সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদীতে নেট জাল ব্যবহারে নির্বিচারে পোনা নিধন!

প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা (খুলনা): সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় নদ-নদীতে নিষিদ্ধ নেটজাল দিয়ে নির্বিচারে বাগদা চিংড়ি ও পারশের পোনা আহরণ অব্যাহত রয়েছে। সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার জেলে নেট জাল দিয়ে পোনা ধরছেন। এ নেটজালের অতি ক্ষুদ্র ফাঁক থেকে ডিমসহ অন্যান্য মৎস্য প্রজাতির কোন পোনাই রেহায় পাচ্ছে না। একটি বাগদা পোনা সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রায় ১৫০টি অন্যান্য চিংড়ি, ৩৬টি সাদা মাছের পোনা, ৫৫৪টি জুপ্ল্যাাংকটন নষ্ট হচ্ছে। এতে মৎস ভাণ্ডারখ্যাত সুন্দরবনসহ উপকূলীয়ঞ্চলের মৎস্য সম্পদ ও জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়েছে।
সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর উপকূল এলাকার হাজার হাজার শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ, সাগর-সুন্দরবনের বিভিন্ন নদ-নদী ও খালে নিষিদ্ধ নেট জাল দিয়ে পোনা আহরণ করছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে মাছের পোনা ধরতে আসা জেলেরা উপকূল সংলগ্ন নদীর তীরে মৌসুমভিত্তিক অস্থায়ী বসতী গড়ে তোলে। সুন্দরবন সংলগ্ন পুশুর, শিবসা, ভদ্রা, খোলপেটুয়া নদীর বাজুয়া পাইকগাছা, কয়রা, শ্যামনগর, নলীয়ানসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন কয়েক হাজার নেট জাল দিয়ে বাগদা ও পারশে পোনা আহরণের নামে চলছে মৎস্য সম্পদ ধংসের মহাযজ্ঞ। মৌসুমী জেলেরা নদীর খালে নেটজাল ফেলে ও নদীর কূলে টানা নেটজাল দিয়ে পোনা ধরছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দবনের নদ-নদীর খালে বাগদা, গলদা, হরিণা, ঘুসা, মটকা, রসনাই, চাপদা, চটকা, চাকাসহ নানা প্রজাতির চিংড়ি রয়েছে। এছাড়া ভেটকি, টেংরা, পারশে, ইলিশ, পাঙ্গাস, দাতনা, ভাঙাল, মাগুর, বাইন, চেলা, পুঁটিসহ নানা প্রজাতির মাছ ও কাঁকড়া রয়েছে। এ ছাড়া এসিটিস, মাইসিটস, কপিপাড, আইসোপাড, এ্যালিমালার্ভিসহ কয়েক প্রজাতির প্ল্যাংকটন রয়েছে। জালে ধৃত বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণি থেকে জেলেরা বাগদা ও পারশে পোনা বেছে নিয়ে অন্যান্য প্রজাতির চিংড়ি, সাদামাছ, কাঁকড়া ও জুপ্লাংকটনসহ জলজ প্রাণি ডাঙায় ফেলে দেওয়ায় সেগুলো মারা যাচ্ছে। ফলে বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়ি, সাদামাছ, ম্যাক্রো জুপ্লাংকটনসহ নানা প্রজাতির জলজ প্রাণি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পাইকগাছা লোনা পানি গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য মতে, খুলনার পাইকগাছা এলাকার একটি বাগদা পোনা আহরণে ১১৯টি অন্যান্য চিংড়ি, ৩১টি সাদামাছ ও ৩১২টি জুপ্লাংকটন ধ্বংস হচ্ছে। এছাড়া সাতক্ষীরা এলাকায় একটি বাগদা পোনা আহরণে ১৫০ অন্যান্য চিংড়ি, ৩৬টি সাদামাছ ও ৫৫৪টি জুপ্লাংকটন ধ্বংস হচ্ছে। এর ফলে সুন্দরবনে নদী-খালে মাছের অভাব দেখা দিয়েছে ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। সাগর মোহনা ও সুন্দরবন উপকূলে নদ-নদীতে নিষিদ্ধ জাল দিয়ে পোনা আহরণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও জেলেরা তার পরোয়া না করে পোনা আহরণ করছে। আহরণকৃত পোনা উপকূলীয় বিভিন্ন চিংড়ি ঘেরে বিক্রি হচ্ছে। পাইকগাছার ঘের মালিক আজিজ, শাহীনুর ও অসীম জানান, হ্যাচারির পোনার চেয়ে নদীর পোনা ঘেরে ছাড়লে তাঁতে চিংড়ি উৎপাদন বেশী হয় এবং ভাইরাসসহ অন্যান্য ঝুঁকি কম থাকে। এজন্য নদীর পোনা হ্যাচারির পোনা থেকে দিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। আর দাম বেশী হওয়ায় জেলেরা নিষিদ্ধ নেটজাল দিয়ে নির্বিচারে নদ-নদীর মোহনা থেকে পোনা আহরণ করছে।
সুন্দরবন বন বিভাগের খুলনা রেঞ্জ কর্মকর্তা জহিরুল হক জানান, নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নেটজাল দিয়ে কেউ যাতে পোনা আহরণ করতে না পারে তার জন্য বন বিভাগের টহল জোরদার করা হয়েছে। এরপরও যারা নেট জাল দিয়ে পোনা আহরণের কাজে নিয়োজিত রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।