‘বই’ সুদয় কুমার মণ্ডল


প্রকাশিত : জুলাই ৯, ২০১৫ ||

মানব সভ্যতার প্রারাম্ভে ও সভ্যতার ক্রম বিকাশে মানুষের কল্যাণে জাগতিক ও পার্থিব অজস্র জ্ঞান ভাণ্ডার সমৃদ্ধ, সংরক্ষণ-এর লিপিবদ্ধ আকরই বই। বই সঞ্চিত জ্ঞানের ধারক ও বাহক। বই মানুষের চিন্তা চেতনার বহি:প্রকাশ ঘটিয়ে সভ্যতাকে বিকশিত করে তোলে। এক কথায় জাগতিক ও পার্থিব সকল জ্ঞানের গচ্ছিত ভাণ্ডার বই। মানুষের জ্ঞানগর্ভ চিন্তা চেতনার সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি, সংগত ও সুশৃঙ্খল রীতিনীতির বিন্যাসে সৃষ্টিধর্মী আবহমান কালের সকল প্রয়োজনীয়তার সুষ্ঠু সমাধানের মন্ত্র বাক্যই বই। সাগর, মহাসাগরের যেমন বিশাল জলরাশি সঞ্চিত থাকে, তদ্রুপ বইয়ের গর্ভে বিশাল জ্ঞানরাশি গচ্ছিত থাকে।
সাগর-মহাসাগর যেমন স্বীয় বক্ষে ধারণ করা বিশাল জলরাশি উপচে দিয়ে নদনদীর বুকে জোয়ারে প¬াবনের  ঢেউ তুলে পার্শ্ববর্তী সমতট ও সমভূমিকে উর্বরতায় সমৃদ্ধশালী ও শস্যময় করে তুলে থাকে Ñ বইয়ের গর্বে নিহিত সেই বিশাল জ্ঞানরাশির ঢেউয়ের প¬াবন মানব মস্তিষ্কে চিন্তা- চেতনার জাগ্রত সত্ত্বাকে উৎকর্ষনপূর্বক আরও উর্বর করে মননে ও মগজের প্রভূত বিকাশ ঘটায় ও নবলোকের নতুন দ্বার উদঘাটন করে থাকে। জীব দেহে যেমন প্রাণ থাকে, তাই জীবকে গতিশীল করে তোলে।
নিশ্চল জড় পদার্থ ‘বইয়ের’ গর্ভে অসংখ্য জ্ঞান ভাণ্ডার সঞ্চিত থাকে যাহা প্রতিনিয়তই প্রাণবন্ত। প্রাণ শূন্য জীবদেহ মৃত প্রায়, অসাড়, কিন্তু বইয়ের গচ্ছিত জ্ঞান কখনো প্রাণ শূন্য ও অসাড় নহে। শ্বাশত কাল প্রাণবন্ত ও সৃষ্টিধর্মী। আর সেই সৃষ্টিধর্মী রক্ষিত জ্ঞানালোক বর্তিকার সুদীপ্ত প্রভায় সমগ্র বিশ্বকে নতুন আলোয় নতুন সত্ত্বায় প্রকাশ করে থাকে। বইয়ের সুবিশাল জ্ঞান গর্ভ অন্ধকারের পথিকের আলোর পথের দিশা। দূর পাল¬ার ট্রেনে যেমন সহজেই যাত্রী সকলের নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দিয়ে থাকে। বইয়ের জ্ঞান যান্ত্রিক যুগে যান্ত্রিক পর্যায়ের ন্যায় জ্ঞান সাধকের সহজেই নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছিয়ে দিতে সক্ষম। বই জ্ঞান সাধকের ‘পারের তরী’ আর এই তরী বহিয়ে অকুল সমুদ্র পাড়ি জমিয়ে প্রকৃত জ্ঞান সাধক জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশ করতে পারেন। বই ভাবাবেগের আসল দ্বার।
মানুষের উর্বর মস্তিষ্কের সুচিন্তার ফসল বিশাল জ্ঞানরাশি বিভিন্ন ভাষার সাংকেতিক চিহ্ন ও লিখন পদ্ধতি আবিষ্কারের সাথে সাথে, নরম কাদায় তাম্র পাত্রে, পাথরে খোঁদাই, পরবর্তীতে চীন দেশে কাগজ আবিষ্কারের সাথে সাথে কাগজে লিপিবদ্ধ করে মনোমত উৎকর্ষ সাধন করে বই আবি®কৃত হয়। বই আবিষ্কারের বহু পূর্বে জ্ঞানগর্ভ সমন্বিত সৃষ্টিধর্মী স্রষ্টারা তাদের উর্বর মস্তিষ্কের কেন্দ্রবিন্দু মগজে ও মননে সেই গচ্ছিত জ্ঞান সঞ্চিত রেখে প্রয়োজনে মুখে মুখে প্রচার ও প্রকাশ করিতেন, যেমন আরব্য সাহিত্যিক ও কবি হারিজ-হিজিলা, আনতারা বিন লাবিব, ওমর বিন কুলসুম প্রভৃতি যশস্বী গাথা ও প্রোথিত যশা কবি সাহিত্যিকের ন্যায় আরও অনেক খ্যাতনামা মেধা সম্পন্ন কবি ও সাহিত্যিকের মৌখিক ও মুখস্ত শক্তির দ্বারা তাঁদের গচ্ছিত ও সঞ্চিত জ্ঞানের বহি:প্রকাশ ঘটাত। আর এই দুঃসাধ্যতম কঠিন কৌশলের শৃঙ্খল থেকে ক্রমে ক্রমে বেরিয়ে এসে আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়ায় কলম কালির আবিষ্কারের সাথে সাথে যেন বর্ণিল আকাশের স্বপ্নিল স্বপ্নকে পূরণ করে যশের অমরত্ব প্রতিষ্ঠা করলো।
মহাসমুদ্রের শতবর্ষের কলে¬ালকে যদি কোন যাদুকরী শক্তি বা অলৌকিক শক্তির মানদণ্ডে প্রতিটি ঢেউয়ের আপেক্ষিক গুরুত্ব ও উহার ক্ষিপ্রতার গতি পরিমাপ করা সম্ভব হতো, সুদুরে বিলিয়ে যাওয়া মুহূর্তকে যদি হাতছানি দিয়ে ফিরিয়ে আনা  যেত, নির্বাপিত প্রদীপ যদি অকস্মাৎ জ্বলে উঠতো, সকল প্রয়োজন যদি স্বাভাবিক ও ঐশ্বিকভাবে আবশ্যিক সুষ্ঠু সমাধান হতো, কর্মচঞ্চল পৃথিবীর মানুষ কর্মহীন অবসর জীবনযাপন করতো, আকাশের পূর্ণ শশী তার øিগ্ধ মনোহর রূপ নিয়ে শান্তির পরশ ছড়িয়ে ধুলার পৃথিবীতে নেমে আসত, তবে বই অনাবশ্যক হয়ে পড়তো। পৃথিবীর সুক্ষ্ম বালুকণাগুলি তখন সেই মহিমান্বিত তাৎপর্য বহন করতো। প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক সকল শক্তি সৃষ্ট সমস্যার সমাধান ও সকল প্রয়োজনের বাহক ও হাতিয়ার হতো। কিন্তু তা আশাতীত, অনাগত, অনাহুত, অসম্ভব। অনুপর্তির সামিল। কেবলমাত্র বই-ই পারে সেই সম্ভাবনার নতুন জগৎ সৃষ্টি করতে। বিশ্ব সভ্যতার নতুন দিক উন্মোচন পূর্বক সমগ্র বিশ্ব মানবের কল্যাণে যোগ সেতু স্থাপন করে ‘বই’।
জগৎ সংসারে নানা বিষয়ে আদ্যান্ত বিচারে পারদর্শী হওয়ার সুক্ষ্ম বীজমন্ত্র বইয়ের গর্ভে গচ্ছিত ও সংরক্ষিত থাকে। জীবনের ঘুমন্ত শক্তি মস্কিষ্কের সমস্ত লুকানো ক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলার সকল কলা কৌশলই বই। সভ্যতার সংকটে বই নবতম পথের দিশারী।
মানুষ মরণশীল কিন্তু তাঁর প্রতিভার কীর্তি অমর। শ্বাসতকাল ধরে রাখে বইয়ে। বই জ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন করে। বই জ্ঞানের ধারক ও বাহক।
মানব সভ্যতার ইতিহাসে ধূমকেতুর ন্যায় গোড়াপত্তন কারী যে সমস্ত বিদগ্ধ বিমুগ্ধ চিন্তা সম্পন্ন ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব হয়েছিল তন্মধ্যে সক্রেটিস, পে¬টো, এরিস্টল, মিলটন, বায়রন, হোমার, সেক্সপিয়ার, বাল্মিকী, ব্যাসদেব, পানিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মাইকেল, নিউটন, আর্কিমিডিস, গ্যালিলিও এবং রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক প্রভৃতির স্বনামধন্য উলে¬খিত ব্যক্তিত্ব ও আরও অনেকে।
আর এই সমস্ত উলে¬খিত ব্যক্তিত্বের ঐকান্তিক সাধনার সিদ্ধ ফল বইয়ের গর্ভে লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষিত। মাতৃগর্ভ জাত শিশু যেমন মাতৃদুগ্ধ পান করে ক্ষুৎ পিপাসা নিবারণ ও বর্ধিত হয়Ñতদ্রুপ সন্তানরূপী বিগদ্ধ ব্যক্তিত্ব প্রকৃতির দুগ্ধ পান করে জ্ঞান পিপাসা নিবারণ পূর্বক সমাজ-সভ্যতা সর্বোপরি মানুষের অশেষ কল্যাণে ও মুক্তির পথের দিশা। সেই সুবিশাল জ্ঞানের সমুন্নত শিখা জ্ঞানের পরসা দিয়ে সাজিয়ে বিপনী থরে থরে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে বইয়ের অন্তরে। সার্বিক বিকাশে ও সবকিছুর উন্নয়নের মূলে বিশাল জ্ঞানভান্ডার বই। নাট্যকার, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, বিচারক, কবি-সাহিত্যিক এমনকি সকল জ্ঞানের পূজারী বইয়ের স্বাদ গ্রহণ করে নিজেদের ধন্য ও মহিমান্বিত করে তুলেছেÑ সাথে সাথে ওদের উন্নত জ্ঞানগর্ভ চিন্তা-চেতনা বইয়ের গর্ভে লিপিবদ্ধ করেÑ চির স্মরণীয় ও অমরত্বের সোপান সৃষ্টি করেছেন এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ সমাজ ও সভ্যতাকে নব নব সাজে সাজিয়ে সুখী সমৃদ্ধশালী এক আধুনিক সভ্যতার উপহার দিয়েছেন। যা বর্তমান বিশ্বে এক যুগান্তকারী অধ্যয়ের সূচনা করেছেন। বই অতীত, বর্তমান মহাকালের সাক্ষী হিসেবে ভবিষ্যতের দিক দর্শন প্রদান করেÑ সেই আলোকে নব সৃষ্টির নতুন দ্বার দিয়ে এক অভিনবত্বের সম্ভবনাময় আশির্বাদ প্রদান করে। বই জাগতিক এবং পার্থিব জ্ঞানের উন্মুক্ত উপাসনালয়। আপনজন অনেক সময় শত্র“ হয় কিন্তু বই কখনো শত্র“ হয় না বরং বইয়ের অফুরন্ত জ্ঞান ভাণ্ডার মানুষের আন্তরিকতার, অন্তস্বত্বার বিকাশ সাধন করে। স্মৃতিকে আবহমানকাল ধরে রাখে। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত মার্কিন লেকক এবং লাইব্রেরিয়ান ‘মার্ক টুয়েন এর মত ও প্রণিধান যোগ্য। বই চিন্তা চেতনার উদ্ভুত ফসল, ও স্মৃতির মাইল ফলক।
বই প্রসঙ্গে লেখকের সর্নিবন্ধ নিবেদন আজকের এই অশুভ লগ্নে বিশ্ব মানব, সভ্যতার সকল ধ্বংসাত্মক দিক পরিহার করে বইকে সকল সমাধানের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে, বইয়ের পূজারী হয়ে যুগোপযোগী জ্ঞানের আলোকে মানব সভ্যতার কল্যাণে বইকে আরও আপন করে বইয়ের প্রতি এমনই মনোনিবেশ করতে হবে যেন কোন অশুভ শক্তির অযথা হুংকার ও গর্জন ও অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝন শব্দ কর্ণকুহর দিয়ে মগজ ও মননে প্রবেশ করতে না পারে। কোন অহিত বা ক্ষত না সৃষ্টি করতে পারে। সেই লক্ষ্যে বইয়ের প্রতি অপরিসীম গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। মানব জীবনে দুর্গম পথ পরিহার করে সুগম পথে এগুতে হবে, তবেই শান্তি স্থাপন করা সম্ভব হতে পারে। আর একমাত্র সমাধান করতে পারে বই। তাই বইয়ের মত আপন পৃথিবীতে আর কিছুই নেই। বইকে যারা ভালোবাসে, এবং অনুশীলন করে তারা ঈশ্বর প্রেমিক, আর ঈশ্বর প্রেমিক ব্যক্তিরা বইয়ের বিশাল জ্ঞান মহাসাগরে অবগাহন করে শুদ্ধতার জ্ঞানতরী চড়ে  মানব কল্যাণের প্রশস্ত দিক নির্দেশনায় বিজয়মাল্য ছিনিয়ে আনতে পারে।
‘বই কালের সাক্ষী মহাকালের রেকর্ড’। বিশ্ব সভ্যতার চত্বরে কালজয়ী বইয়ের ভূমিকা অনস্বীয়কার্য।
‘বই’ জ্ঞানীর সাধনার সুস্বাদু ফল আর এই ফল আস্বাদন করলে জ্ঞানের সমস্ত দ্বার খুলে যায়। ভাবালোকে জ্ঞান লোকে যাওয়ার পথ সুগম হয়।