চার হাজার শ্রমিকের মানবেতর জীবনযাপন:ভোমরা বন্দরে ধর্মঘটের তৃতীয় দিন অতিক্রান্ত


প্রকাশিত : January 21, 2013 ||

জিয়াউল ইসলাম জিয়া: মুক্তিযোদ্ধা শহীদস ম আলাউদ্দিনের একান্ত প্রচেষ্টায় ১৯৯৬ সাল থেকে ভোমরা শুল্ক স্টেশনের কার্যক্রম শুরু হয়। সেখান থেকে বন্দরে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর থেকে বেশ কয়েক বছর যে শ্রমিক ছিল তাতে প্রতিদিন কাজ চলতো। কিন্তু একটি সুবিধাবাদি মহল আর্থিক সুবিধা নিয়ে বন্দরে প্রয়োজন অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ করায় এখন আর রোজ কাজ হয় না। আবার কাজ করার পর এক মাসের মধ্যে মুজুরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এরপর বন্দরে ধর্মঘট শুরু হওয়ায় সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা।
এভাবেই সোমবার দুপুরে ভোমরা বন্দরে বিজিবি ক্যাম্পের সামনে বাজারের থলি হাতে দাঁড়িয়ে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলছিলেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার পদ্মশাঁখরা গ্রামের আনছার আলী।
বন্দর শ্রমিক হিজবুল্লাহ গাজী জানান, প্রায় ছয় বছর যাবৎ এ বন্দরে কাজ করছেন। রাজস্ব পরিশোধ করার পর সিএন্ডএফ এজেন্টরা আমদানিকৃত পণ্য ছাড় করালেও ট্রাক থেকে পণ্য খালাস ও ভর্তির জন্য মুজুরি পেতে ২৫ দিন থেকে এক মাস পর্যন্ত লেগে যায়। এ বন্দরে কর্মরত প্রায় চার হাজার শ্রমিকের পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকার পরও গত ১৯ জানুয়ারি থেকে ১০ চাকার ট্রাকে ভোমরা বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি রপ্তানির দাবিতে ভারতের ঘোজাডাঙা সিএন্ডএফ এমপ্লয়ী কার্গো ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশান ও বাংলাদেশের ভোমরা সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশন যৌথভাবে ধর্মঘট ডাকায় তাদের সংসারে হাঁড়ি সিকেয় উঠতে বসেছে।
বন্দর শ্রমিক কবীর হোসেন ও রবিউল ইসলাম জানান, ২০১০ সাল থেকে ২০১১ এর আগস্ট মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১০০ ট্রাক ফল, ৩০০ ট্রাক ফ্লাই এ্যাস ও ছোট পাথর ভারত থেকে আমদানি হত। তখন শ্রমিকদের মোটামুটি কাজ চলতো। প্রতিদিন গড়ে ফল আমদানির রাজেস্বর আড়াই কোটি টাকা লুটপাট করা হয় এমন অভিযোগে ২০১১ সালের আগস্ট মাসের শেষের দিকে ফল আমদানি বন্ধ হয়ে যায় বললেই চলে। ফলে ১০০ ট্রাকের ফল খালাস করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এ বন্দরের শ্রমিকরা।
বর্তমানে এ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০টি ট্রাকের আমদানিকৃত পণ্য খালাস করা হয় উল্লেখ করে তারা বলেন, এতে শ্রমিকদের আয় কমেছে। এর উপর গত তিন দিন বন্দরে ধর্মঘট চলায় আয় নেই। তারা শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে অবিলম্বে ভোমরা বন্দরের আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম চালু রাখার আবেদন জানান।
বন্দরে কর্মরত কয়েকজন শ্রমিক জানান, এ বন্দরে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরিসেবার জন্য পৃথক কোন হাসপাতাল তৈরি হয়নি বা নেই কোন প্রকৃত কল্যাণ ট্রাস্ট। ফলে বন্দরে কাজ করার সময় তারা ট্রাক খেকে পড়ে বা ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হলে ১৫ কিলোমিটার দূরে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে যেতে বাধ্য হন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কষ্টের সীমা থাকে না। এর উপর বন্দরে ধর্মঘট তাদের কাছে বিষ ফোঁড়া।
ভোমরা বন্দরের হ্যান্ডেলিং শ্রমিক ইউনিয়ন ১৯৬৪ এর সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম রঞ্জু ও ১৭২২ এর সাধারণ সম্পাদক আবিদ হোসেন জানান, ভারতীয় আমদানি ও রপ্তানিকারকদের সঙ্গে প্রশাসনের অনতিবিলম্বে ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে ১০ চাকার ট্রাক ভোমরা বন্দরে ঢোকানো নিয়ে ঝামেলা না মিটলে সরকার রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি শ্রমিকদের দুর্দশা বাড়বে। ফলে শ্রমিকরা নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের মুখে আহার তুলে দিতে সীমান্ত দিয়ে মাদক ও চোরাচালানি পণ্য পাচারের ন্যায় চুরি ও ছিনতাইয়ের কাজে এগিয়ে যেতে বাধ্য হবে।
প্রসঙ্গত, গত ১৭ জানুয়ারি ভোমরা জিরো পয়েন্টে এক জরুরী বৈঠকে ১০ চাকার ট্রাকে আমদানি রপ্তানি পণ্য বহনের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে গত ১৯ জানুয়ারি থেকে ভোমরা বন্দর দিয়ে সকল প্রকার আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে ঐক্যমত পোষণ করে ভারতের ঘোজাডাঙ্গা সিএন্ডএফ এজেন্ট এমপ্লয়ী কার্গো ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন।
ভোমরা সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অহিদুল ইসলাম জানান, সোমাবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ বন্দরে ধর্মঘট প্রত্যাহারের কোন সম্ভাবনা দেখা যায়নি। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সমস্যার সমাধানে আজ মঙ্গলবার দুপুরে ভারতীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দ আলোচনার টেবিলে বসতে পারে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।