উপকূলীয় এলাকায় খাবার পানির তীব্র সংকট


প্রকাশিত : মে ১১, ২০১৩ ||

শ্যামনগর প্রতিনিধি: মেহেন্দীনগর গ্রামের রবিউল ইসলামের স্ত্রী মর্জিনা বেগম জানালেন, পানি ছাড়া জীবন চলে না। সকাল থেকে বাড়ির কাজ গুছিয়ে এখন গাজি বাড়ির পুকুরে যাচ্ছি পানি আনতি। আগে সিরিয়াল পালি বিকালের আগে বাড়ি ফেরবো। আর ভিড় থাকলি সন্ধ্যে হয়ে যাবে। ওই গহৃবধূর সঙ্গী হওয়া একই গ্রামের মজিদ গাজীর স্ত্রী মুর্শিদা বেগম জানালেন, গোটা এলাকার পানি লোনা। তাই বাধ্য হুয়ে রান্নার পানিও বাইরি থেকে আনতি হচ্ছে।
মধ্যাহ্ন দুপুরের খরতাপে পুড়তে থাকা কাঁচা রাস্তা ধরে উভয়েই যাচ্ছেন প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরবর্তী কৈখালীর গাজি বাড়ির পুকুরে। সেখানে অবস্থিত পিএসএফ থেকে পানি সংগ্রহ করে প্রায় দশ কিলোমিটার রাস্তা পায়ে হেঁটে তারা আবার বাড়িতে ফিরে গৃহস্থলীর অন্যসব কাজ করবেন।
মিষ্টি পানির উৎসসমূহ শুকিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অনাবৃষ্টি আর তীব্র লবণাক্ততার কারণে সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকা শ্যামনগরের সর্বত্র এমন অবস্থা। কোন কোন গ্রামে বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য রীতিমত হা-হা-কা-র চলছে। কেউ কেউ পাঁচ থেকে দশ কিলোমিটার দূরবর্তী স্থান হতে পানি সংগ্রহ করছেন। অসংখ্য মানুষ আবার ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়া কর্দমাক্ত পানি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। দুপুরে প্রচণ্ড রৌদ্রের তীব্রতাকে উপেক্ষা করে অনেকেই কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত পায়ে হেঁটে পানির জন্য বাইরের গ্রামে ছুটে যাচ্ছে।
গত সোমবার বেলা তিনটার উপজেলার রমজাননগর ইউনিয়নের তারানীপুর গ্রামে পৌঁছে দেখা গেলো পাশের বিশালায়তনের সরকারি দিঘী হতে পনের/ষোল জন একত্রে পানি সংগ্রহ করছেন। পুকুরের কর্দমাক্ত পানি কোন কাজে ব্যবহার করা হবে জানতে চাইলে সমস্বরে উত্তর মেলে, “কেন খাবো!”।
পানি নিতে আসা আব্দুুর রশিদ জানা, আশপাশের পাঁচ/সাত গ্রামের মধ্যে সবগুলো পুকুর শুকিয়ে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে কৈখালীর জাদা, সাপখালী, বৈশখালী, কেওড়াতলী ও জয়াখালীসহ রমজাননগরের হাসারচক, মানিকখালী, ভেটখালী ও সোরা গ্রামের মানুষ এই দিঘী হতে পানি সংগ্রহ করে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, আইলা’র পর ২০১০ সালে সুশীলণ পুকুরের পানি ব্যবহারের জন্য একটি পিএসএফ নির্মাণ করে দেয়। গত এক বছর ধরে তা অকেজো হয়েছে। কিন্তু বার বার বলা সত্ত্বেও জনস্বাস্থ্য বিভাগ বা সুশলীন কেউ তা মেরামত করে দিল না। বাধ্য হয়েই পুকুরের কাঁদাযুক্ত পানি নিয়ে একদিন বাড়িতে রেখে পরে খেতে হচ্ছে।
সোরা গ্রামের আব্দুল আলিম জানান, মূলত আইলা’র সময় সব পুকুর ও জলাকার লবণ পানিতে ডুবে যায়। একাধিকবার পুনঃখননের পরও চার বছরে এখন পর্যন্ত ঐসব পুকুরগুলোর পানি লবণমুক্ত হয়নি। এদিকে গত বছর যথেষ্ট বৃষ্টি না হওয়ায় অধিকাংশ পুকুর ইতোমধ্যে পানিশুন্য হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় বাধ্য হয়ে গ্রামের পর গ্রাম পাড়ি দিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
সোরা গ্রামের আব্দুস সাালাম জানান, তার বাড়ির পাশের সরকারি দিঘীতে দেড়/দু’হাত পানি রয়েছে। সে পানি কাদাযুক্ত হয়ে গেছে। তাই দশ কিলোমিটার দূরবর্তী যতীন্দ্রনগর থেকে বাই সাইকেলযোগে পানি এনে ব্যবহার করছেন। তার গ্রামের অনেকেই ড্রামপ্রতি পঞ্চাশ টাকা হিসেবে ভ্যানযোগে একই এলাকা থেকে পানি সংগ্রহ করছে বলে তিনি দাবি করেন।
বাড়ির পাশের টিউবওয়েল থেকে লবণ পানি আসছে আর মক্তব এলাকার টিউবওয়েল বিকল হয়ে রয়েছে উল্লেখ করে মথুরাপুর গ্রামের অধ্যাপক আশুতোষ মন্ডল জানান, পানি নিয়ে মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। চারিদিকে এতো পানি কিন্তু একটু খাবার পানির জন্য মানুষের কষ্টের সীমা নেই। তিনি জানান, তার গ্রামের মানুষ হরিনগর বাজার থেকে পানি সংগ্রহ করে কোন রকমে জীবন বাঁচাচ্ছে।
উপজেলা বিভিন্ন এলাকা ঘুরে প্রায় অভিন্ন চিত্রের দেখা গেছে। কোথাও পুকুর শুষ্ক তো কোথাও আবার টিউবওয়েল অকেজো। আবার কোন জায়গার পিএসএফ বিকল হয়ে আছে তো অন্য জায়গায় লবণ পানির আধিক্য।
এসব এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে তাদের প্রধান সমস্যা খাবার পানির সংকট। আইলা’র পর এই দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যেগে জরুরী পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হলেও গত বছর থেকে সেই কার্যক্রম বন্ধ। তার উপর গেল বছর অনাবৃষ্টির কারণে পুকুরে পানির অভাব আর পিএসএফ ও নলকূপসমূহের অকেজো অবস্থা উপকূলবাসীর জন্য চরম সংকট হয়ে দাড়িয়েছে।
গোটা উপজেলাজুড়ে পানি সংকট চলছে স্বীকার করে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এলাকাবাসীর জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানির প্রধান উৎস মিষ্টি পানির পুকুর ও জলাকার। কিন্তু গত বছর অনাবৃষ্টির কারণে ইতোমধ্যে অনেক পুকুর পানিশুন্য হয়ে সংকটকে প্রবল করে তুলেছে। তিনি আরও জানান, উপজেলার অধিকাংশ জায়গায় টিউবওয়েল সফল না হওয়ায় অনেক গ্রামে পিএসএফ’র উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আপাতত সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে পানি সরবরাহের কোন নির্দেশনা পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, উপজেলার মোট ৬শ পিএসএফ’র মধ্যে ৪শ ১৮টি চালু রয়েছে। এছাড়া গভীর এব ংঅগভীর মিলিয়ে প্রায় ১৬শ ৬টি টিউবওয়েলের মধ্যে ১২শ সচল আছে। কিন্তু পানির স্তর নেমে যাওয়া এবেং অনেক পুকুরের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় এই মুহূর্তে পানির জন্য মানুষের দুরাবস্থা কিছুটা বেড়েছে। তবে ইতোমধ্যে আরও ২৩টি পিএসএফ নির্মাণ করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জাফর রানা বলেন, আইলা’র পর মানুষের পানি সমস্যা ঘুঁচাতে দেড় শতাধিক পুকুর খনন ও পুনঃখনন করা হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টি না হওয়ায় ঐসব পুকুর পানি শুন্য পড়ায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট তীব্রতর হয়েছে।