মুক্ত কলাম: প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় উপকূলীয় বাঁধের সুরক্ষা জরুরী


প্রকাশিত : জানুয়ারি ২৮, ২০১৪ ||

প্রকাশ ঘোষ বিধান: ২৮ জানুয়ারি জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো নানা আয়োজনে দিবসটি পালন করছে। সারা বিশ্বে বাংলাদেশ একটি দুর্যোগ প্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ও নদী ভাঙনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত মোকাবেলা করতে হচ্ছে। দেশের ১৯টি উপকূলীয় জেলার ৪৭ হাজার ২শ ১১ বর্গ কিলোমিটার উপকূল অঞ্চলভূক্ত। বৈশ্বিক উঞ্চতা ও জলবায়ু পরিবর্তনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দিন দিন বেড়ে চলেছে। উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা অনেকটা প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদী ভাঙনের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপকূলবাসীর নিত্যদিনের সঙ্গী।
১৯৭০ সালে ১২ নভেম্বর প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানলে তাতে প্রায় ৫ লাখ লোক প্রাণ হারায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানির দিক থেকে এটা ছিল সব থেকে বিধ্বংসী। ১৯৮৫ সালে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস উড়িরচর অঞ্চলে আঘাত হানে। ১৯৯১ সালে ২৯ এপ্রিল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল অঞ্চলে আঘাত হানলে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার লোক প্রাণ হারায়। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর আঘাত হানে সিডর ও ২০০৯ সালের ২৭ মে জলোচ্ছ্বাস আইলার ক্ষত এখনও উপকূলবাসী কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ১৯৭০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৬টি প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় ৭ লাখ মানুষ মারা গেছে। গবাদি পশু প্রায় ১৩ লাখ, সুন্দরবনের ১৫ হাজার হরিণ ও ৯টি বাঘ মারা যায়। উপকূলীয় অঞ্চলে ১৫৮৪ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ৩৮৫ বছরে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সংখ্যা ছিল ২৭টি। আর ১৯৭০ সালের মে থেকে ২০০৯ সালের মে পর্যন্ত মাত্র ৩৯ বছরে একই ধরণের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সংখ্যা ২৬টি। প্রতি বছর গড়ে ৮০টি ঘূর্ণিঝড় পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়। এর অধিকাংশ সমুদ্রে মিলিয়ে যায়। অল্প সংখ্যক উপকূলে আঘাত হানে, যা অনেক সময় ভয়াবহ ক্ষতিসাধন করে।
নিরাপদ বার্তা জানায়, ১৮৭৬ সালে থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ১২৫ বছরে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ৮৩টি বড় ও মাঝারী ধরনের ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। সিডর, আইলাসহ প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস উপকূলবাসীর বহু প্রাণহানি ঘটিয়ে অসংখ্য মানুষকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। বর্তমান ঘূর্ণিঝড় মৌসুমগুলো ব্যতিক্রমী আচরণ করছে। সম্প্রতি তা চরম আকার ধারণ করেছে। গত কয়েক দশক ধরে বঙ্গোপসাগরে সময়-অসময়ে ঘন ঘন নানা সামদ্রিক দুর্যোগ সৃষ্টি হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় মৌসুমে সমুদ্রে মাত্রাতিরিক্ত লঘুচাপ ও নিম্ন চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। আর শুধু তাই না, প্রাকৃতিক দুর্যোগের গতি, শক্তি, সংখ্যা এবং স্থায়িত্বের রেকর্ডও দিন দিন পেরিয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ সিডর ও আইলার ভয়াবহতা উপকূলীয় এলাকার মানুষ আজও ভুলতে পারেনি।
গত কয়েক দশকে দুর্যোগ প্রবণ এই দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ খুব বেশি হারে দেখা দিচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি আগের চেয়ে অনেক ভাল। বিশ্বের অনেক দেশ ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতির কর্মসূচির প্রশংসা করেছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ পরিচালনায় ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য। এর আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের বিপদ সংকেত পেলে তারা নিজ নিজ এলাকায় জনগণকে সতর্ক করে দিতে পারে এবং প্রয়োজনে আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার সময় সহায়তা করতে পারে। উপগ্রহ ও রাডারভিত্তিক প্রযুক্তিরও উন্নতি হয়েছে। এর ফলে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ সৃষ্টির পর থেকেই জনগণকে রেডিও, টেলিভিশন ও অন্যান্য গণমাধ্যমে অবহিত করা হচ্ছে। জনসচেতনতার জন্য দুর্যোগ বিষয়ক বেশ কিছু কর্মসূচিও গ্রহণ করা হয়েছে। আর সব থেকে বড় অগ্রগতি হলো ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী ত্রাণ বিতরণ।
১৯৭০ সালে প্রলংকারী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানলে প্রায় ৫ লাখ লোক মারা যায়। সে সময় আমাদের দুর্যোগের কোন রকম প্রস্তুতি প্রায় ছিল না। স্বাধীনতার পর বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় উপকূলীয় অঞ্চলে কিছু ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কয়েক বছরের মধ্যে তা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ১৯৮৫ সালে উড়িরচরে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানার পর ঐ অঞ্চলে নিউক্লিয়াস হাউজিং প্রকল্পের আওতায় পিলারের উপর ছোট ছোট ঘর তৈরী করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও বেসরকারি সংস্থা বেশ কিছু আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করে। ১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানলে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার লোক মারা যায়। এতে ভৌত অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির আর্থিক সহায়তায় ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগে আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা অব্যাহত রেখেছে। পরিকল্পনায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাসস্থানের ১ কিলোমিটারের মধ্যে যাতে একটি আশ্রয় কেন্দ্র থাকে। পূর্ব নির্মিত আশ্রয় কেন্দ্র ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকমত না থাকায় ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। মহাপরিকল্পনার বিষয়টি বিবেচনায় এনে আশ্রয় কেন্দ্রগুলো সারা বছর ব্যবহার করার লক্ষ্যে এগুলোর বেশির ভাগ স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। উপকূলীয় দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। দুর্যোগ প্রস্তুতিও সন্তোষজনক। ৯০’ দশকে প্রণীত আমাদের দুর্যোগ প্রস্তুতির মহাপরিকল্পনা উন্নত বিশ্বেও প্রশংসিত হয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস যেন বাংলাদেশের জন্য অনেকটা অপ্রতিরোধ্য। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আমাদের প্রস্তুতি ভাল হলেও উপকূলীয় অঞ্চলের বাঁধগুলো প্রায় অরক্ষিত। এসব বাঁধগুলো উপকূলবাসীর জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। উপকূলীয় দুর্যোগ সুরক্ষা ব্যবস্থায় অবকাঠামোগত যে দুর্বলতা তা দূর না করা গেলে উপকূলবাসীর জীবন ও সম্পাদক হুমকিতে থেকে যাবে। এক্ষেত্রে উপকূলের বাঁধগুলো রক্ষা করা জরুরী। আইলা ও সিডরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অনেক বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর অনেক অংশ এখনও মেরামত করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে উপকূলীয় সুরক্ষা বাঁধ নেটওয়ার্কটি শক্তিশালী করে তোলার বিকল্প নেই।