সভাপতি হিসেবে তরুন-যুবকদের সংগঠিত করতে থাকেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং সেন্টার পরিচালনা করেন এবং শরনার্থী শিবিরগুলোতে বহু প্রাইমারী স্কুল গড়ে তোলেন। জীবন সায়াহ্নে উপনিত হয়েও প্রচলিত রাজনীতির ধারার পরিবর্তনের মাধ্যমে জনকল্যাণমূক সেবাধর্মী রাজনীতির ধারা প্রতিষ্ঠায় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহন নিশ্চিত করার জন্যে শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত-অবহেলিত, অপমানিত জনগনের আকুল আর্তি সরকার ও সকল রাজনৈতিক দলের কাছে পৌঁছে দেবার লক্ষ্যে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারীর নির্বাচনে (অনুষ্ঠিত হয়নি) চট্টগ্রাম-৯ নির্বাচনী আসন থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে জাতির বিপ্লবী ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছেন যিনি, অগ্নিযুগের উত্তাপ ও উত্তরাধিকার যার কাছ থেকে আমরা নিয়তই পাই, বাঙালি জাতির শতবর্ষের প্রতিনিধি বিনোদ বিহারী চৌধুরীকে আমাদের আভূমি প্রণাম। তার একশত তিন বছরে পদার্পণের মহার্ঘক্ষণটি প্রতিটি বাঙালির জন্যই এক পুণ্যতিথি বলে মনে করি। রাষ্ট্রীয়ভাবেই তাকে শতবার্ষিক সম্মান ও সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা প্রয়োজন।

বিনোদ চৌধুরী কোন ব্যক্তি নন। বহু আগেই তিনি ব্যক্তি জীবনের গন্ডি অতিক্রম করে ইন্সটিটিউশনে পরিণত হয়েছেন। ইন্সটিটিউশন রাষ্ট্রেরই সম্পত্তি। গোটা জাতি বিনোদ চৌধুরীর উত্তরাধিকার। তার সুযোগ্য জীবনসঙ্গী- সকল মুক্তি সংগ্রামের প্রেরণাদানকারী চট্টগ্রামের অন্যতম সেরা বিদ্যালয় অর্পণাচরণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষিকা মহীয়সী নারীর প্রতিকৃতি বিভা চৌধুরী তাঁর শততম জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে তাঁকে ছেড়ে অনন্তের পানে যাত্রা করেছেন যা চির বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর জীবনের অন্যতম বড় অপূর্নতা। এইদেশপ্রেমিক সদানিবেদিতপ্রাণ দম্পতির দুই সন্তান- অকাল প্রয়াত স্বর্গীয় সুবীর চৌধুরী এবং বিবেকানন্দ চৌধুরী বর্তমানে ভারতপ্রবাসী।

সেই ১৯৩০ সালেই বিনোদ চৌধুরী তাঁর জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন বিপ্লবে। ২০১০ সালে এই আপাদমস্তক চিরবিপ্লবীর জš§শতবর্ষ পূর্তির দিন তাকে জাতীয়ভাবে সম্মান জানানো হবে এটাই ছিল জাতির প্রত্যাশা। তবে কোন এক অজানা কারনে জাতির বটবৃক্ষ হয়ে ওঠা শতবর্ষী ক্ষনজন্মা এই মহাপুরুষটির জš§শতবর্ষ পূর্তির সময় জোটেনি কোন জাতীয় সন্মান তবে জুটেছে কোটি কোটি সাধারণ মানুষের হৃদয় নিংড়ানো অগাধ ভালবাসা। আজ ১০৩ তম জন্মবার্ষিকীতে এই মহান বিপ্লবীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সন্মান প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা, স্বাধীনতার স্বপক্ষের বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি সবিনয় আহ্বান জানাচ্ছি। দুটি স্বাধীনতা সংগ্রামের লড়াকু সৈনিক, সাবেক আইন পরিষদ সদস্য চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল ও জালালাবাদ যুদ্ধের সৈনিক বিনোদ বিহারী চৌধুরীকে জাতির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনই হতে পারে যথোচিত শ্রদ্ধার্ঘ্য।

সাতচল্লি¬শে সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারায় ভারত ভাগ হলেও হিন্দু বিনোদ বিহারী চৌধুরী পাকিস্তানেই থেকে যান। কারণ তিনি ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক নন। কংগ্রেসে যোগদানের পর অচিরেই তিনি পূর্ব বাংলার একজন নেতৃস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এর মধ্যে তিনি কংগ্রেস নেত্রী নেলী সেনগুপ্তার নজর কাড়তে সক্ষম হন। এই ইংরেজ দুহিতা দেশপ্রিয় জেএম সেনগুপ্ত ইংল্যান্ডে ব্যারিস্টারি পড়তে গেলে তার প্রেমে পড়া শুধু নয়, তার গলায় মালা দিয়ে বাঙালি বধূ সেজে ভারত এসে স্থায়ীভাবে ভারতবাসী হয়ে গিয়েছিলেন। স্বামীর রাজনৈতিক দল কংগ্রেসে যোগ দিয়ে তিনি সর্বভারতীয় নেত্রী হয়ে ওঠেন। তিনি কিছুদিন কংগ্রেসের সভানেত্রীও ছিলেন। বিনোদ বিহারী চৌধুরী দীর্ঘদিন এই নেলী সেনগুপ্তার ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন।

 

বিনোদ বিহারী চৌধুরী আজীবনের স্বাধীনতা-সংগ্রামী এবং তাতে বিঘœ-বিপদ অতিক্রম করে বহু বিজয়ের নায়ক ও সৈনিক হয়েও কখনও ক্ষমতার মোহে ভোগেননি, স্বেচ্ছায় থেকেছেন জনতার কাতারে। বিনোদ বিহারী মানুষের মানুষ, আদর্শবাদী কর্মবীর। এভাবে দীর্ঘ জীবনে তিনি নিজেই হয়ে উঠেছেন এক প্রতিষ্ঠান, জীবন্ত কিংবদন্তি, সচল ইতিহাস। খ্যাতি, স্বীকৃতি, সাফল্য তার ভেতরের অনাড়ম্বর সরল সহৃদয় সত্তাটিকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। বসনে-ভূষণে, বচনে-আচরণে তিনি ১২০ মোমিন রোডের গলির ছোট্ট কুটিরের (বর্তমানে কোন এক অজানা কারণে বিপ্লবী ভবনটিকে ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের মাধ্যমে বিলীন করে ফেলা হয়েছে ইতিহাসের একটি জলন্ত অধ্যায়) হাস্যজ্জ্বল উষ্ণ হৃদয়ের ছোটখাটো সাধারণ সাদাসিদে মানুষটি।

১০০ বছরের পথপরিক্রমা অতিক্রম করে ১০১ ও ১০২ পেরিয়ে আজ ১০৩- এ। এখনো বয়স তাঁকে ভারাক্রান্ত করতে পারেনি। সুদীর্ঘ জীবনে সমাজ ও রাষ্ট্রের যেকোনো দুর্দিনে তিনি আছেন সোচ্চার। স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সংগ্রাম, মানবমুক্তির তিনি এক অনমনীয় অপ্রতিরোধ্য পতাকা। আজ তাঁর ১০৩তম জন্মদিন। শতবর্ষাধিক বয়সের একটি বটবৃক্ষ ডালপালা পত্র ও পল্লবে আজ দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে তার ছায়ার বিস্তার- যার ছায়াতলে আমরা নিশ্চিন্তে- নিরাপদে জীবন যাপন করে চলছি অবিরাম- তিনি আমাদের সকলের অবিভাবক। আপনাকে শ্রদ্ধাঞ্জলি, হে বটবৃক্ষ। তাঁর একটি বাক্য আমাদের কানে প্রতিফলিত হয় বার বার, “সত্য বড় কঠিন, সেই কঠিনেরে ভালবাসিও”। সত্য ও সুন্দরের এই অভিযাত্রীকে আজ ১০৩ তম জন্ম জয়ন্তীতে সবার অন্তরের উষ্ণ অভিনন্দন, সবার হৃদয়-নিংড়ানো বিনম্র অভিবাদন।

লেখক: কলামিস্ট, সমাজকর্মী, সংগঠক এবং চিকিৎসক।