জলাবদ্ধতার কবলে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা: আমন ধানের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বোরো চাষে নেমেছে চাষীরা


প্রকাশিত : January 2, 2014 ||

ডেস্ক রিপোর্ট: জলাবদ্ধতার কারণে সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ এলাকায় এবার বোরো চাষ না হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। এরপরও আমন ধানের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বেসরকারি উদ্যোগে মোটর বসিয়ে পানি সরিয়ে জমি চাষযোগ্য করার চেষ্টা চালাচ্ছেন চাষীরা। ইতিমধ্যেই বীজতলায় ধানের চারা চার থেকে পাঁচ ইঞ্চি করে বেড়ে উঠেছে। চলছে ধান রোপনের জন্য মাঠ তৈরির কাজ।
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার গোপালপুর গ্রামের মতিয়ার রহমান ওরফে মানিক, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বল্লী গ্রামের শহীদুল ইসলাম ও কলারোয়া উপজেলার ক্ষেত্রপাড়া গ্রামের আব্দুর রহমান জানান, ২০১১ সালে অতিবৃষ্টিতে কপোতাক্ষ ও বেতনা নদীর পানি উপচে তালা, কলারোয়া ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। ওই বছরে চাষীরা আমন ধান ঘরে তুলতে পারেনি। চলতি বছরে একইভাবে কপোতাক্ষ ও বেতনা নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে ও উপচে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। মৃতপ্রায় নদী যথাযথভাবে খনন না করা ও যথাসময়ে বেড়িবাঁধ সংস্কার না হওয়ায় এবারেও তিনটি উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল তলিয়ে যায়। ফলে তারা লাগানো আমন ধান ক্ষেতে পঁচে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আমনের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে স্থানীয় চাষীরা বেসরকারিভাবে শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি অপসারণ করে বোরো চাষের উদ্যোগ নিয়েছেন।
জেলা খামারবাড়ি সূত্রে জানা গেছে, গত বোরো মৌসুমে জেলায় ৭১ হাজার ৭২৯ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রার প্রেক্ষিতে চাষ হয়েছে ৭২ হাজার ৫৯০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছিল ২৯ লাখ পাঁচ হাজার ৫৮৮ মেট্রিক টন চাল। জেলায় ৭৫৫ হেক্টর জমি জলাবদ্ধতার কবলে থাকলেও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পানি সেচ করে ৬২৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ সম্ভব হয়। চলতি মৌসুমে জেলায় ৭৩ হাজার ১৩৮ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। সেক্ষেত্রে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে ৭৩ হাজার ১৩৮ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ২৫ হাজার ১০০ হেক্টর, কলারোয়ায় ১২ হাজার ৬০০, তালায় ১৬ হাজার, দেবহাটায় ছয় হাজার ১০০, কালিগঞ্জে পাঁচ হাজার ৪৭০, আশাশুনিতে ছয় হাজার ৩৩০ ও শ্যামনগরে এক হাজার ৫৩৮ হেক্টর জমি বোরো চাষের আওতায় আনা হয়েছে।
কলারোয়া উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম লাল্টু জানান, উপজেলার দেয়াড়ামাঠপাড়া, মাছিনগর, ক্ষেত্রপাড়া, গাজনা, বাওড়তলা, কায়মখোলা (বসন্তপুর) ও আহসাননগরের নি¤œাঞ্চলের প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতার ফলে বোরো চাষে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তবে অনেক কৃষক সম্মিলিতভাবে শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি নিষ্কাশন করে বোরো চাষের উদ্যোগ নিয়েছেন।
একইভাবে সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান এসএম শওকত হোসেন জানান, উপজেলার বল্লী, ঘুটিয়ারডাঙি, মাছখোলা, বল্লী, ফিংড়ির একাংশ, দামারপোতার একাংশ, হাজীপুর, বাসাবাড়ি, আমতলা ও লাবসার একাংশ মিলে পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতার কারণে বোরো চাষ হচ্ছে না। তবে কৃষকরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে হাজীপুর, বাসাবাড়ি ও আমতলায় শ্যালোমেশিন বসিয়ে পানি নিষ্কাশন করে বোরো চাষের উদোগ নিয়েছে।
তালা উপজেলা চেয়ারম্যান ঘোষ সনৎ কুমার জানান, উপজেলার ঘোনা, কলিয়া, ইসলামকাটি, দেওয়ানীপাড়া, গোয়ালপোতা, সুভাষিণী, লক্ষণপুর, শাকদাহ, দলুয়া, খলিষখালি, তেঁতুলিয়াসহ কয়েকটি বিলের ছয় হাজার হেক্টরের বেশি জমি জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। আমন ধানের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ওইসব বিলের জমির মালিকদের সঙ্গে উপজেলা প্রশাসন সহযোগিতা দিয়ে এক মাস আগে গোপালপুর স্লুইসগেটের মুখে নয়টি শ্যালোমেশিন বসিয়ে পানি সেচ দেওয়া হচ্ছে। ফলে ওইসব বিলের অধিকাংশ জমি চাষের আওতায় আসবে।
তালা উপজেলার গোপালপুর গ্রামের মনোরঞ্জন রায় ও মফিজুল ইসলাম জাানান, তাদের সাত বিঘা করে জমি জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সেখানে আমন ধান হয়নি। সে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পানি নিষ্কাশন করে মাছ ধরে নেওয়ার পর সেখানে চাষ করার সুবিধার্থে যশোরের একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। সে অনুযায়ী তারা বিএডিসি’র উৎপাদিত ভিডি-২৮ ধানের বীজতলা তৈরি করেছেন। একই কথা বলেন ঘোনা গ্রামের কৃষক সমছের আলী। তিনি সিনজেটা-২৮ বীজ ফেলেছেন। ঘন কুয়াশা ও অধিক শীতে বীজতলায় কোল্ড ইনজুরি না হলে চাষের প্রথম দিকে তারা সফল হবেন।
বল্লী ইউনিয়নের আমতলা গ্রামের শহীদুল ইসলাম ও বাসাবাটি গ্রামের সাদ্দাম হোসেন জানান, তারা যথাক্রমে নয় বিঘা ও দুই বিঘা জমি চাষ করার লক্ষ্যে ২৮ ধানের বীজ ফেলেছেন। বীজতলার চারা ইতিমধ্যে পাঁচ ইঞ্চির বেশি বড় হয়েছে। শ্যালো মেশিনে সেচ দিয়ে পানি কমে গেলে আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে ধানের চারা রোপন করা হবে। একইভাবে বল্লীর বিলে ১৩টি শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি সেচ দিয়ে ধান চাষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান বল্লী গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান ও সাহেব আলী। বোরো চাষ করতে শ্যালো মেশিনে সেচ দিয়ে তিন বিঘা জমিতে পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষ করেছেন কলারোয়া উপজেলার গাজনা গ্রামের জনাব আলী।
বাংলাদেশ কৃষি ফার্টিলাইজার এ্যসোসিয়েশনের সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি বিশ্বজিৎ সাধু জানান, বিরি-২৮ ধানের বীজ বেশি বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া হাইব্রিড এসএল-৮ বীজেরও যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। অধিক বৃষ্টি হওয়ায় পানিতে লবণাক্ততা কম হওয়ায় লবণ সহিষ্ণু বিনা-১০ এর চাহিদা কমেছে। সে অনুযায়ী বিএডিসি’র-২৮ ধানের চাহিদা বাড়ায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তবে অবরোধের কারণে খুলনার শিরমনি, বাপার গুদাম ও ৭নং ঘাট থেকে গত নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে বরাদ্দকৃত ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সার দ্বিগুণ পরিবহন খরচ করে নিয়ে আসেননি ডিলাররা। এ অবস্থা চলতে থাকলে কৃত্রিম সার সংকটের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষকরা।
সাতক্ষীরা খামারবাড়ির উপপরিচালক গণেশ চন্দ্র মন্ডল জানান, গত ২৮ অক্টোবরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জেলায় প্রায় ৮০০ হেক্টর জমি স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। এ ছাড়া আরো কিছু জমি অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধ হলেও তা সরকারি ও বেসরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়ে চাষের আওতায় আনা হচ্ছে। জলাবদ্ধতা দূরীকরণে এসএ রেকর্ড অনুযায়ী নদী ও খালগুলোর প্রকৃত অবস্থান চিহ্নিত করে জবরদখলমুক্ত করতে হবে। সাগরের সঙ্গে প্রধান নদী ও সংযোগ খালগুলো সংস্কার করা হলে সাতক্ষীরাবাসী জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা পাবে।