পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে টেকসই জীবনযাপনে অনুকরণীয় মডেল: শ্যামনগরের আশ্রায়ন প্রকল্পের মুন্ডা পরিবারগুলো


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৪ ||

রনজিৎ বর্মন, সুন্দরবনাঞ্চল: ‘লবণাক্ততার কারণে এখানে কিছু ছিল না। প্রথম যখন এখানে আসছি তখন চারদিক ফাঁকা ছিল। দেখলি মনে হতো মরুভূমি। আর চারদিকে লোনা ধুলো উঠতেছে। আইলার পর ব্যারাকে আসছি। তখন থেকে এখনও আছি। সারা বছর শাক সবজি লাগাচ্ছি, খাচ্ছি, মাঝে মধ্যে বিক্রি করছি। অনকে রকমের গাছের চারা রোপন করিছি।’
শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন ইউনিয়ন বুড়িগোয়ালিনীর আশ্রায়ন প্রকল্পের ৪নং ব্যারাকের বাসিন্দা সন্তোষ মুন্ডার স্ত্রী কৌশল্যা মুন্ডা (৩৫), হারাণ মুন্ডার স্ত্রী আশালতা মুন্ডা (৪০)সহ আরও অনেকেই এভাবে বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জীবনসংগ্রামের কথা।
তারা আরও বলেন, ‘চুনা নদীর চরে নির্মিত এ ব্যারাকের জায়গায় এত বেশী লবণাক্ততা যে ঘাস পর্যন্ত হতো না। এ অবস্থায় বসবাস করা প্রথম দিকে দুর্বিষহ হয়ে উঠে। এক পর্যায়ে নিজেদের প্রচেষ্টায় বাইরে থেকে ঘাস এনে লাগানোর চেষ্টা করি। ব্যারাকের পূর্ব পাশে লবণ পানির চিংড়ি ঘের। কোন সবুজ গাছপালা নেই।’
৪নং ব্যারাকের মুন্ডা পরিবারের এ প্রচেষ্টাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে বেসরকারি সংগঠন বারসিক। মুন্ডা পরিবারগুলোর আশা আকাক্সক্ষা পূরণে লবণ মাটিতে ভরপুর আশ্রায়ন প্রকল্পের ফ্রি জৈব সার, শাক-সবজির বীজ, উৎপাদনের জন্য কিছু কৃষিজ যন্ত্রপাতি বিতরণ করেন। এর সাথে শাক-সবজি উৎপাদন বিষয়ে প্রশিক্ষণও প্রদান করেন। আইলার এক বছর পর থেকে অদ্যাবধি এ আশ্রায়ন প্রকল্প শাক-সবজিতে ভরে উঠেছে।
ব্যারাকে বসবাসকারী নীলকান্ত মুন্ডার স্ত্রী কল্যাণী মুন্ডা ও এলা মুন্ডার স্ত্রী সবিতা মুন্ডা জানান, বছরের প্রায় প্রতিটি মৌসুমে শাক-সবজি উৎপাদন করে নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করছেন তারা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আশ্রায়ন প্রকল্পের মুন্ডা পরিবারের সদস্যরা শীত মৌসুমে আলু, বাঁধা কপি, ফুল কপি, পালং শাক, লাল শাক, পুইশাক, বেগুনসহ অন্যান্য শাক-সবজি চাষ করেন। তারা নিজেদের ফসল নিজেরা তৈরি করতে শিখেছেন। এ সবজি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাগানের চারপাশে বারসিকের সহায়তায় নেট দিয়ে বেড়া দিয়েছেন।
জানা যায়, প্রথমদিকে আইলার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য বারসিক তাদের এ উদ্যোগকে সহায়তা করেছিল। এখন তারা নিজেরাই শাক-সবজির বীজ সংরক্ষণ ও রোপন করেন। অন্যের নিকট থেকে ঋণ করা বা ক্রয় করার খুব বেশী প্রয়োজন হয় না। তাদের জৈব সারের প্রয়োজন মেটাতে বারসিক পরিবার পিছু ২টা করে শুকর প্রদান করেন এবং এ শুকরের পায়খানা ক্ষেতে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। অপরদিকে শুকরের বাচ্চাও বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন তারা।
কৃষক, বনজীবী সংগঠনের সম্পদ, জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ৪নং ব্যারাকের মুন্ডা জনগোষ্ঠীর জীবন জীবিকা অর্জনে এনে দিয়েছে আমূল পরিবর্তন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে টিকে থাকার লক্ষ্যে উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে আশ্রায়ন প্রকল্পের মুন্ডা পরিবারগুলো।
জানা যায়, ৪নং ব্যারাকে ২০টি মুন্ডা পরিবার বসবাস করে। সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে উপকূলীয় এলাকা বুড়িগোয়ালিনীতে সরকার ২০০২ সালে প্রায় ১০ একর জায়গায় আশ্রয়ন প্রকল্প নির্মাণ করে। সেখানে নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ১০টি শেড নির্মাণ করা হয়। প্রতিটি শেডে ১০টি করে ঘর নির্মাণ করা হয়। খনন করা হয় ৫টি মিষ্টি পানির পুকুর।
আবাসন প্রকেল্প সরকারিভাবে ৩০টি জেলে, ২০টি আদিবাসী মুন্ডা, ২০টি প্রান্তিক হিন্দু, ৩০টি মুসলিম পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়।
সেখানকার আদিবাসী মুন্ডা পরিবারের সদস্যরা জানান, এ কর্ম প্রক্রিয়াকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রয়োজন জৈব সার। জৈব সার তৈরীর জন্য প্রয়োজন গবাদি পশু পালন। এর মাধ্যমে পুষ্টিকর দুধ, গোবর দ্বারা জৈব সারসহ জ্বালানি সংকট কেটে যেতে পারে। গাভী পালন ও শাক-সবজি উৎপাদনে সেচ সুবিধার জন্য সেচ যন্ত্রের সমস্যার কথা তুলে ধরেন তারা। অপরদিকে চিংড়ি চাষ অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে গোখাদ্য সংকটে গাভী পালনের সমস্যার বিষয়টিও উল্লে¬খ করেন।
আশ্রায়ন প্রকল্পে সরকারি প্রতিনিধিদের পরিদর্শনের বিষয়ে কৌশল্যা মুন্ডা ও আশালতা মুন্ডা বলেন, তারা খুব কম আসেন। আমাদের সাথে খোলা মেলা কথাও বলেন না। তারা জানান, ব্যারাকে বিনোদনের অভাব রয়েছে। বিদ্যুৎ লাইন টানা হলেও সংযোগ নেই।
ব্যারাকে মুন্ডা পরিবারগুলোর সহায়তাকারী সংগঠন বারসিকের কর্মকর্তা শাহিন ইসলাম ও মননজয় মন্ডল জানান, জলবায়ু পরিবর্তন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার বসতভিটা থেকে বিছিন্ন। তাদেরকে সারা বছর কৃষি ফসল উৎপাদন এবং বনায়নের জন্য সহযোগিতা করেছি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলী হোসেন বলেন, আশ্রায়ন প্রকল্প পরিদর্শন করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।