বহুলালোচিত স্কুল ছাত্রী ধর্ষণ মামলা: কালিগঞ্জ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি


প্রকাশিত : January 10, 2013 ||

বিশেষপ্রতিনিধি: কালিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাঈদ মেহেদীর  বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ধর্ষণ এবং পরবর্তীতে আবারও ধর্ষণ প্রচেষ্টার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে বাদীর নারাজির আবেদন আমলে নিয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে বিজ্ঞ আদালত। বুধবার সাতক্ষীরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক ফখরুদ্দীন বাদীর নারাজির আবেদন শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

মামলার বিবরণে জানা যায়, প্রায় ছয় মাস পূর্বে জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে আশাশুনি উপজেলা চেয়ারম্যান এবিএম মোস্তাকিমের অফিসে উপজেলার একটি স্কুলের অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীর সঙ্গে কালিগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদীর পরিচয় হয়। পরবর্তীতে স্ত্রীর অসুস্থতার কথা বলে কয়েকদিন পর সাঈদ মেহেদী ওই স্কুল ছাত্রীর বাড়িতে আসে। তার পর থেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাদের মধ্যে আলাপের সূত্র ধরে তাদের মধ্যে প্রেমজ সম্পর্ক গড়ে ওঠে দু’সন্তানের জনক সাঈদ মেহেদী। এক পর্যায়ে গত ১০ ফেব্র“য়ারি বিকেলে মোবাইল ফোনে ওই স্কুল ছাত্রীকে বুধহাটা বাজার থেকে মটর সাইকেলে করে কালিগঞ্জের পিরোজপুর গ্রামের নিজের চিংড়ি ঘেরের বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়। পরদিন সকালে তাকে একটি মটর সাইকেলে করে বুধহাটা বাজারে পৌঁছে দেয়া হয়। বিষয়টি জানতে পেরে ওই স্কুল ছাত্রীর মা সাঈদ মেহেদীর কাছে গেলে তিনি সম্পূর্ণ ঘটনা অস্বীকার করেন। পরবর্তীতৈ ওই স্কুল ছাত্রীর মা বিষয়টি জাতীয় মহিলা সংস্থার সাতক্ষীরা শাখার সভাপতি রিফাত আমিনকে অবহিত করেন। এর প্রেক্ষিতে  গত ২২ ফেব্র“য়ারি রিফাত আমিনের সাতক্ষীরাস্থ অফিসে সাবালিকা না হওয়া পর্যন্ত ওই স্কুল ছাত্রীকে সাতক্ষীরা শহরে রেখে পড়াশুনাসহ সকল খরচ বহন ও পরে বিয়ের করার শর্তে নন জুডিশিয়াল স্টাম্পে মুচলেকা দেন সাঈদ মেহেদী। মামলার বিবরণে আরও জানা যায়, গত ২৮ মার্চ সকাল ১০টায় মোবাইল ফোনে পুরাতন সাতক্ষীরায় ডেকে এনে সাঈদ মেহেদী একটি মটর সাইকেল যোগে ওই স্কুল ছাত্রীকে শহরের সম্রাট প¬াজা হোটেলে নিয়ে যান। সেখানে ধর্ষণের চেষ্টা করলে স্কুল ছাত্রীর চিৎকারে স্থানীয় লোকজন ছুটে এলে সাঈদ মেহেদী রাস্তায় নেমে এসে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় জনতা তাকে গণধোলাই দিয়ে তাকে পুলিশে সোপর্দ করে। ক্ষমতাসীন দলের নেতা হওয়ায় সদর থানার পুলিশ ক্ষমতাসীন দলের কিছু প্রভাবশালী নেতা পরদিন ভোরে সাঈদ মেহেদীকে পরদিন ভোরে থানা হাজত থেকে ছাড়িয়ে নেন। সাতক্ষীরা সদর থানা মামলা না নেয়ায় নিরুপায় হয়ে ওই স্কুল ছাত্রী বাদী হয়ে গত ২ এপ্রিল আদালতে মামলা দায়ের করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোঃ ফখরুদ্দীন অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গণ্য করার জন্য সাতক্ষীরা সদর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসলাম খানকে নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশে ৪ এপ্রিল থানা মামলা রেকর্ড করে এর তদন্তভার উপপরিদর্শক (এসআই) মাহাবুবর রহমানের নিকট ন্যস্ত করা হয়। মামলা তুলে নেয়ার জন্য ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় সাঈদ মেহেদীর ভাড়াটিয়া গুণ্ডারা ২৮ জুলাই রাত ৯টার দিকে শহরের সুলতানপুরের সাবেক পৌর মেয়র শেখ আশরাফুল হকের বাড়ির সামনে থেকে ওই স্কুল ছাত্রী ও তার মাকে মারপিট করে অপহরণের চেষ্টা করে। এ ব্যাপারে থানায় অভিযোগ দিলেও পুলিশ অজ্ঞাত কারণে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। এদিকে যথাযথ তদন্ত ছাড়াই উপপরিদর্শক (এসআই) মাহাবুবর রহমান ২০১২ সালের ১৩ আগষ্ট আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন  দাখিল করেন। পরবর্তীতে সাঈদ মেহেদীর ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা ওই স্কুল ছাত্রীকে গত ২৩ সেপ্টেম্বর মুনজিতপুর একাডেমী মসজিদের সামনে থেকে অপহরণ করে। রাতে জনগণের সহযোগিতায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। আদালতে বাদীর নারাজির আবেদন শুনানি শেষে বিচারক পুনঃতদন্তাদেশ দিলে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়দেব চৌধুরী গত ১৬ নভেম্বর আদালতে আবারো চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরদিন বাদী আবারো তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি প্রতিবেদন দাখিল করেন। ২১ ডিসেম্বর মামলা তুলে নেয়ার জন্য সাঈদ মেহেদীর ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা সাতক্ষীরা শরের রথখোলায় ওই স্কুল ছাত্রীর ভাড়া বাড়ির মালিক কলেজ শিক্ষক মঞ্জুরুল ইসলামের বাড়িতে হামলা চালায়। স্কুল ছাত্রীকে অপহরণ করার জন্য ওই বাড়ির দরজা, জানালা ও আসবাবপত্র ভাংচুর করা হয়। এ ক্ষেত্রেও পুলিশও সন্ত্রাসীদের কাছে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এরপরও পৃথক তিনটি হামলার ঘটনায় মামলা নেয়নি পুলিশ। সর্বশেষ গতকাল বুধবার দুপুরে বাদির নারাজি আবেদনের শুনানি শেষে বিচারক ফখরুদ্দীন মামলার কাগজপত্র ও আলামত যথাযথ তদন্ত না করেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন বলে আদেশে উল্লে¬খের পাশাপাশি আসামি সাঈদ মেহেদীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন।