৫০ লক্ষ মানুষের জীবন জীবিকা বিপন্নের আশংকা: কপোতাক্ষ নদ পুনঃখনন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীর গতি


প্রকাশিত : মে ২১, ২০১৩ ||

আব্দুল জব্বার, তালা: বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে উপকূলীয় বাঁধ বা পোল্ডার ব্যবস্থা প্রবর্তনের কারণে তালার ¯্রােতস্বিনী নদ-নদীগুলো দ্রুত পলি জমে ভরাট হচ্ছে। এ কারণে বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। কপোতাক্ষ দক্ষিণাঞ্চলের একটি বৃহত্তম নদী। এ নদীর প্রকৃতি অন্যান্য নদী থেকে ভিন্ন। প্রায় দেড়শ বছর যাবত এ নদের সাথে পদ্মার কোন সংযোগ নেই। তবুও জোয়ার-ভাটার প্রবাহের উপর এ নদীর অস্তিত্ব নির্ভর করে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বিগত ২০০০ সাল থেকে কপোতাক্ষ অববাহিকার অধিবাসীরা জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হচ্ছে। এর প্রেক্ষিতে ২০০৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের জোরালো দাবির প্রেক্ষিতে কপোতাক্ষ নদের সমস্যার গুরুত্ব অনুধাবন করে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন যে, তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কপোতাক্ষ নদের সমস্যা সমাধানকল্পে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সেই অনুসারে প্রধানমন্ত্রী ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে ২৬১ কোটি ৫৪ লাখ ৮৩ হাজার  টাকা ব্যয় সাপেক্ষে ‘কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্প (১ম পর্যায়)’ অনুমোদন করেন। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই প্রকল্পটির মূল কাজ তালা উপজেলার জালালপুর ও খেশরা ইউনিয়নের পাখিমারা বিলে জোয়ারাধার (বিলের মধ্যে জোয়ার ভাটার ব্যবস্থা) বাস্তবায়ন এবং ৯০ কিলোমিটার নদ খনন। চার বছর মেয়াদি প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাল ধরা হয়েছে ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত। প্রকল্পের ডিজাইন অনুযায়ী পাখিমারা বিলে জোয়ারাধার চালুর পর নদী খনন কার্যক্রম শুরু করা হবে।

পাখিমারা বিলের জন্য প্রস্তাবিত কাজসমূহ হলো বিলের চারিপাশে ১০.২০ কিলোমিটার পেরিফেরিয়াল বাঁধ নির্মাণ, পেরিফেরিয়াল বাঁধে ২২টি আউটলেট পাইপ নির্মাণ, ড্রেজার দ্বারা ১.৫০ কিলোমিটার সংযোগ চ্যানেল খনন, সংযোগ চ্যানেল খননের জন্য ৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ, সংযোগ খালের ১ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ, সংযোগ খালের উপর একটি বেইলি ব্রীজ নির্মাণ এবং যৌক্তিক মূল্যে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান। পাখিমারা বিলে ২০১১-১২ অর্থবছরের মধ্যে জোয়ারাধার কার্যক্রম বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল। আর এক মাস পরেই প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর অতিক্রান্ত হবে। অথচ পাখিমারা বিলে এখনও পর্যন্ত জোয়ারাধার কার্যক্রম চালু করা হয়নি। এমনকি ২য় বছরের ছাড়কৃত একটি টাকাও খরচ করা হয়নি। প্রকল্পের ১ম বছর বিশেষ করে জোয়ারাধার চালুর জন্য ব্যয় বরাদ্দ ছিল ২৮ কোটি টাকা। যার মধ্যে ১৩ কোট টাকা ছাড় করা হয়। এ টাকার মধ্য থেকে পাখিমারা বিলে পেরিফেরিয়াল বাঁধের ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। যদিও বাঁধের উচ্চতা ও বাঁধ কতটা টেকসই হবে তা নিয়ে জনগণের আপত্তি রয়েছে।  ইতোমধ্যে প্রকল্পের আরও একটি বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে, কিন্তু এখনও পর্যন্ত জোয়ারাধার বাস্তবায়নের জন্য উল্লি¬খিত কাজগুলো শুরু করা হয়নি। প্রকল্পের ২য় বছর বরাদ্দ ছিল ১১৪ কোটি টাকা। যার মধ্যে ১৫ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়। কিন্তু  ছাড়কৃত টাকা থেকে চলতি বছর প্রকল্পের কোন টাকা এখনও পর্যন্ত ব্যয় করা হয়নি। যার মূল কারণ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সংশ্লি¬ষ্ট প্রশাসনের গড়িমসি ও উদ্যোগহীনতা। জোয়ারাধার কার্যক্রম বাস্তবায়নে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি প্রধান বিষয় হলো ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করা। প্রায় দুই হাজার একর  জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের তালিকা এখনও পর্যন্ত চূড়ান্ত করা হয়নি। এমনকি জমির মালিকদের সাথে এ বিষয়ে কোন মতবিনিময় করা হয়নি। এছাড়া ক্ষতিপূরণের টাকা না পাওয়ায় জমির মালিকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

উল্লে¬খ্য, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ না করা এবং জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার কারণে আগত বর্ষাকালের পূর্বে প্রকল্প বাস্তবায়ন হুমকির মুখে পড়েছে। একথা অনস্বীকার্য এবং সর্বজন স্বীকৃত যে, সুবিধাজনক বিলের মধ্যে জোয়ার ভাটা বাস্তবায়ন ছাড়া জলাবদ্ধতা দূরীকরণ এবং নদীকে বাঁচানো সম্ভব নয়। বিলে জোয়ারাধার নির্মাণ একটি কৃত্রিম ব্যবস্থা। যার মধ্যে জোয়ার প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া হয়। জোয়ারে আগত পলি বিলে অবক্ষেপিত হয়ে বিল উঁচু হয় এবং এই প্রক্রিয়ায় নদীর মধ্যে পলি জমতে না পারায় নদীর নাব্যতা অব্যাহত থাকে। বিখ্যাত বিল ডাকাতিয়া ও ভবদহ এলাকায় জনগণ ও সরকার কর্তৃক এ পদ্ধতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জোয়ারাভাটার নদীগুলোর নাব্যতা রক্ষায় এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে জোয়ারাধার (টিআরএম) পদ্ধতির কোন বিকল্প নেই।

চলতি বছর যদি কপোতাক্ষ অববাহিকার পাখিমারা বিলে জোয়ারাধার চালু না হয় তাহলে বর্ধিত হারে পলি জমে কপোতাক্ষ নদের অকাল মৃত্যু অনিবার্য হয়ে পড়বে এবং পরবর্তী বছর পাখিমারা বিলে জোয়ারাধার কার্যক্রম বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। কপোতাক্ষ নদের বাঁচা মরার উপর এ জনপদের প্রায় ১৫ লক্ষ অধিবাসীর জীবন জীবিকায় রয়েছে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক। কপোতাক্ষসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জোয়ার ভাটার ১১টি নদী দ্রুত মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এ নদীগুলো একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত। নদীগুলোর সাথে সাতক্ষীরা, খুলনা ও যশোর জেলার প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের ভাগ্য জড়িত। নদীগুলো হলো কপোতাক্ষ, শালিখা, বেতনা, মরিচ্চাপ, লাবণ্যবতি, সাপমারা, আপার ভদ্রা, হরি, হামকুড়া, শৈলমারী ও সালতা নদী। বিগত এক দশক ধরে জলাবদ্ধতার কারণে কপোতাক্ষসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ বসবাসের এলাকা ছেড়ে যাচ্ছে। কপোতাক্ষের পাখিমারা বিলে জোয়ারাধার প্রকল্প বাস্তবায়িত না হলে এ এলাকা নিঃসন্দেহে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। তখন ব্যাপকভাবে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া মানুষের আর কোন উপায় থাকবে না। এ মানবিক বিপর্যয় মোটেই কাম্য নয়। চলতি মৌসুমে যে কোন মূল্যে পাখিমারা বিলে টিআরএম বাস্তবায়নের জোর দাবি জানিয়েছে ভূক্তভোগী এলাকাবাসী।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক ড. মুহা. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার বলেন, টিআরএমভুক্ত জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণের টাকা ইতোমধ্যে চলে এসেছে। খুব দ্রুত তা প্রদান করা হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নকারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের যশোর ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মশিউর রহমান বলেন, টিআরএমভুক্ত জমির মালিকদের বিঘাপ্রতি ১৩ হাজার টাকারও বেশী ক্ষতিপূরণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এজন্য জমির মালিকদের নোটিশ পাঠানো হবে এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান শুরু হবার পর অবকাঠামোগত অন্যান্য কাজ করা হবে। তিনি আরও বলেন, চলতি বছর পাখিমারা বিলে টিআরএম প্রকল্প বাস্তবায়িত না হলে আগামী বছর কাজ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, টিআরএম আওতাভুক্ত জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

স্থানীয় (তালা-কলারোয়া আসনের) সংসদ সদস্য প্রকৌশলী শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, দ্রুত কপোতাক্ষ নদ খনন করে জনগণের দুঃখ লাঘব করা হবে।