ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পৌর এলাকার ২০টি ভবন: তালিকা প্রস্তুতের কাজ শুরু, সোনালী ব্যাংক ও পিএন বিয়াম স্কুলের ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা


প্রকাশিত : মে ১, ২০১৩ ||

এম জিললুর রহমান: সাতক্ষীরা পৌর এলাকায় বসতবাড়ি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন অফিস ও মার্কেটের অন্তত ২০টি ভবন ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় দাড়িয়ে আছে। এ সব ভবনের বেশ কয়েকটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও ঝুঁকি এড়াতে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। পরিত্যক্ত ঘোষিত এ সব ঝুকিপূর্ণ ভবনের মধ্যে অথবা পাশে অনেকে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছে, বছরের পর বছর ব্যবসা চলছে। একই সাথে চলছে সরকারি অফিসের কার্যক্রমও। ঝুকিপূর্ণ এসব ভবন যেকোন সময় ধসে পড়ে ঘটতে পারে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। সাভার ট্রাজেডির পর ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা ঝুকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে। মঙ্গলবার সাতক্ষীরা সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখা ও পিএন বিয়াম স্কুল ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ভবন দুটির কার্যক্রম অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলেও মতামত দিয়েছেন সাতক্ষীরার গণপূর্ত বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ।
মঙ্গলবার সকালে ও দুপুরে সদর ইউএনও আছাদুজ্জামান, সদর উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম ইয়াফি, গণপূর্ত বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হারুন অর রশিদসহ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী সরেজমিনে পরিদর্শন ভবন দুটি পরিত্যক্ত ঘোষণার জন্য সুপারিশ করেন।
এদিকে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ বলছে, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তালিকা প্রকাশ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা প্রশাসন বলছে, মঙ্গলবার পিএন বিয়াম স্কুল পরিত্যক্ত ঘোষণার মধ্য দিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। তবে এ নিয়ে মাথা ব্যথা নেই পুলিশ প্রশাসনের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সাতক্ষীরা পুরাতন কোর্ট ভবনটি বৃটিশ আমলে নির্মিত। ১৯৮৬ সালে ঝূকিপূর্ণ নির্ণয় করে তা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়, পরে নতুন কোর্টে আদালতের কাজ কর্ম শুরু হয়। একই স্থানে ট্রেজারি শাখা ভবন, জেলা সিআইডি ভবন ও জেলা ট্রাফিক অফিস পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও সেখানে নিয়মিত অফিস আদালতের কাজ চলছে। পুরাতন ট্রেজারি ভবনে এখন পুলিশ সদস্যরা থাকেন।
পুরাতন কোর্ট ভবনে চলছে অনেকগুলো সহকারি জজ আদালতের কার্যক্রম। গত দুই বছর আগে পুরাতন কোর্টের ছাদের অংশ বিশেষ ভেঙ্গে পড়ে আদালত চলাকালিন বেশ কয়েকজন আহত হয়। ট্রাফিক অফিস এবং সিআইডি অফিসেরও একই অবস্থা। এর পাশেই আছে পুরাতন জেলখানা, বর্তমানে অফিসার্স ক্লাব। সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিস খাতা কলমে পরিত্যক্ত দেখানো হলেও সেখানে রাখা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র। বারান্ডায় বসে কয়েকজন সিনিয়র দলিল লেখক ময়াক্কেল নিয়ে দলিল লেখার কাজ করেন। শুধু তাই নয় ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন ভবনের সামনের অংশের উপরে বাম পার্শ্বেও ফাটল দেখা দিয়েছে।
শহরের পোস্ট অফিস মোড়স্থ সিটি ক্লিনিক ভবন জরাজীর্ণ। এ ভবনে পর্যায়ক্রমে তলার পরে তলা দেয়া হয়েছে। পাকিস্তান আমলের এ বিল্ডিংসহ তার পাশের আরও একটি ভবন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে, তার নীচে রয়েছে কয়েকটি দোকান।
পোস্ট অফিস এলাকার বাসিন্দা কাজী মাতিন ও এমএম মজনু জানান, জন্মের পর থেকে এ দুটি বিল্ডিং দেখে আসছি। একই সড়কে সু-উচ্চ ভবন খান মার্কেট। চতুর সাইডে ঘর নির্মাণ করে গড়ে তোলা হয়েছে এ মার্কেটটি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, খান মার্কেটের রাস্তার পাশের অংশ কমপক্ষে এক থেকে দেড় ফুট বসে গেছে। জাহান প্রিন্টিং প্রেস ও উপরে ডা. এবাদুল্যার চেম্বারে ঢুকলেই বোঝা যাবে ব্যাপারটা কি। এছাড়াও দিগন্ত আবাসিক হোটেলের দিকে ভবনটি বেশ কিছুটা হেলে আছে দীর্ঘদিন। ৩ তলা ও ৪ তলা এ মার্কেটে যেকোন সময় দুর্ঘটনার আশংকা রয়েছে বলে মনে করেন অভিজ্ঞ মহল। একই এলাকায় পাকাপোলের ডান পাশে রয়েছে মরহুম আব্দুল গফুর ভবন। ভবনটি তার ছেলেরা ব্যবসা বাণিজ্যের অফিস হিসেবে ব্যবহার করলেও মার্কেটটি চরম ঝুকির মধ্যে রয়েছে।
ওই এলাকার ব্যবসায়ী অজিত বাবু জানান, এসব ভবন পাকিস্তান আমলের, শুধুমাত্র ইটের উপর দাড়িয়ে আছে দুইতলা এই বিল্ডিংটি। যেকোন সময় সমূহ বিপদের আশংকা রয়েছে।
এদিকে নিউ মার্কেটের দিকে আসতে বাম হাতে রয়েছে সোনালী ব্যাংক এর প্রধান কার্যালয়। সেটি খাতা কলমে পরিত্যক্ত দেখানো হলেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুই তলা এই ভবনের মধ্যে দৈনন্দিন কাজ করছেন ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা। একই সড়কে রয়েছে লাবনী হল, ফ্রেন্ডস ড্রামেটিক ক্লাব, লাবনী মার্কেট ও তার অপজিটে নিউ মার্কেট। লাবনী মার্কেট ঝুঁকিপূর্ণ বলে দুই তলার অনেক ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে ছেড়ে দিয়েছেন। ছাদের ঢালাই ছাড়িয়ে প্লাস্টার খসে রড বেরিয়ে পড়লেও চলছে ব্যবসায়ীদের কাজ কর্ম। ৮০’র দশকে নির্মিত হয় নিউ মার্কেট। অনাধুনিক পদ্ধতিতে তৈরি এই দুই তলা মার্কেটটি শুরুতেই ছিল ঝুঁকির মুখে, এখনও আছে। অনেক জায়গায় ফেটেছে, প্লাস্টার খসে রড বেরিয়ে পড়লেও কর্তৃপক্ষের নেই কোন তদারকি, তদুপরি ব্যবসায়ীরা নির্বিঘেœ ব্যবসা করছেন। শহরের কামালনগর এলাকায় গেল মাসের প্রথমদিকে ৩ তলার প্লান নিয়ে ৬ তলা বিল্ডিং করায় ঝড়ে অংশ বিশেষ ভেঙ্গে পড়ায় এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিষয়টি পৌরসভা দেখছেন বলে জানাগেছে। শহরের ইটাগাছা হাটের বিপরীেিত শ্যামনগরের সাবেক এমপি ফজলুল হকের একটি ৩ তলা ভবন রয়েছে জরাজীর্ণ অবস্থায়। ওই ভবনে ইতোপূর্বে সোনালী ব্যাংক থাকলেও ঝুঁকির কারণে গত দুই বছর আগে ছেড়ে দিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে ওই ভবনেই রয়েছে বিভিন্ন অফিসসহ নীচে একাধিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। এরপর পানি উন্নয়ন বোর্ড। সেখানের একটি বিল্ডিংও অফিস হিসেবে চলার উপযোগী মনে করেন না ঠিকাদারসহ অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারিরা। ওই অফিসের আওতাধীর স্টাফ কোয়াটারগুলোও মান্ধাতার আমলের, ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। সেখানকার অনেকগুলো ভবন পরিত্যক্ত করা হলেও কাজকর্ম চলছে। আবার পড়েও আছে। শহরের বাসটার্মিনাল এলাকায় ঠিক পাওয়ার হাউজের বিপরীতে রয়েছে সাতক্ষীরা অটো নামের একটি দুই তলা ভবন। ১০ বছর আগেই দুই তলা এই ভবনের ছাদ দিয়ে পানি পড়ত। এখন তার উপরে নির্মাণ করা হচ্ছে ৩ তলা। যার আংশিক কাজ শেষ। ভবনের মালিক ইতোপূর্বে পৌরসভার পানি শাখার বাবুল থাকলেও বর্তমান মরহুম সাংবাদিক আব্দুল খালেকের ছেলে আবুল কালাম। ঠিক এই ভবনের বিপরীতে রয়েছে আব্দুল গফ্ফারের একটি মার্কেট। দুই তলা একটি ভবনের নিচের দিকে চিকন থাকলেও উপরের দিকে বাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি কুয়ার মধ্য থেকে গড়ে তোলা হয়েছে ভবনটি। যথেষ্ট ঝুঁকির মুখে রয়েছে ভবন দুটি।
এছাড়া সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল রয়েছে চরম ঝুঁকির মধ্যে। আর ঝুঁকির কারণে গেল বছর সংস্কার করার সময় ছাদ দিতে না পেরে উপরে টিন লাগানো হয়েছে। শহরের নারিকেলতলা মোড়ে মেইন রাস্তার পাশে ছোট এক টুকরো জায়গায় টুইন টাওয়ারের মত গড়ে তোলা হয়েছে একটি ভবন। যা দেখলেই রাস্তায় চলমান লোকজন ও পাশের ব্যবসায়ীরা আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এছাড়াও শহরের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য প্রাচীন আমলের বিল্ডিং রয়েছে। যা হতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ।
জেলা প্রশাসক ড. মুহা. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার জানান, ঝুকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করতে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে শহরের পিটিআই মাঠে অবস্থিত পিএন বিয়াম স্কুল পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। পৌর মেয়রকে তার এলাকার ঝুকিপূর্ণ ভবনের তালিকা দিতে বলা হয়েছে বলে তিনি জানান।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী দিপক কুমার মিত্র জানান, সোমবার পৌরসভায় মিটিং করে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার পর মেয়র ও জেলা প্রশাসক সমন্বয় করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এছাড়াও পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিদ শুভ্র চন্দ্র মহলী, নির্বাহী প্রকৌশলীকে প্রধান করে ৩ সদস্যের কমিটির কথা স্বীকার করে বলেন, গঠিত টিম কাজ শুরু করেছে। নির্ধারিত সময়ে রিপোর্ট দেয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করছেন।