নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে তৃণমূলের কর্মী সমর্থকরা চায় নেতৃত্ব: জনগণ চায় নিরাপত্তা: কী বলবেন আজ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ?


প্রকাশিত : মার্চ ২০, ২০১৩ ||

শহীদুল ইসলাম/এম জিললুর রহমান: জামায়াত-শিবির কর্তৃক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল, সারা দেশে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নৈরাজ্য এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতা প্রভাষক এএমবি মামুন হোসেনের নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে ১৪ দলের বিশাল জনসভা আজ। জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে আসছেন আওয়ামী লীগে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলল করিম সেলিম এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে আসছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব উল-আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক এমপি, জাসদের সহ-সভাপতি এড. রবিউল আলমসহ ১৪ দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।
জনসভা ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের আগমনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশার অন্ত নেই। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের দিকে তাকিয়ে আছেন তারা। দলীয় তৃণমূল মানুষের প্রত্যাশা সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা বিভিন্ন সমস্যার কথা বলেছেন। তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় নেতাকর্মী মনে করেন, সাতক্ষীরায় জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবে ছিন্ন ভিন্ন হয়েছে গোটা জেলা। জামায়াত- শিবিরের নেতা কর্মী ও সমর্থকরা সংখ্যায় আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি না হলেও তারা ছিলো সংগঠিত। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা হামলা, ভাংচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ করেছে। বেছে বেছে সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীদের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে জামায়াত শিবির। হত্যা করেছে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মামুনকে। সরকারি রাস্তার দু’ধারে লাগানো গাছ কেটে তা সড়কের উপর ফেলে যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেয়। যাতে আইন শৃংখলা রক্ষা বাহিনী গ্রামে প্রবেশ করতে না পারে। এ সুযোগে জামায়াত শিবির গ্রামে গ্রামে তাণ্ডব চালিয়েছে।
তৃণমূল নেতারা মনে করেন, জামায়াত-শিবিরের নেতা কর্মীরা সংখ্যায় বেশি নয়। তবে তারা সংঘবদ্ধ। অপরদিকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের নেতা কর্মী ও সমর্থকরা সখ্যায় বেশি হলেও তারা সংঘবদ্ধ নয়। সাধারণ মানুষের ভাষ্যমতে, জামায়াত শিবির যে সময় তান্ডব লীলা চালিয়েছে সে সময় তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীরা দলীয় নেতা কর্মীদের পাশে পায়নি। দলের একজন জামায়াত শিবিরের মার খেয়েছে আরেকজন দাড়িয়ে দেখেছে। প্রতিবাদ করেনি। সংঘবদ্ধ হয়নি। এমনকি নিজে বাঁচার জন্য অনেকে আপোষ করে ঘরে চোরের মত পালিয়ে থেকেছেন। সাধারণ মানুষও ধ্বংশযজ্ঞ, নৈরাজ্য, গাছ কাটা, রাস্তা কাটা, কালভার্ট কাটা এবং সশস্ত্র মহড়া সহ্য করেছে নীরবে। শান্তিপ্রিয় মানুষ এসব দেখতে বাধ্য হয়েছে। ভিতরে ভিতরে তারা ছিলো জামায়াত শিবিরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর। কিন্তু দলীয় নেতা কর্মীদের কাছে না পেয়ে তারাও হতাশ হয়েছেন।
এদিকে তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতা কর্মী দাবী করেছেন, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগ হাতছাড়া করেনি জামায়াত। তাছাড়া দলের দীর্ঘদিন কোন কাউন্সিল না হওয়ায় নেতা কর্মীরা হতাশ। তাদের মতে, ১৪ দলের নেতা কর্মীদের মধ্যে কোন সমন্বয় সভা ইতেপূর্বে হয়েছে কীনা তা তারা বলতে পারেন না। ১৪ দলের মধ্যে সমন্বয় না থাকার দুর্বলতাকে জামায়াত শিবির সুযোগ হিসাবে নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অনেকেই। প্রশাসনও জনসাধারণের সহায়তার অভাবে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। প্রশাসনের দুর্বলতা ও স্বজনপ্রীতিকেও নৈরাজ্যের জন্য দায়ী করেছেন অনেকে।
সাধারণ মানুষ মনে করেন, শিকড়ে জামায়াত অথচ নব্য আওয়ামী লীগার হয়ে দলে প্রবেশ করেছেন অনেকে। সম্প্রতি জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে কাউন্সিল হয়েছে। কমিটিও গঠন হয়েছে। এসব কমিটিতে জামায়াত শিবিরের অনেক নেতা কর্মী ঢুকে পড়েছে। ফলে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবে এসব নব্য আওয়ামী লীগার তৃণমূল পর্যায়ে ওয়ার্ড কমিটির সদস্যরাও যদি ঘুরে দাড়াতেন তাহলে প্রত্যেক ইউনিয়নে ৯টি কমিটি একত্রিত হলে জামায়াত শিবির পালানোর পথ পেতো না। শুধু সংগঠিত না থাকার কারণে জামায়াত শিবির বিনাবাধায় বর্বর হামলা চালিয়েছে। এমনকি ২৮ ফেব্র“য়ারীর তান্ডবের পর ৩ মার্চের হরতালের সময় জেলা বাসটার্মিনাল থেকে জেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার অনুসারীরা যে যার মত পালিয়ে যায়। তাদের মোবাইল ফোন পর্যন্ত বন্ধ করে রাখা হয়। পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রনে না আসা পর্যন্ত তাদের কাউকে আর মাঠে তো দুরের কথা শহরে দেখা যায়নি। সুত্র আরো জানায়, এসময় নেতাকর্মীদের বিভিন্নভাবে বিভ্রান্ত করা হয়।
সুত্র আরো জানায়, থানায় যেয়ে গত কয়েকমাস আওয়ামী লীগের যে সব নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তারকৃত জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মীদের ছাড়াতে ব্যস্ত ছিল তারাও বসন্তের কোকিলের মত এ সময় হারিয়ে যায়। যদিও থানা পুলিশে ওঠাবসা করেন আর এক ধরণের নেতাকর্মীরা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে সবকিছু পুলিশ ও প্রশাসনের উপর চাপিয়ে নিজেদের গা বাঁচানোর চেষ্টা শুরু করেন। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা ক্ষোভের সাথেই জানান, ইউনিয়ন ওয়ার্ড পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাদের একাংশ জামায়াতের সাথে সমঝোতা করে নিজেদের সহায় সম্পদ বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। আর একদল এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। যদিও গত চার বছর তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নামে নানান অপকর্ম করেছেন এই সব নেতারা। ফলে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে এই জেলায় সর্বোচ্চ পরিমান উন্নয়ন হলেও এবং তার দ্বারা সাধারণ মানুষ সুফল ভোগ করলেও তা কাজে আসেনি ২৮ ফেব্র“য়ারী থেকে ৫ মার্চ পর্যন্ত জেলায় নজিরবিহীন তান্ডবের ঘটনায়। এমনকি আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং সংগঠনের নামের আগে বঙ্গবন্ধুর নাম দিয়ে নতুন নতুন গজিয়ে ওঠা বিভিন্ন নামের সংগঠনের যেসব নেতাদের ঠেলায় এর আগে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী এমপিদের সভা সমাবেশের মঞ্চ এবং থানায় ওসির রুমে চেয়ার পেত না সাধারণ মানুষ সেইসব নেতাদেরও টিকিটি দেখা যায়নি। শ্রমিকদের কিছুটা বেশী উপস্থিতি ছাড়া ছাত্র, যুব, কৃষক, সৈনিক, প্রজন্ম, স্বেচ্ছাসেবক, বাস্তহারা, মহিলা সংগঠনের বড় বড় পদে থাকা দু’একজনকে এতিমের মত মূল দলের রাস্তায় থাকা নেতাদের পিছে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। নিজেদের নেতৃত্ব দেখানোর কোন সুযোগও পাননি তারা কর্মী সমর্থক না থাকায়।
তুণমূল পর্যায় থেকে দাবী উঠেছে, আওয়ামী লীগের যারা আছেন তারা সম্মিলিতভাবে ডাক দিলে জামায়াত শিবির খুজে পাওয়া যাবে না। বিশেষ করে ৫ মার্চের পর থেকে জামায়াত শিবিরের অধিকাংশ নেতাকর্মী এখনো পালিয়ে রয়েছেন। জামায়াতের সাধারণ সমর্থকদের অনেকে এখনো ঘের ভেড়ি বিল খালে রাত কাটাচ্ছেন। অনেকে আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের সেইসব পালিয়ে থাকা নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেছেন থানা পুলিশ মামলা থেকে বাঁচার জন্য। তৃণমূল নেতাকর্মীরা জানান, পাড়ায় পাড়ায় দলের গ্রহণযোগ্য নেতাদের সামনে এনে সন্ত্রাস দমন কমিটি গঠন করে তা কার্যকর করতে হবে। জনগণের পাশে থেকে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সংগঠিত জনগণকে সাহস দিয়ে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানোর নেতৃত্ব দিতে হবে। জামায়াতের অপপ্রচার, গুজব ও মিথ্যাচার সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে। ১৪ দলের নেতা কর্মী ও সমর্থকদের উজ্জ্বীবিত করতে হবে। এজন্য দরকার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সর্বাগ্রে নিরসন করা।
দলীয় নেতা কর্মীদের প্রত্যাশা ১৪ দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এসব সমস্যা আমলে নেবেন এবং সুষ্ঠু সমাধান করে আওয়ামী লীগকে পুনগঠিত করে শক্তিশালী করবেন। ত্যাগী, পরীক্ষিত, সাহসী, সৎ নেতৃত্বকে প্রাধান্য দিবেন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এ প্রত্যাশা ১৪ দলের নেতা কর্মীদের।