আড়াই বছরেও শেষ হয়নি সীমান্তবর্তী ইছামতি নদীর বাঁধ সংস্কারের কাজ, নতুন এলাকায় ফাটল


প্রকাশিত : মে ১৩, ২০১৩ ||

ডেস্ক রিপোর্ট: সীমান্ত নদী ইছামতির কালিগঞ্জ উপজেলার খারহাট নামকস্থানে ভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। জোয়ারের সময় বাতাসের গতিবেগ বৃদ্ধি পাওয়ায় বেড়ি বাঁধ ভেঙে কালিগঞ্জ ও দেবহাটা উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের ৪০টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কালিগঞ্জ উপজেলার ভাড়াশিমলা ইউনিয়নের খারহাট গ্রামের জয়দেব দাস, সনৎ কুমার দাস, বিজয় দাস, আব্দুর রহমান ও ছাদেক আলী জানান, ১৯৮৪ সালে ইছামতি নদীর বাংলাদেশের পারে খারহাট এলাকায় ভাঙনে আব্দুর রহমান ও কাছেদ আলী কারিকর ও তাদের দেড় শতাধিক বিঘা জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে আরো ৫০ বিঘা জমি নদীর ভিতরের দিকে রেখে রিং বাঁধ দেওয়া হয়। এরপর থেকে ইছামতি নদীর ভারতের পারে নতুন এলাকা গড়ে উঠছে ও বাংলাদেশের পার দিয়ে প্রবল ¯্রােতের কারণে বেড়িবাঁধ ভেঙে চাষের জমি ও বাড়ি ঘর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। বেড়িবাঁধ সংস্কারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে খারহাট এলাকার অনেকেই জমি ও ঘরবাড়ি হারিয়ে সরকারি খাস জমিতে বসবাস শুরু করেছে।
তারা আরো জানান, ২০১০ সালের মে মাসে খারহাট এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। সেসময় কালিগঞ্জে অবস্থানকারী স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শকালে স্থানীয় লোকজন পাউবো’র বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে। সেকারণে মুক্তিযোদ্ধা ও ভাড়াশিমলা ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান শেখ নাসিরউদ্দিন, খান আসাদুর রহমান, বর্তমান চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ বিশ্বাস ও মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলীকে (বর্তমানে প্রয়াত) নিয়ে চার সদস্য বিশিষ্ট বাঁধ সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে কাজের তদারকির দায়িত্ব দিয়ে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়।
তারা অভিযোগ করে বলেন, বরাদ্দকৃত টাকার সিংহভাগ কমিটির সদস্য ছাড়াও ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের পকেটে চলে যায়। ফলে ভাঙন কবলিত স্থানের সামান্য অংশে কিছু ইট ছাড়া কিছুই পড়েনি। ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে খারহাট এলাকায় আবারো ভাঙন দেখা দিলে পানি উন্নয়ন বোর্ড টেন্ডারের মাধ্যমে সাতক্ষীরার ঠিকাদার শফিকুল ইসলামকে ৩০০ মিটার ভাঙন কবলিত নদীবাঁধ সংস্কারের দায়িত্ব দেন। এজন্য দু’ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই বছরের ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কাজ শুরু পর ভাঙন বেড়ে যাওয়ায় ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে আরো ৮০ মিটার বেড়িবাঁধ সংস্কারের জন্য ৭১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম ওই কাজের দায়িত্ব পান। যদিও নির্দিষ্ট সময়ের এক বছর নয় মাস পেরিয়ে গেলেও চারভাগের একভাগও কাজ শেষ হয়নি।
সরেজমিনে গত শনিবার সকালে খারহাট এলাকায় যেয়ে দেখা গেছে, আজিজ কাজী ও আনিস গাজীর চিংড়ি ঘেরের মধ্যবর্তী সংস্কারের জন্য বরাদ্দকৃত বেড়িবাঁধের দু’ধারে ৩৮০ মিটার ছাড়াও আরো ১০০ মিটার ভাঙন বৃদ্ধি পেয়েছে। বেড়িবাঁধ কোথাও কোথাও দু’হাতেরও কম সরু হয়ে গেছে। বাঁধ সংস্কারের জন্য নির্মিত প্রচুর পরিমান ব্লক বেড়িবাঁধের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। নদীতে জোয়ারের পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে বাতাসের বেগ বৃদ্ধি পাওয়ায় ঢেউ খারহাটের বেড়িবাঁধে আছড়ে পড়ছে। ফলে বেড়িবাঁধ আরো চিকন হয়ে যাচ্ছে। সংস্কারের জন্য নির্ধারিত স্থান ছাড়াও বেড়িবাঁধের উত্তর ও দক্ষিণে ১০০ মিটারের বেশি স্থানে নতুন করে ফাটল দেখা দিয়েছে।
খারহাট বেড়িবাঁধের পাশের চিংড়ি ঘের মালিক জয়দেব দাস ও ছাদেক গাজী জানান, জোয়ার বৃদ্ধির সাথে সাথে যেভাবে বাতাসের তীব্রতা বাড়ছে, তাতে নদীবাঁধ ভেঙে কালিগঞ্জের খারহাট, কামদেবপুর, ভাড়াশিমলা, শুইলপুর, ব্রজপাটুলি, চৌবাড়িয়া, সোনাটিকারি, চালতেবেড়ে , মার্কা, কুকোডাঙি, শরাব্দিপুর, ঘোনা গ্রামসহ নলতা তারালি, ভাড়াসিমলা, চম্পাফুল ও দেবহাটার নওয়াপাড়া ইউনিয়নের প্রায় ৩০টির বেশি গ্রাম প্লাবিত হবে। ভেসে যাবে কয়েক হাজার বিঘার চিংড়ি ঘের ও ফসলের ক্ষেত। পানিবন্দি হবে লক্ষাধিক মানুষ।
এ ব্যাপারে খারহাট এলাকার বেড়িবাঁধ সংস্কারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম জানান, প্রথম ৩০০ মিটার কাজের জন্য বরাদ্দকৃত দু’ কোটি ৮৫ লাখ টাকার মধ্যে এ পর্যন্ত তিনি ৬০ লাখ টাকা পেয়েছেন। ব্লক নির্মাণসহ ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও টাকার অভাবে তিনি কাজ শেষ করতে পারছেন না। তবে ভাঙন কবলিত এলাকার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সাতক্ষীরা পাউবো-১ এর কালিগঞ্জ শাখার সেকশন অফিসার কাজী আজাদ হাসেন জানান, ব্লক নির্মাণ ও ড্যাস্পিং এর জন্য ২০১২ সালের প্রথম দিকে ৭৮ লাখ টাকার বিল প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে ১০০ মিটার বেড়ি বাঁধ সংস্কারের কাজ শেষ হওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ঠিকাদার ব্লকগুলো স্থানান্তর করে বসালেই কাজ শেষ হয়ে যাবে। তবে ঠিকাদারের অভিযোগটি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা পাউবো-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান খান জানান, খুলনা বিভাগীয় কর্মকর্তা ও ঢাকার উর্দ্ধতন কর্মকর্তার সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য তিনি রওনা দিয়েছেন।