আসছে ভাষার মাস: সমাগত বই মেলা


প্রকাশিত : জানুয়ারি ২৬, ২০১৭ ||

পঞ্চানন মল্লিক
বছর পরিক্রমায় একে একে এগারটি মাস অতিক্রম করে আবার আমাদের মাঝে আগত হচ্ছে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। জানুয়ারির শেষের আর মাত্র কয়েকটা দিন অতিক্রান্ত হলেই আমাদের মাঝে উপনীত হবে মহান ঐতিহ্যের, গৌরবের আর ভাষার জন্য রক্ত দানের মহান ত্যাগে ভাস্মর এই মাস। আর এ মাসের শুরুর দিন থেকেই প্রতি বছরের ন্যায় উদ্বোধন হবে ঢাকার কেন্দ্রীয় বই মেলার। বইমেলা তাই আমাদের মাঝে প্রায় সমাগত। লেখক ও পাঠকের মনের অনুরণন মিশে থাকে যে মেলায় তার নাম বই মেলা। বই ক্রয় বিক্রয়ের জন্য মেলা তাই নাম বই মেলা। এ মেলায় সমাগম ঘটে লেখক, পাঠক, প্রকাশক সহ সব শ্রেণির মানুষের। সব শ্রেণি, পেশা, বয়সের মানুষের পদচারণায় মাসব্যাপী মুখরিত হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ। স্বাধীন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলোর অন্যতম হচ্ছে এ মেলা। সেই ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখে, চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণের বটতলায় এক টুকরো চট বিছিয়ে তার উপর ৩২টি বই সাজিয়ে গোড়া পত্তন করেছিলেন এ মেলার বলে জানা যায়। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি একাই বই মেলা চালিয়ে যান। পরে তার দেখাদেখি অন্যরাও অনুপ্রাণিত হন। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির তৎকালিন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমিকে বই মেলার সাথে প্রথম সম্পৃক্ত করেন। ১৯৭৯ সালে চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি মেলার সাথে যুক্ত হয়। ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসাবে কাজী মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমিতে প্রথম ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলার” আয়োজন সম্পন্ন করেন। তবে বর্তমানের অমর একুশে গ্রন্থমেলার সূচনা হয় ১৯৮৪ সালে। এরপর ক্রমশঃ সম্মুখে এগিয়ে চলা। সেই ৩২টি বইয়ের প্রথম মেলা আজ পরিণত হয়েছে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী প্রাণের মেলায়। প্রতিবছর বইমেলাকে সামনে রেখে লেখকদের প্রাণ যেন জেগে ওঠে। লেখকরা সারা বছর ধরে লেখা সঞ্চয় করে রাখেন এ মেলায় প্রকাশের জন্য। ফেব্রুয়ারি আসার কয়েক মাস আগ থেকে সম্পাদকের দপ্তরে আনাগোনা ও যোগাযোগ শুরু হয়। স্ক্রিপ্ট বা পান্ডুলিপি সম্পাদকের মনোপুত হলে কথা কাজ শেষে শুরু হয় বইয়ের মুদ্রণ প্রক্রিয়া। এভাবে আলোর মুখ দেখে শতশত বই। জীবনের প্রথম বইটি যেন লেখকের কাছে প্রাণের চেয়েও প্রিয়তর। একজন কৃষক যেমন কষ্ট-ক্লেশে জমি চাষ করে তাতে সোনার ফসল ফললে তৃপ্তিতে আত্মহারা হয়ে যান, একজন লেখকও তেমনি প্রথম বইয়ের দর্শন স্পর্শে আবেগপ্লুত ও আনন্দে আত্মহারা হন। সে অর্থে বই স্ব-স্ব লেখকের সন্তানের মত। অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে অবশ্য এখন বই তুলতে হয় প্রাণের মেলায়। তারপরেও লেখকরা পিছপা হননা। ছুটে যান হৃদ্বিক টানে সাহিত্য সুধার সম্মুখ পানে। বই মেলা যেন তাদের সেই প্রত্যাশার দুয়ার খুলে দেয়। নানান শ্রেণির পাঠকেরাও আসেন বই মেলায়। কেনেন সাধ্যমত পছন্দের বই। পাঠকের সুবিধার জন্য বর্তমানে প্রকাশনী সমুহের স্টল গুলোকে বিভিন্ন ক্যাটাগরীতে ভাগ করে দেওয়া হয়। যেমনঃ- প্রকাশক এলাকা, প্রকাশক-বিক্রেতা এলাকা, শিশু কর্ণার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং লিটল ম্যাগ এলাকা ইত্যাদি। বই মেলায় দেশের খ্যাতনামা প্রকাশনা এবং বই বিক্রেতারা ছাড়াও ভারত, জাপান, রাশিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে নানা প্রকাশনা সংস্থাও তাদের বই ও প্রকাশনা নিয়ে অংশগ্রহন করে থাকেন। মেলাতে বেশ জনপ্রিয়তার সাথে স্থান দখল করে নিয়েছে ভাজপত্র, লিটল ম্যাগাজিন, ডিজিটাল প্রকাশনা (যেমন, সিডি, ডিভিডি) ইত্যাদি। একক এবং যৌথ উভয় প্রকার বই-ই মেলায় তোলেন প্রকাশক/ বিক্রেতারা। সব ধরনের বইয়ে সাজানো হয় স্টল। কাব্যগ্রন্থ, গল্প গ্রন্থ, ছড়ার বই, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, নিবন্ধ সংকলন, শিশুতোষ বিভিন্ন বইসহ হরেক রকম বই থাকে স্টলে। দর্শনার্থীরা বেঁছে বেঁছে পছন্দ মত সব বই কেনেন যার যার ইচ্ছা ও সাধ্যমত। প্রতিদিন মেলায় থাকে আলোচনা সভা, স্বরোচিত কবিতা ও লেখা পাঠের আসর, সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি। এছাড়া মেলায় থাকে লেখককুঞ্জ, যেখানে লেখকরা উপস্থিত থেকে পাঠক ও দর্শকদের সাথে তাদের বই ও লেখার ব্যাপারে মতবিনিময় করেন এবং সকলের সাথে পরিচিত হন ও কুশলাদি বিনিময় করেন। নতুন মোড়ক উন্মোচিত বই ও তার লেখকের নাম মেলার তথ্য কেন্দ্র থেকে ঘোষনা করা হয়। এছাড়া প্রকাশিত নতুন বইয়ের তালিকাও লিপিবদ্ধ করা হয়। লেখক,পাঠকরা বই মেলায় ঘুরে অপার আনন্দে মেতে উঠেন। পরিচয় ঘটে অনেক অজানা, অচেনা লেখকের সাথে। গড়ে উঠে সেতু বন্ধন, হয় ভাব ও মতের বিনিময়। আজকাল ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিভাগ, জেলা/উপজেলা পর্যায়েও বই মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। স্থানীয় লেখক, পাঠকদের প্রাণের দাবী এখানে পূরণ হয়। দেশের খ্যাতিমান, চেনা জানা লেখকদের পাশাপাশি অজপাড়া গাঁয়ের অখ্যাত, অপরিচিত লেখকরাও চেষ্টা করেন এ মেলায় এসে সকলের সাথে পরিচিত হতে। তাঁদের লেখনি তুলে ধরতে। মেলা উপলক্ষে কারো কারো বই প্রথম প্রকাশনার মুখ দেখে। হয় মোড়ক উন্মোচন। এভাবে বেরিয়ে আসেন অনেক প্রতিশ্রুতিশীল প্রতিভাবান লেখক। হয় অনেকেরই লেখক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ। আধুনিক নেট কেবলের যুগে যদিও হারিয়ে যাচেছ সৃজনশীল বইয়ের আবেদন ও পাঠোভ্যাস। তবুও বই মেলা যেন এখনো জাগিয়ে রেখেছে সৃজনশীল সাহিত্য আর লেখক কবিদের মনের সুপ্ত বাসনাকে। তবে এ মেলা থেকে আমাদের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হচ্ছে সেটাও বিবেচ্য বিষয়। বই মেলা মানে লেখক, প্রকাশক, পাঠক এই তিন শ্রেণির মানুষের মেলা। এই তিন শ্রেণির প্রত্যেকের প্রত্যাশা ও স্বপ্ন জড়িয়ে রয়েছে এ মেলার সাথে। তাই তাদের প্রত্যাশা বা আকাঙ্খা কতটা পূরণ হচ্ছে তার উপর নির্ভর করে এ মেলার স্বার্থকতা। একজন লেখক সব সময় চান তাঁর সেরা লেখাটিই মেলায় উপস্থাপন করতে। আর এ ব্যাপারে সহায়ক মাধ্যম হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন একজন প্রকাশক। বইকে সুন্দর,নির্ভুল ও পরিপাটি করে উপস্থাপনের দায়িত্ব একজন প্রকাশকের। কিন্তু বিগত দিনে দেখা গেছে নি¤œ মানের কাগজ এবং ভুল বানানের কিছু কিছু বই লেখক, পাঠক উভয়ের জন্য বিরক্তিকর, ক্ষতিকর ও আপত্তির কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের বই-মেলায় যাতে প্রবেশ না করে সেদিকে কর্তৃপক্ষসহ সকলকে দৃষ্টি রাখতে হবে। কারন বাইরে সুন্দর আর ভিতরে যাচ্ছেতাই এমন বই-মেলায় কারোরই কাম্য নয়। তাছাড়া ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার উদ্দেশ্যে আমরা বই মেলার আয়োজন করি, আর সেই বইয়ে যদি বানান ভুল থাকে তবে তা হবে আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাকর একটি ব্যাপার। তাই এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এ ধরনের বই মেলায় প্রবেশ করতে না পারলে ক্রেতারা প্রতারনার হাত থেকে রক্ষা পাবে, সাথে সাথে মাতৃ ভাষার প্রতিও প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো সম্ভবপর হবে। লেখক-প্রকাশকদের পাশাপাশি পাঠকদের মধ্যেও বই কেনার প্রতি যথেষ্ঠ আগ্রহ থাকতে হবে। বই মানুষের পরম বন্ধু, জ্ঞানার্জনের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। তাই বই কেনা ও তা পাঠের প্রতি আমাদের মনোযোগ দিতে হবে। আমরা প্রতিদিন বন্ধু বান্ধব নিয়ে রেস্টুরেন্টে বসলে কত টাকা খরচ হয়ে যায়। অনেকে পান, বিড়ি, সিগারেট খেয়ে পয়সা ব্যয় করেন। এগুলো শরীরের জন্য ক্ষতিকারক। অথচ ২০/৫০ টাকা দিয়ে একটা বই কিনলে তা হবে আমাদের সারা জীবনের উপকারি বন্ধু। পাঠকরা বেশি বেশি বই কিনলে লেখক-প্রকাশকরা উৎসাহিত হবে। তাদের পরিশ্রম, অর্থ বিনিয়োগ ও প্রচেষ্টা সফল হবে। আমাদের বই মেলার উদ্দেশ্য সার্থক হবে। মেলায় সুষ্ঠু, সুন্দর, সার্বিক নিরাপদ পরিবেশ যাতে বজায় থাকে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজনে প্রবেশপথ প্রসারনসহ পরিসর বৃদ্ধি করা যেতে পারে। এতে মেলায় প্রবেশ ও ঘোরাফেরায় সকলের আরও সুবিধা হবে ও সবাই সাচ্ছন্দ বোধ করবে । জাতির মনন, ঐতিহ্যের ধারক, বাহক এ মেলায় আমরা সবাই  মিলেমিশে অংশগ্রহণ করে যেন অশেষ জ্ঞান ও নির্মল আনন্দ লাভ করতে পারি,মেলা যেন আরও প্রাণোবন্ত হয় ও পরিনত হয় আমাদের মিলন মেলায়, সেদিকে আমাদের সকলকে খেয়াল রাখতে হবে। পরিশেষে, প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বই মেলা ছোট-বড়, পরিচিত-অপরিচিত সব লেখকদের জন্য সমান সুযোগ ও অপার সম্ভাবনা বয়ে আনুক, সব শ্রেণির পাঠকদের প্রাণের প্রত্যাশা, জাতির প্রত্যাশা পূরণ হোক এ মেলা থেকে এমনটিই কামনা। লেখক: কলামিস্ট ও কবি