শ্যামনগরে চিংড়ি ঘেরে ভাইরাসের আক্রমণ, লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে শংকিত চাষী


প্রকাশিত : মে ৮, ২০১৩ ||

সামিউল মনির, শ্যামনগর: শ্যামনগরে চিংড়ি ঘেরগুলোতে ব্যাপকহারে ভাইরাসের আক্রমণ দেখা দিয়েছে। বছরের শুরুতে রপ্তানিযোগ্য চিংড়ি শিল্পে বিপর্যয় দেখা দেওয়ায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থার প্রেক্ষিতে পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ঘেরগুলোতে চাষের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি না করাসহ চাষীদের অসতর্কতাকে দায়ী করে অপরাপর কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর।
শ্যামনগর উপজেলার রমজাননগর, কৈখালী, আটুলিয়াসহ উপকূলীয় এলাকার অসংখ্য চাষীর সাথে কথা বলে চিংড়ি ঘেরগুলোতে ব্যাপকহারে মড়ক লাগার তথ্য পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত চাষীরা জানান, পরিণত হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে যেমন মাছ মারা যাচ্ছে, তেমনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাছের পোনা ফুটছে না। তাদের দাবি গত বছরের নাজুক পরিস্থিতির পর চলতি বছরে এমন অবস্থা অব্যাহত থাকলে অনেক চাষী সর্বশান্ত হয়ে যাবে।
কৈখালী গ্রামের মাহাবুব আজাদ জানান, তার বিশ বিঘা জমির চিংড়ি ঘেরে এপ্রিল মাসের শেষের দিকে প্রথম কোটার মাছ ওঠার কথা। কিন্তু হঠাৎ করে গত সপ্তাহে তার প্রথম কোটায় দেয়া দশ হাজার মাছের অধিকাংশ মারা গেছে। তিনি জানান, প্রথম কোটার মাছ দিয়ে জমির হারি (লিজের টাকা) পরিশোধ করার কথা। এখন জমির মালিককে বুঝিয়ে দ্বিতীয় কোটার মাছের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
সোরা গ্রামের শহীদুজ্জামান জানায়, তার চল্লিশ বিঘা জমিতে চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে মাছ ধরার কথা। কিন্তু তার দু’সপ্তাহ আগে হঠাৎ করে মাছে মড়ক লাগে। কোন কিছুতে কাজ না হওয়ায় বাধ্য হয়ে অপরিণত মাছ স্বল্পমূল্যে বাজারজাত করতে হয়েছে। শহিদুজ্জামান আরও জানান, গত বছর উপজেলার পাঁচ শতাধিক চিংড়ি চাষীর নামে পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগে মামলা করে। ফলে সে বছর চিংড়ি উৎপাদন অনেকটা বন্ধ থাকার পর এবছর উৎপাদন বিপর্যয় চাষীদের দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তুলেছে।
উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর সরবরাহকৃত তথ্য থেকে জানা যায়, এবছর শ্যামনগর উপজেলার প্রায় ১৪৬৫৯২ হেক্টর জমিতে ১৩৭৯১টি চিংড়ি ঘের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সে মতে এবছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৮০০ মে. টন। কিন্তু অনাবৃষ্টি, পরিবেশ বিপর্যয়, পানিতে লবণাক্ততার পরিমান বেড়ে যাওয়াসহ অন্যান্য কারণে এবছর লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়া নিয়ে শংকা দেখা দিয়েছে।
মৎস্য অধিপ্তরের অপর একটি তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, শ্যামনগরের উপকূলীয় এলাকার অধিকাংশ ঘেরের পানির পিপিটি (লবণাক্ততা পরিমাপের একক) বাইশ থেকে আরও বেশী। কোন কোন ক্ষেত্রে পানিতে পিপিটি’র পরিমান প্রায় ৪০।
কিন্তু যেসব নার্সিং পয়েন্ট থেকে পোনা আমদানি করা হচ্ছে সেসব নার্সিং পয়েন্টের পোনাগুলো আসছে দশ থেকে বার পিপিটি সহ্য ক্ষমতা নিয়ে। যেকারণে ঐ পোনাসমূহ ঘেরে অবমুক্ত করার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রে মারা যাচ্ছে। এছাড়া কৃষকের অসচেতনতার কারণে ঘেরের পানিতে ভটকা পঁচে পানি দুর্গন্ধযুক্ত হওয়া ছাড়াও পোনা অবমুক্ত করার আগে অধিক পিপিটিযুক্ত পানিতে নার্সিং না করার কারণে মাছ মারা যাচ্ছে।
আটুলিয়া গ্রামের তরুণ মন্ডল জানান, উৎপাদনে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে তার পঞ্চাশ বিঘা জমির ঘেরের প্রথম চালানের সমুদয় মাছ মারা গেছে। তিনি আরও জানান, ঘণ ঘণ পানি পরিবর্তনসহ নানা কৌশল অবলম্বন সত্ত্বেও তার অপর একটি ঘেরে পোনা অবমুক্ত করার পর যাবতীয় পোনা মারা গেছে। পানির গভীরতা কম হওয়ার পাশাপাশি নার্সিং পয়েন্টের পানির সাথে ঘেরের পানির লবণাক্ততার ব্যাপক পার্থক্য থাকায় পোনা মারা পড়েছে বলে তারা ধারণা করছেন।
এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তরের সিনিয়র কর্তকর্তা রাজ কুমার বিশ্বাস জানান, জলবায়ু পরিবর্তনসহ তাপমাাত্রার ব্যাপক পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে চিংড়ি চাষের উপর। তিনি আরও জানান, পানির গভীরতা কম থাকা এবং ঘেরে চাষের অনুকূল পরিবেশ সংরক্ষণ না করাসহ নার্সিং পয়েন্টের সাথে ঘেরের পানির পিপিটি’র ব্যাপক তারতম্য মাছ মারা যাওয়ার অন্যতম কারণ। ইতোমধ্যে কয়েকটি ঘেরের মারা যাওয়া মাছ পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট হাতে আসার পর ভাইরাসের এমন তীব্র আক্রমণের প্রকৃত কারণ জানা যাবে। তবে সেমি ইনটেনসিভ পদ্ধতিতে চাষ করে এমন বিপর্যয় এড়ানো যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।