কুল গ্রাম ‘সিঙ্গা’


প্রকাশিত : মার্চ ১০, ২০১৩ ||

ডেস্ক রিপোর্ট: কলারোয়া উপজেলার কেরালকাতা ইউনিয়নের সিঙ্গা’ এখন কুল গ্রাম নামে পরিচিত। হাইব্রিড জাতের কুল চাষ করে এ গ্রামের অনেকেই বেকারত্ব দূরীকরণের পাশাপাশি ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছেন।
সিঙ্গা গ্রামের আবুল কাশেম সরদারের বয়স ৬২ ছুঁই ছুঁই। ১৯৭২ সালে চন্দনপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন তিনি। এরপর যশোরের নাভারন কলেজে কলা বিভাগে ভর্তি হলেও লেখাপড়া বেশিদূর এগোয়নি তার। চার বোনের একমাত্র ভাই হওয়ায় বাবার অসুস্থতার কারণে যশোরের নাভারণ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষ না পেরোতেই পড়াশুনা বন্ধ করে দিয়ে সংসারের হাল ধরতে হয় তার। কৃষক পরিবারের সন্তান হওয়ায় চাষ কাজের প্রতি তিনি আগ্রহী হয়ে পড়েন।
গত বুধবার দুপুরে সিঙ্গা গ্রামে যেয়ে কথা হয় আবুল কাশেম সরদারের সঙ্গে। দু’স্ত্রী শাহীদা খাতুন ডালিম ও মমতাজ বেগমের গর্ভে চার ছেলে ও এক মেয়ে তার। তিনি বলেন, পৈতৃক সূত্রে বোনদের অংশ নিয়ে তিনি ২২ বিঘা জমির মালিক হয়েছেন। জমি উঁচু হওয়ার জন্য সবজি চাষ ও ধান চাষের পক্ষে অনুপযোগী। কিছু জমিতে ধান চাষ করেছেন। গ্রামের নূরুল হক (প্রয়াত), লিয়াকত আলী, আবুল হোসেন ও মন্তেজ দালালসহ কয়েকজনের দেখাদেখি ২০০৬ সালে অনাবাদি আট বিঘা জমিতে হাইব্রিড জাতের নারকেল ও গাব কুল চাষ শুরু করেন তিনি।
আবুল কাশেম জানান, সাধারণত তাদের এলাকায় গাব, নারিকেল, আপেল ও বাউ কুলের চাষ হয়। তবে অধিক ফলনশীল হওয়ায় প্রথম থেকেই গাব ও নারিকেল কুলের চাষ করে আসছেন তিনি।
তিনি আরো জানান, বর্ষকালে চারা লাগানোর পর মূলত ১২ মাস ধরেই কুল গাছের পরিচর্যা করতে হয়। ভাদ্র মাসের প্রথম দিকে গাছে (নারিকেল জাত) ফুল আসে। পৌষ মাসের প্রথম দিকে কুল পাকে। তবে গাব জাতের কুল গাছে ফুল আসে আরো দেরীতে। ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি এ কুল পাকে।
নিজের কুল বাগানে অবস্থান করাকালিন আবুল কাশেম জানান, বিঘা প্রতি ২৫ থেকে ৩০টি কুলের চারা লাগানো যায়। গ্রামের কয়েকটি নার্সারি থেকে প্রতি চারা ৩০ থেকে ৪০ টাকায় কিনতে হয়। যদিও সাত বছর আগে পাঁচ টাকা মূল্যের একটি চারার দাম বর্তমানে কয়েকগুণ হয়েছে। ফুল আসার পর থেকে কুল শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্কোর, ক্যারাটিল ও টিল নামের কীটনাশক সাত থেকে আট বার ¯েপ্র করতে হয়। নিজের এক বিঘা জমিতে কুল চাষে গড়ে প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। বিক্রি হয় ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকায়। সব মিলিয়ে আট বিঘা জমিতে বছরে চার লাখ টাকা লাভ হয়।
তিনি জানান, কুল ওঠার পরপরই এক কেজি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় পাইকারি বিক্রি করেছেন। বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়। সিঙ্গা বাজার থেকে ট্রাকে করে প্রতিদিন শতাধিক মন কুল রাজধানীর কাওয়ান বাজার, ওয়াজঘাট ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যায়। সুস্বাদু হওয়ায় পঞ্চগড়ের পরপরই তার এলাকার কুল সারা দেশে সুখ্যাতি লাভ করেছে।
আবুল কাশেম জানান, কুল চাষ করে তিনি ছয় কক্ষ বিশিষ্ট বাড়িতে ছাঁদ দিয়েছেন। কিনেছেন পাঁচ বিঘা জমি। পাকা পায়খানা, বাথরুমের পাশাপাশি টিউব ওয়েল ও শ্যালো মেশিন বসিয়েছেন। চার ছেলের পড়াশুনার খরচ চালানোর পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে দিয়েছেন। কিনেছেন নিজের ও চার ছেলের জন্য পাঁচটি মোটর সাইকেল। মেয়ের পড়াশুনা শেষ করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ব্যাংকে রেখেছেন পাঁচ লক্ষাধিক টাকা। তার দেখাদেখি এলাকার অনেকেই হাইব্রিড কুল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকারি বিপণন ব্যবস্থা না থাকার ফলে চাষীরা কুলের ন্যায্য দাম পায় না। তাছাড়া সরকারিভাবে কোন ঋণ না পাওয়ায় অধিকাংশ চাষীরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জমির পরিমান অনুযায়ী দাদন নিয়ে থাকে। ফলে সারা মৌসুমে দাদনদাতার কাছে কম মূল্যে কুল বিক্রি করা ছাড়া কোন উপায় থাকে না। ফলে চাষীদের ভাগ্য পরিবর্তন না হলেও মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হয়ে থাকে।
কলারোয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা স্বপন কুমার খাঁ জানান, কুল চাষে সিঙ্গা গ্রামই এলাকার নতুন পরিচিতি এনে দিয়েছে। ওই গ্রামের চাষীদের দেখাদেখি উপজেলার হুরুলিয়া, সাতপোতা, বেড়বাড়ি, দরবাসা, বহুড়াসহ বেশকয়েকটি গ্রামে কুল চাষ হয়েছে। চাষীরা চাইলেই কৃষিবিভাগ পরামর্শ দিয়ে থাকে। তবে আবেদন করলে চাষীরা যাতে ব্যাংক থেকে সহজ স্বর্তে ঋণ পান সেজন্য তিনি উদ্যোগ নেবেন।