কপোতাক্ষ নদ পুনঃখনন প্রকল্প বাস্তবায়িত না হলে পরিণতি হবে ভয়াবহ : প্রকল্পের মেয়াদ ৪ বছর, ২ বছর শেষ, বরাদ্দ ২৬১ কোটি ৫৪ লক্ষ ৮৩ হাজার টাকা, কাজ হয়েছে মাত্র ১৩ কোটি টাকার, ৫০ লক্ষ মানুষের জীবন বিপন্ন


প্রকাশিত : মে ৩০, ২০১৩ ||

নিজস্ব প্রতিনিধি: চলতি বছর তালা উপজেলার কপোতাক্ষ তীরে পাখিমারা বিলে টিআরএম বাস্তবায়িত না হলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। আগামী বছর এ বিলে টিআরএম বাস্তবায়নের সুযোগ থাকবে না। এ বছর সুযোগ হারালে কপোতাক্ষ পাড়ের ২০ লক্ষ মানুষের জীবনে নেমে আসবে অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট। টিআরএম বাস্তবায়নে আর কোন বিল না থাকায় পাখিমারা বিলই একমাত্র ভরসা। কিন্তু পাখিমারা বিলে টিআরএম প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও গুটিকতক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও সুবিধাভোগী ব্যক্তির কারণে প্রকল্পটি ক্ষীণ গতিতে অগ্রসর হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ডুবে মরা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না। টিআরএম প্রকল্প চালু করে কপোতাক্ষের স্রোতধারা ফিরিয়ে আনতে না পারলে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের যশোর খুলনা ও সাতক্ষীরার ৫০ লক্ষ মানুষ প্রাণে বাঁচবে না। তাই বেঁচে থাকার তাগিদে দলমত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নদী বাঁচাও, জীবন বাঁচাও আন্দোলনে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

বুধবার বেলা ১১টায় সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে সাংবাদিকের সাথে মতবিনিময়কালে উত্তরণ ও পানি কমিটির নেতৃবৃন্দ ও কর্মকর্তারা এ আহবান জানান। মতবিনিময় সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কেন্দ্রীয় পানি কমিটির সভাপতি শফিকুল ইসলাম।

প্রবন্ধে বলা হয়, দেশের উপকূলীয় প্রান্তঃসীমায় হামকুড়া নদী, হরিনদী, আপারভদ্রা, ঘ্যাংরাইল, কপোতাক্ষ, শালতা, শালিখা, বেতনা, মরিচ্চাপ, ল্যাবণ্যবতী ও সাপমারাসহ ১১টি নদী এখন মৃত প্রায়। যশোর-খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার ৫০ লক্ষ মানুষ এ নদীগুলোর উপর নির্ভরশীল। নদীগুলোর মধ্যে কপোতাক্ষের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৭০ কিলোমিটার। এ নদের তীরে বসবাস করে ২০ লক্ষ মানুষ। জোয়ারের প্রান্তঃসীমা থেকে প্রতি বছর এ নদের মৃত্যুর হার ৯ কিলোমিটার এবং নিম্ন অববাহিকায় প্রতি বছর ৮/৯ কিলোমিটার জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হচ্ছে। নদটি মরতে মরতে এখন শেষ পর্যায়ে। তালার জেঠুয়া থেকে পাইকগাছার শিববাড়ি পর্যন্ত ১৫/১৬ কিলোমিটার নদী মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে।

এমতাবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০-১১ অর্থ বছরে কপোতাক্ষ নদের বিষয়টি এডিপিতে অন্তর্ভূক্ত করান। পরবর্তীতে কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ (১ম পর্যায়ে) প্রকল্প প্রণয়ন ও অনুমোদন লাভ করে ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত। ৪ বছর মেয়াদী এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ২৬১ কোটি ৫৪ লক্ষ ৮৩ হাজার টাকা।

প্রবন্ধে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা অত্যন্ত ভয়াবহ। এতে বলা হয়েছে, ২০১১-১২ অর্থ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অর্থ বরাদ্দ হয় ২৮ কোটি ৩৭  লক্ষ ৬২  হাজার টাকা। কিন্তু ছাড় হয় মাত্র ১৩ কোটি টাকা। এ অর্থ বছরে পেরিফেরিয়াল বাধ নির্মাণ, বাঁধের উপর ২২টি আউটলেট পাইপ স্থাপন, শালিখা নদী খনন, ড্রেজার দ্বারা দেড় কিলোমিটার সংযোগ চ্যানেল খাল খনন, সংযোগ খালের এক কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ, সংযোগ খালের উপর একটি বেইলি ব্রিজ নির্মাণ, ৮ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ ও জনগণকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের কথা ছিলো। কিন্তু এ অর্থ বছরে পেরিফেরিয়াল বাধের ৮০ শতাংশ নির্মাণ করা হয়। ২২টি আউটলেট পাইপের স্থলে ৫/৬টি পাইপ স্থাপন করা হয় এবং শালিখা নদীর অর্ধেক খনন করা হয়। প্রথম বছরেই পাখিমারা বিলে যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করে টিআরএম চালু করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। প্রবন্ধে আরো বলা হয়, ২০১২-১৩ অর্থবছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ১১৪ কোটি ৬৫ লক্ষ ৭৯ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও ছাড় হয় মাত্র ১৫ কোটি টাকা। এ বছর নদী খনন, ক্ষতিপূরণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করার বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও এ্রখনো কাজ শুরু হয়নি। তবে  ছাড়কৃত ১৫ কোটি টাকা থেকে ১৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের জন্য জেলা প্রশাসনে জমা আছে। কিন্তু জমির মালিকদের নিকট তা বিতরণ শুরু হয়নি। বাকী ২ কোটি টাকা পেরিফেরিয়াল বাধের অবশিষ্ট ২০ শতাংশ কাজ করার কথা থাকলেও সে কাজটিও এখনো শুরু হয়নি।

মতবিনিময় সভায় বক্তারা বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড অগ্রিম ক্ষতিপূরণ দিয়ে পেরিফেরিয়াল বাধ নির্মাণে ওয়াদাবদ্ধ থাকলেও তারা সে ওয়াদা রাখেনি। ৮৫০ হেক্টর জমি নিয়ে পাখিমারা বিলে টিআরএম বাস্তবায়িত হবে। প্রায় দুই হাজার একর জমির মালিকরা ক্ষতিপূরণ পাবেন। বক্তারা পাউবোর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ক্ষতিপূরণের হার হবে প্রতি বছর ৩৩ শতকের বিঘায় ১৩ হাজার টাকার বেশি। অগ্রিম এক বছরের ক্ষতিপূরণ দিয়েই কাজ শুরু করার কথা।

বক্তারা বলেন, বিল কপালিয়ায় বাস্তবায়নাধীন টিআরএম প্রকল্পে ক্ষতিপূরণ দেয়া হচ্ছে বিঘা প্রতি ১৬ হাজার টাকা এবং তা অগ্রিম দুই বছর পর্যন্ত পরিশোধ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু পাখিমারা বিলে ক্ষতিপূরণ দেয়া হচ্ছে বিঘা প্রতি ১৩ হাজার টাকা এবং তা অগ্রিম এক বছরের জন্য। এতে করে জমির মালিকদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

মতবিনিময় সভায় বক্তারা আরো বলেন, পাখিমারা বিলে ঘের মালিক ও স্বার্থান্বেষী মহল একসাথে যুক্ত হয়ে তাদের কায়েমী স্বার্থ উদ্ধারের জন্য টিআরএম প্রকল্প বাস্তবায়নের স্থগিতাদেশ চেয়ে ২০১২ সালের ১৮ জুন উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন করলে ওই বছর ১৭ ডিসেম্বর তা নিষ্পত্তি হয়। ফলে পাখিমারা বিলে টিআরএম বাস্তবায়নে সকল বাধা দূর হয়। মতবিনিময় সভায় বক্তারা অবিলম্বে পাখিমারা বিলে টিআরএম প্রকল্প বাস্তবায়ন পূর্বক কপোতাক্ষ নদের স্রোতধারা ফিরিয়ে এনে ২০ লক্ষ মানুষের প্রাণ বাঁচাতে দলমত নির্বিশেষে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানান।

কেন্দ্রীয় পানি কমিটির সভাপতি শফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন, উত্তরণের নির্বাহী পরিচালক শহিদুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, পানি কমিটির অন্যতম নেতা মঈনুল ইসলাম, জাহিদুল ইসলাম, অধ্যক্ষ আবু আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুর রহিম, সাংবাদিক কল্যাণ ব্যানার্জী, মমতাজ আহমেদ বাপ্পী, এম কামরুজ্জামান, আব্দুল বারি, মনিরুল ইসলাম মনি, মোজাফফর রহমান, আবুল কাশেম প্রমুখ।