মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান চর্চার গুরুত্ব


প্রকাশিত : জুলাই ২১, ২০১৫ ||

রনজিৎ বর্মন
আমাদের দেশে প্রতি বছর যে বিরাট সংখ্যক শিক্ষার্থী ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং বা বিজ্ঞানের অন্যান্য ভালো বিষয়গুলো পড়ার জন্য আবেদন করে, তার খুব সামান্য একটা অংশই সেগুলো পড়ার সুযোগ পায় বলে মনে হয়। আর অন্যান্য যারা বিজ্ঞান বিষয়গুলো নিয়ে পড়ে তারা চাকুরির বাজারে অন্য কোনো বিশেষ চাকুরি পায়, তবে কম। ব্যাংকে চাকুরি করতে, কোনো কোম্পানির ম্যানেজার হতে বা অন্য কোনো প্রাইভেট ফার্মে চাকুরি করতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানের ছাত্র না হলেই চলে, তবে আজকাল এ সকল ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানের ছাত্ররা ভালো ভালো চাকুরি পাচ্ছে। আর বিজ্ঞানের ছাত্র হলেই বা কী? তার তো আলাদা কোনো বেতন ¯েকল বা সুযোগ সুবিধা নেই। শুধু শিক্ষকতাকে বিষয় অনুযায়ী আলাদা শিক্ষকের প্রয়োজন। কিন্তু বিষয় অনুযায়ী আলাদা শিক্ষকের প্রয়োজন হলে কি হবে, বিষয়ভিত্তিক আলাদা বেতন স্কেল নেই। বিজ্ঞানের শিক্ষককে ক্লাস ছাড়াও আলাদা ব্যবহারিক ক্লাস করতে হয়। ছাত্র জীবনে যাকে ক্লাস শেষে বা ক্লাসের আগে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ব্যবহারিক ক্লাসে কাজ করতে হয়েছে, আজ কর্মক্ষেত্রে তার আলাদা কোনো মর্যাদা নেই। অতিরিক্ত পরিশ্রমের জন্য আলাদা দুটো পয়সা নেই। এগুলো দেখার যাদের চোখ আছে, যারা বোঝে তাদের সন্তানদের বিজ্ঞান পড়াতে আগ্রহ সৃষ্টি করবে কিনা সন্দেহ আছে। ২০০২ সালের ৮ জুলাই একটি দৈনিক পত্রিকার মুক্তকথা পাতায় প্রকাশিত অসীম কুমার ভৌমিকের লেখা বিজ্ঞান শিক্ষার হালচালের কিছু অংশ নিয়ে কথা হয় শ্যামনগর সরকারি মহসীন ডিগ্রি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিষয়ের প্রভাষক ড. প্রতাপ চন্দ্র রায়ের সাথে। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, বিজ্ঞান শিক্ষা শেষে ব্যাংক বা প্রশাসনিক বিভিন্ন পদে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীরা চাকুরি করছেন। যার জন্য বিজ্ঞান শিক্ষা কাজে আসছে না। এ কারণেই বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ কম। বিজ্ঞান শিক্ষা সমাপ্ত করার পর যথাযথ প্রায়োগিক বিষয়ে কাজের অভাবের জন্য দিনে দিনে বিজ্ঞান শিক্ষার্থী কমছে বলে তিনি মনে করেন। একজন ছাত্র অভিভাবক অমল কুমার মণ্ডল এ বিষয়ে বলেন, যারা বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয় তাদের অধিকাংশের লক্ষ্য থাকে প্রকৌশলী বা ডাক্তার হওয়া। কিন্তু কয়জন সে স্বপ্ন পূরণ করতে পারে? প্রাইভেট, বিজ্ঞান শিক্ষার উপকরণ ও বিজ্ঞান বিষয়ে পড়ার ক্ষেত্রে অন্যান্য ব্যয়ের কথা চিন্তা করে বাধ্য হয়েই অভিভাবকদের পিছিয়ে আসতে হয়।
বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থী হিসেবে আগ্রহ কম কেন? এ বিষয়ে একটি বিদ্যালয়ের ছাত্রী রোহিনী মণ্ডল বলেন, অর্থের অভাব এবং প্রাইভেটে ভালো শিক্ষক পাওয়া যায় না। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রীতা রাণী, কৃপা যোয়ার্দার বলেন, অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় বিজ্ঞান কঠিন মনে হয়। ২০১২ সালের ৮ জুলাই যায়যায়দিন পত্রিকায় বিজ্ঞান শিক্ষার হালচাল নিয়ে প্রকাশিত লেখায় জানা যায়, ২০১১ সালে জুনে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমী নায়েম প্রকাশিত এক গবেষণায় যা বলা হয় তা থেকে বুঝা যায়, বিজ্ঞান শিক্ষার্থী কমার কারণগুলো হলো- আর্থিক, বিজ্ঞান অধ্যায়ন তুলনামূলকভাবে কঠিন, বাজারে শিক্ষা উপকরণের অপ্রতুলতা, পাঠ্যসূচি তুলনামূলক বিস্তৃত, দক্ষ শিক্ষকের স্বল্পতা, গবেষণাগার সুবিধা কম, নির্দিষ্ট সময়ে শ্রেণি কক্ষে পাঠ্যসূচি শেষ না হওয়া, শিক্ষকদের অবহেলা, ব্যবহারিক পরীক্ষায় নাম্বার কম পাওয়ার আশংকা এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা ভীতি। বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের সুত্রে প্রকাশ, ২০১১ সালের ২৪ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের সাথে মতবিনিময় সভায় বলা হয় বিশেষ করে বিশ্বের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জ্ঞান সমৃদ্ধ শিক্ষার মান এবং বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমাগত কমছে। ২০০১ সালের হিসাবে দেখা যায় বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল ২ লাখ ৬৪ হাজার ১০০জন। আর ২০০৮ সালে একই বিভাগে পরীক্ষার্থী কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮০ জন। অর্থাৎ কমেছে প্রায় ৮৭ হাজার। অথচ একই সময়ে ২০০১ সালে বাণিজ্য বিভাগে এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ৮২১ জন এবং ২০০৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৪৪১ জন। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পায় ১ লাখ ১০ হাজার। এইচএসসিতেও এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ২০০১ সালে এইচএসসি পর্যায়ে বিজ্ঞান পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ২৬ হাজার ৩১৫ জন। আর ২০০৯ এ বিজ্ঞান পরীক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৫২৩ জনে। অথচ একই সময়ে ২০০১ সালে বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৯৪ হাজার ২৮৩ জন এবং ২০০৯ এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৫৪ জনে। বিজ্ঞান শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করছে এমন সংগঠন সুত্রে প্রকাশ দক্ষিণ কোরিয়া জনপ্রতি ১৭৫ ডলার, মালেশিয়ায় ১৫৫ ডলার, ভারত ১৪ ডলার, পাকিস্তান ১০ ডলার এবং বাংলাদেশ মাত্র ৫ ডলার ব্যয় করে বিজ্ঞান শিক্ষায়। সংস্থাটির মতে বিজ্ঞান শিক্ষার সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ মৌলিক স্তর মাধ্যমিক পর্যায়। সরকারিভাবে সেখানেই বেশি মাত্রায় সম্পদ সমাবেশ করা হয়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে দেখা যায় ঐ স্তরেই বিজ্ঞান শিক্ষার বিপন্ন অবস্থা। সমগ্র বিশ্বে এখন প্রযুক্তির সর্বগ্রাসী জোয়ার। মানুষের জীবন ধারাকে ঢেলে সাজাচ্ছে প্রযুক্তি। ফলে জীবন ও জীবিকা উভয় ক্ষেত্রে প্রযুক্তি নির্ভরতার যে বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে-বাংলাদেশের জনশক্তি তার সাথে তালমেলাতে হলে বিজ্ঞান শিক্ষার উন্নয়ন করতে হবে। বিএফএফের মতে বিজ্ঞান বিভাগে লেখাপড়া করার প্রতিবন্ধকতা নানামুখি। বিজ্ঞানাগার সুবিধার অভাব, বিজ্ঞান শিক্ষকের অভাব, শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানভীতি, পারিবারিক অসচ্ছলতা, সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিজ্ঞান সম্পর্কে সচেতনতা ও আগ্রহের অভাব। এ ছাড়া অন্যান্য কারণে বিজ্ঞান শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন, ঢাকা কর্তৃক সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে প্রকাশ গ্রাম অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোর শতকরা ৬৬ভাগ বিজ্ঞানাগার নেই, যে সব বিদ্যালয়ে এ সুবিধা রয়েছে তারা অনেকে জানে না কীভাবে বিজ্ঞান উপকরণ ব্যবহার করতে হয়। অন্য দিকে বিজ্ঞান উপকরণগুলো নষ্ট হয়ে গেলে নতুন উপকরণ পাওয়ার অনিশ্চয়তা থেকে ছাত্র/ছাত্রীদের সব সময় বিজ্ঞানগার ব্যবহারের অনুমতি দেন না। এসএসসি পরীক্ষার জন্য ব্যবহারিক ক্লাসগুলো নবম শ্রেণি থেকে শুরু করার কথা থাকলেও তা দশম শ্রেণি থেকে এমনকি অনেক স্কুলে নির্বাচনী পরীক্ষার পরে শুরু হয়। ব্যবহারিক ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও সন্তোষজনক নয়। বিজ্ঞান মনস্ক অনেকে মতামত প্রকাশ করে বলেন, বিজ্ঞান শাখায় শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার নানামুখি সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিজ্ঞান ক্লাব গঠন করে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহী করে তোলা যায়। এ ক্লাবের সদস্যরা বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করবে, আলোচনা করবে, অন্যদেরকে বিজ্ঞান বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করবে এবং নিজেদের মতো করে বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরি করবে বা তৈরি করতে পারবে। বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন কুইজ, বির্তক প্রতিযোগিতা, দেয়াল পত্রিকা বের করা, বিজ্ঞান মেলার আয়োজনসহ অন্যান্য বিজ্ঞান বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পারবে। এর ফলে এলাকার শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করবে। এ ছাড়া বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের পৃথক সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা। শ্যামনগর আতরজান মহিলা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ আশেক ই এলাহী এ বিষয়ে বলেন, বিএফএফের সহায়তায় তার সংগঠন প্রগতি বিজ্ঞান ক্লাব গঠন করে কার্যক্রম করেছিল যার ফলাফল ছিল ভালো। উপজেলায় কর্মরত বেসরকারি সংগঠন লির্ডাসের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মণ্ডল বলেন, বিএফএফ বিজ্ঞান শিক্ষার উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে যা বিজ্ঞান শিক্ষার উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। সাতক্ষীরার অগ্রগতি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আব্দুস সবুর বলেন, অগ্রগতি বিজ্ঞান শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৫৫টি বিজ্ঞান ক্লাব গঠন করেছে যার সদস্য সংখ্যা ২৫৫০জন। শিক্ষক শিক্ষার্থী অভিভাবকসহ অন্যান্যদের মতামতে আজ আমাদের প্রয়োজন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে যে সব শিক্ষার্থী ও হয়রানী হচ্ছে, শিক্ষার ক্ষেত্রে কোথায় কোন কোন বাঁধাসমূহ রয়েছে সেগুলোকে খুঁজে বের করে তার যথাযথ সমাধান করা দরকার। বিশেষভাবে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি একটু আলাদাভাবে মনোযোগি হলে হয়ত বিজ্ঞান শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরিতে বিশেষভাবে বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন।