আমরা বাঙালি আমরা পারি


প্রকাশিত : জানুয়ারি ৮, ২০১৪ ||

এস এম মুকুল: চেতনার জাগরণ সৃষ্টি হলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে বাঙালিরা। এ কথা বহুবার, বহুভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন প্রমাণ করেছে বাঙালির চেতনার শক্তি কত অন্তরীক্ষ, কত বৈপ্লবিক। বিপুল সম্ভাবনাময় আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ। জনসংখ্যাবহুল এ দেশটির স্বাধীনতা অর্জনে রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস। আমরা বাঙালি, বীর বাঙালির সুখ্যাতি বিশ্বজুড়ে। ভাষার জন্য আত্মত্যাগ আর সংগ্রামের ইতিহাস শুধু বাংলাদেশেরই আছে। স্বদেশি স্বকীয়তায় উদ্ভাসিত বাঙালি জনতার ভাষার জন্য সংগ্রামের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত আজ বিশ্বে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরবে গৌরবান্বিত আমরা। আমাদের সভ্যতায়, অস্তিত্বে মুহ্যমান বাংলার সংস্কৃতি। ইউনেস্কোর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত বাংলার বাউল গান আর বাংলার জামদানি। আমরা বাঙালিরা সহনশীল জাতি হিসেবেও বেশ পরিচিত। তবে অস্তিত্বের সংকটে পড়লে বাঙালি মোটেই দমার নয়। ‘যায় যাবে যাক প্রাণ, তবুও রাখিব মান’Ñ এ হলো বাঙালি চেতনার মূলমন্ত্র। এমন আন্তরিক বোধশক্তিই প্রয়োজনের সময় একাকার করে দেয় আমাদের। আর এর ফলেই অধিকার আদায়ের আন্দোলনে মুখরিত হয় কানসাট আর শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ। সম্মিলিত মানুষের অপ্রতিরোধ্য শক্তির কাছে হার মানে অপশক্তি। এভাবেই একদিন হার মেনেছিল পাক হায়েনারা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার রাজনৈতিক অঙ্গীকারে ব্যাপক সাড়া দেয় আমাদের তরুণ প্রজন্ম। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত হয় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দল। শুরু হয় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকার্যক্রম। শুরু হয় রায় ঘোষণা। উদ্বেলিত তরুণ প্রজন্ম জেগে ওঠে চেতনার স্রোতে। এ চেতনার আলো ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। আবারো বাঙালি জেগে উঠেছে। তার প্রমাণ শাহবাগ। জেগে উঠলেই পরিবর্তনের হাওয়া বয়ে যায় বাংলায়। জেগে উঠলেই দিনবদলের স্বপ্নে বিভোর হই আমরা। আর জেগে উঠলেই বিশ্ব চাপের বলয় পেরিয়ে কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়। মুক্তিযুদ্ধে সহযোগী বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা জানাতে জানে বাঙালি জাতি। বাঙালিরা বারবার প্রমাণ করে বাঙালি জাতি বীরের জাতি, বাঙালি জাতি কৃতজ্ঞ জাতি।
মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, পাহাড়ি অথবা নৃগোষ্ঠী Ñ সর্বত্র এক পরিচয় আমাদের; আমরা বাংলাদেশি। এটা আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমাদের ত্যাগ, আমাদের সংগ্রাম আগামী দিনের সমৃদ্ধির সোপান। আমাদের যেমন আছে সমস্যা, তেমনি আছে সম্ভাবনা। মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় আর স্বাধীনতা অর্জনের পর আরো একটি অর্জন বিশ্ববাসীকে জানান দিয়েছে নতুনভাবে Ñ ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন। বিশ্বে সম্মানের আকাশ ছুঁয়েছে বাংলাদেশ। আমাদের বিজ্ঞানীরা আর্সেনিক নির্মূলে সনোফিল্টার আবিষ্কার করেন, পাটের জেনম আবিষ্কার করেন, ক্যানসার চিকিৎসায় মেধার স্বাক্ষর রাখেন। আমাদের কৃষক হরিপদ কাপালিরা নতুন ধান আবিষ্কার করেন। গুটি ইউরিয়া প্রয়োগের যন্ত্র আবিষ্কার করে বাঙালিরা বিশ্বকে নতুন সবুজ বিপ্লবের পথ দেখান। আমাদের তরুণ নাফিস ও সালমান প্রযুক্তি দুনিয়ায় দাপট দেখান। আমাদের নারীরা ঘরে-বাইরে সাফল্যের নতুন জাগরণ সৃষ্টি করেন। আমাদের বাঙালিরা বিশ্বে সততার উদাহরণ সৃষ্টি করেন। বাংলার সেনারা বিশ্বের শান্তি মিশনে অবদান রাখেন। আমাদের সোনার ছেলেরা টাইগার গর্জনে বিশ্ব ক্রীড়াজগতে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ান। এভারেস্ট জয় করে রেকর্ড সৃষ্টি করেন বাংলার তরুণ-তরুণীরা। জাগরণের আরেক নতুন মাত্রা। রোবোটিক বিশ্ব, গণিত অলিম্পিয়াড কিংবা জলবায়ুর পরিবর্তনে নতুন ব্যবসার ধারণা দিয়ে পুরস্কার জিতে আনেন দেশের তরুণরা। কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই। রাজনীতির পরিবর্তনে জাগ্রত হচ্ছে তরুণসমাজ। অতএব পরিবর্তন আসবেই।
এবারের ১৬ ডিসেম্বর ভিন্ন মর্যাদায় আর বিজয়ের আত্মতৃপ্তির নতুন জাগরণে পালিত হলো। এবার তরুণদের ভূমিকা ছিল দেখার মতো। তাদের অনুভূতি ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে জাতির মননে। এতদিন একটা বদ্ধমূল ধারণা ছিল, তরুণসমাজ স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচার কিংবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিষয়ে মাথা ঘামায় না। তরুণরা এ ধারণা ভুল প্রমাণ করেছেন। বরং উল্টোভাবে জানান দিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা জেগে আছি, ভয় নেই। এবার বিজয় উদযাপন হলো দায়মুক্তি শুভ সূচনার মধ্য দিয়ে। তাই এ জাগরণে দেখা গেছে ভিন্নমাত্রা। দেশব্যাপী বিজয় দিবস উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠান পালন করা হয়েছে। বিজয় দিবসের সকালে দেখা গেল দেশের তরুণ প্রজন্মের বিজয় সাইকেল র‌্যালির ভিন্নধর্মী আয়োজন। এ র‌্যালিতে শুধু ঢাকার নয়, ঢাকার বাইরে থেকেও অনেকে এসেছেন এ র‌্যালিতে অংশগ্রহণ করতে। এ সাইকেল র‌্যালিতে কয়েক হাজার তরুণ-তরুণীকে অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে। র‌্যালিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন কিছু বিদেশি মানুষ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটে পাকিস্তানি বাহিনী যে উদ্যানে আত্মসমর্পণের দলিলে সই করেছিল, তখন এর নাম ছিল রেসকোর্স ময়দান। ঠিক সেখানটায়, সেই ক্ষণে ১৬ ডিসেম্বর ২০১৩ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটে স্থাপিত হলো ‘বিজয় ২০১৩’-এর মঞ্চ। আর লাখো কণ্ঠে গেয়েছেন ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’। বিশ্বরেকর্ড তালিকায় ইতিহাস সৃষ্টি করল জাতীয় সংগীতের সুরেলা কণ্ঠে উজ্জীবিত বাংলাদেশের নাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ গানটিই একাত্তরের রণাঙ্গনে বাঙালি জাতিকে প্রেরণা জুগিয়েছিল। একই দিনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘মানব পতাকা’ তৈরি করে গিনেস বুকে রেকর্ড গড়ল বাংলাদেশ। ২৭ হাজার ১১৭ জন স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে এ মানব পতাকা তৈরি করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর সোমবার দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে শেরেবাংলানগরে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে এ বিশ্বরেকর্ড গড়া হয়। ৬ মিনিট ১৬ সেকেন্ডে হেলিকপ্টার থেকে ক্যামেরা দিয়ে ছবি নিয়ে বিশ্বকে জানিয়ে দেওয়া হলো, এখন থেকে সবচেয়ে বড় মানব পতাকার দেশ বাংলাদেশ। এরপর গিনেস বুক থেকে আসা ১৮ জনের অডিট দল ঘোষণা করে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় মানব পতাকার রেকর্ড বাংলাদেশের। ২৭ হাজার ১১৭ জন উপস্থিত থেকে এ পতাকার রূপ দিয়েছে। আর ভয় নেই। জেগেছে তরুণ প্রাণ Ñ অফুরান প্রাণশক্তিতে স্লোগাণে স্লোগানে মুখরিত জয় বাংলা। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।
লেখক : উন্নয়ন গবেষক