চরম ঝুঁকিতে শত বছরের লাবনি হল-মার্কেট


প্রকাশিত : মে ৮, ২০১৩ ||

এম জিললুর রহমান: বৃটিশ আমলে লাবনী সিনেমা হল আর স্বাধীনতার পরপরই তৈরি হয় লাবনী মার্কেট। পরিকল্পিত কোন নকশা এবং অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠা সিনেমা হলটির বয়স শত বছরেরও বেশি। একই সাথে চার দশকের অধিক সময় পার করেছে লাবনী মার্কেটও। দুটোরই অবস্থা ভঙ্গুর। যেকোন সময় লাবনী সিনেমা হল, মার্কেট ও জেলা সাংস্কৃতিক পরিষদ ভবন ধসে পড়ার আশংকা করছেন শহরের বিজ্ঞজনেরা। ইতোমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ভেঙ্গে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার চেষ্টায় বাধ সেজেছে প্রভাবশালী একটি মহল।
খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, ১৯১১ সালে গড়ে উঠে লাবনী সিনেমা হল। ইটের গাথনি, লোহা আর কাঠের ফ্রেম এবং টিনের ছাউনি দিয়ে নির্মিত হয় হলটি। এরপর পাকিস্তান আমল শেষ হয়ে ১৯৭১ সালে জন্ম নেয় বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পরপরই ৭৩-৭৪ সালে গড়ে উঠে লাবনি মার্কেট। তৎকালিন কোন প্রকার প্লান পরিকল্পনা ছাড়াই গড়ে ওঠে মার্কেটটি। শুরুতেই যারা এ মার্কেটে ভাড়াটিয়া হিসেবে ব্যবসা শুরু করেন তাদের মাসিক ভাড়া ছিল ৭৫ থেকে ১০০ টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, প্রথম এবং মূল ভাড়াটিয়াদের খাতা কলমে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম দেখিয়ে ডিড করে দেওয়া হয়। জেলা সাংস্কৃতিক পরিষদের তৎকালিন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন কামরুল ইসলাম ফারুক। পদাধিকার বলে একই সংগঠনের সভাপতি ছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক। ২৯ শতক জমির উপর গড়ে উঠা লাবনী মার্কেট ও সিনেমা হলের ৩৩টি ঘর দেখভাল করার দায়িত্ব পড়ে জেলা সাংস্কৃতিক পরিষদের উপর।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাংস্কৃতিক পরিষদের তৎকালিন সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম ফারুক ৩৩টি ঘরের মধ্যে নিজের দুই ছেলের নামে দুটি ও স্ত্রীর নামে ১টি দোকান বরাদ্দ নেন। বাকি দোকানগুলো অন্যান্যরা ব্যবসা করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে কামরুল ইসলাম ফারুকের তত্ত্বাবধানে থাকে জেলা শহরের বৃহৎ এ প্রতিষ্ঠানটি। এরপর বিগত ২০০৭ সালে সাংস্কৃতিক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন হেনরি সরদার। তিনি দায়িত্ব পাওয়ার পর খোঁজ নিয়ে দেখেন প্রতিষ্ঠানটিতে কোন মূলধন নেই। এক পর্যায়ে ২০১০ সালের ৩০ জুন ব্যবসায়ীদের নামে মার্কেটের উপরের ঘর ৩০০ টাকা ও নীচের ঘর ৫০০ টাকা করে ভাড়া বাড়িয়ে নতুন চুক্তিপত্র করা হয়। একই সময়ে লাবনী সিনেমা হলের মালিকের কাছে ভাড়া পাওনা হয় প্রায় ৫ লাখ টাকা। নতুন করে চুক্তিপত্র অনুযায়ী ২০১০ সালের জুনে ব্যবসায়ীদের চুক্তির সময়সীমা শেষ হওয়ায় জেলা সাংস্কৃতিক পরিষদ ওই মার্কেট নতুনভাবে নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। সে মোতাবেক বিগত ১০ সালের মার্চ মাসে দোকান ছাড়তে ব্যবসায়ীদের নোটিশ দেয় জেলা সাংস্কৃতিক পরিষদ। ওই বছরের জুন মাসে স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে টেন্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদার আহবান করা হয়। অনেকেই অংশগ্রহণ করেন এই টেন্ডারে।
এরই মধ্যে ২০১১ সালের ১৫ জুলাই সাতক্ষীরা গণপূর্ত বিভাগ-১ এর উপ-সহকারি প্রকৌশলী এ.কে.এম ইসমাইল ও শেখ ইকবাল হোসেন লাবনী হলসহ মার্কেটটি সরেজমিনে তদন্ত করে ২৫ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়, বর্ণিত ভবনটি ১৯১১ সালে নির্মিত এবং টিন সেড ভবনটিসহ দোকানগুলো সম্পূর্ণ ভাবে সংস্কার ও মেরামত অনুপযোগী এবং যেকোন সময় বড় ধরণের কোন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। জরাজীর্ণ ও ঝুকিপূর্ণ ভবনটি কোনভাবে বর্তমানে ব্যবহার উপযোগী নয় বলে পরিদর্শনকারীরা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী গণপূর্ত বিভাগ সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলী নিশিত রঞ্জন পাল ঝুকিপূর্ণ ভবন ব্যবহার না করার জন্য পরামর্শ প্রদান করা হল, মর্মে গত ২৮ জুলাই ২০১১ এক প্রতিবেদনে মতামত প্রদান করেন।
জেলা সাংস্কৃতিক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হেনরি সরদার জানান, সুলতানপুর গ্রামের ঠিকাদার মুসফিকুর রহমান জেলা সাংস্কৃতিক পরিষদকে ৫ লাখ টাকা দিয়ে নিজ খরচে ভবন ভেঙ্গে নেয়ার চুক্তিপত্রে আবদ্ধ হন। ঠিক ওই বছরের একই সময়ে মার্কেটটি সংস্কারে বাধা হয়ে আহুত টেন্ডারের বিরুদ্ধে মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনের একটি বেঞ্চে রিট পিটিশন দাখিল করেন ভূইফোঁড় সংগঠন দরবার হল’র সাধারণ সম্পাদক এড. আকবার হোসেন। বাদীর দায়েরকৃত রিট পিটিশনের শুনানি শেষে বিগত ২০১১ সালে প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান লাবনী সিনেমা হল ভাঙতে আহুত টেন্ডারের বিষয়ে মহামন্য হাইকোর্ট, পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করতে ৬ সপ্তাহের সময় দিয়ে টেন্ডারের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেন জেলা সংস্কৃতিক পরিষদকে। জবাব দাখিলের পর এক দফা শুনানি শেষে আরও ৪ সপ্তাহ সময়সীমা বৃদ্ধি করেন উচ্চ আদালত। আদালতের এ নির্দেশ অনুযায়ী বিগত ২০১২ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে উপরিউক্ত আদেশের সময় সীমা শেষ হয়েছে। অন্যান্য মামলাগুলো ভাড়া প্রাপ্তি সংক্রান্ত। ফলে সিনেমা হলসহ মার্কেটটি ভাঙতে এখন আর কোন বাধা নেই।
এরই মধ্যে কথিত দোকান মালিকরা জেলা সাংস্কৃতিক পরিষদের বিপরীতে দরবার হলের পক্ষে মার্কেট এবং হলের ভাড়া দাবি করায় কাকে ভাড়া দেয়া হবে মর্মে এড. আকবার হোসেন, দোকানদার এসোসিয়েশনের পক্ষে জনৈক মিজানুর রহমান, লাবনী হলের মালিক ঠিকাদার রুহুল আমীনের নিকট থেকে দ্বিতীয় দফায় লিজ নেয়া জনৈক জাদরিদ সদর সহকারি জজ আদালতে পৃথক ৩টি মামলা দায়ের করেন। যার নং ০৩/২০১১ ও ২৪/২০১১ এছাড়াও ৬৩/১১। এসব মামলার কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে। ঝুলে আছে ওই মার্কেটের ভাড়া কে পাবে! এ বিষয়টি। কিন্তু মার্কেটটি ভাঙ্গতে এখন আর কোন বাধা নেই এমনটি জানিয়েছেন জেলা সাংস্কৃতিক পরিষদের পক্ষের আইনজীবী শফিকুল ইসলাম খোকন।
তিনি বলেন, টেন্ডারের বিরুদ্ধে দরবার হলের দায়েরকৃত রিটের পর মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনের একটি বেঞ্চ ৬ সপ্তাহের মধ্যে আদালতে জবাব দাখিলের নির্দেশ দেন এবং টেন্ডারের কার্যক্রম স্থগিত করেন। জবাব দাখিলের পরে সেটির শুনানিঅন্তে আরও ৪ সপ্তাহ সময় বৃদ্ধি হয়। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর বাদী পক্ষের কোন উদ্যোগ না থাকায় লাবনী হল ও মার্কেট ভাঙতে এখন কোন আইনি জটিলতা নেই বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, মার্কেটটি নিয়ে এ পর্যন্ত মোট ৪টি মামলার উদ্ভব হয়েছে।
এ ব্যাপারে জেলা সাংস্কৃতিক পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম ফারুক মার্কেটের নতুন ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে আহুত টেন্ডারের বিপক্ষে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা বহাল আছে দাবি করে বলেন মার্কেটটি ভাঙ্গার কোন সুযোগ নেই।
তবে খোড়া অজুহাত প্রত্যাখ্যান করে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক হেনরি সরদার জানান, আদালতের কোন বাধা না থাকলেও সভাপতির দায়িত্বে জেলা প্রশাসক থাকায় তিনি কোন ঝামেলায় যেতে চান না। ফলে এখনও পড়ে আছে ভঙ্গুর এ মার্কেটটি। তিনি আরও বলেন, ২০০৭ সালে আমি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে এসে প্রতিষ্ঠানের নামে ১২ লাখ টাকার এফডিআর করেছি। বর্তমানে সাড়ে ১৩ লাখ টাকার ফান্ড রয়েছে। এর আগে আমি তেমন কিছুই পাইনি। এখুনি ভবনটি ভেঙ্গে পড়লে দায়ভার কে নেবে এমন প্রশ্নের জবাবে হেনরি সরদার বলেন, প্রশাসনিক জটিলতা না থাকলেও ঝামেলার কারণে হচ্ছে না। তবে সভাপতি জেলা প্রশাসক ইচ্ছা করলে ১ ঘণ্টার মধ্যে জায়গা খালি হয়ে যাওয়া কোন ব্যাপার নয়।
পৌর মেয়র এমএ জলিল জানান, লাবনী মার্কেট নিয়ে কি সমস্যা আছে তা আমার জানার বিষয় নয়। জীবনহানির ঘটনা যেখানে বিদ্যমান, সেখানে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে পৌরসভার পক্ষ থেকে এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুকিপূর্ণ ভবণ নির্ণয় করতে পৃথক পৃথক কমিটি গঠন হয়েছে, তারা সরেজমিনে তদন্তকাজ অব্যাহত রেখেছেন, প্রতিবেদন অচিরেই হাতে আসবে। এ প্রতিবেদন আসার পর জেলা প্রশাসনের সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।