বই জীবনের আলো


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১, ২০১৭ ||

মো. আবদুর রহমান
অষ্টম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী সেতু। বই পড়া তার প্রিয় শখ। ক্লাসের বই ছাড়াও অবসর সময়ে সে বিভিন্ন ধরণের বই পড়ে। স্কুলের পড়ার ভারে ক্লান্ত ও শ্রান্ত সেতু বুঝি স্বস্তির ছোঁয়া খুঁজে পায় বইয়ের পাতায়। বই পড়ে সেতু একদিকে যেমন প্রচুর মজা ও অনাবিল আনন্দ পায় অপরদিকে সে জ্ঞান অর্জন করে। তাই সেতুর নিত্যসঙ্গী হল বই।
বই হচ্ছে, জ্ঞানের ভান্ডার। বই পড়ে মানুষ হৃদয় মনে এক অপূর্ব শিহরণ লাভ করে। জগতে জ্ঞান আহরণের দু’টো পথ আছে, তার মধ্যে একটি হলো ভ্রমণ করা, অন্যটি বই পড়া। ভ্রমণ করার স্বাস্থ্য ও অর্থ সকলের থাকে না। কাজেই জ্ঞান আহরণের সবচেয়ে সহজ পন্থা হচ্ছে বই পড়া। বই বিশাল পৃথিবীর অজানা খবরা-খরব জানতে মানুষকে সাহায্য করে। বই পাঠ করে মানুষ জগতের প্রকৃত সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের সন্ধান পায়। বই চিত্ত বিনোদনের পাশাপাশি জ্ঞানের আলোকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। তাই বলা হয়- ‘পড়িলে বই আলোকিত হই, না পড়িলে বই অন্ধকারে রই।’
আরবী ভাষায় একটি বিখ্যাত প্রবাদ আছে-‘অখাইরো জালিদিন ফিজ জমানে কিতাবুল।’ অর্থাৎ সময়ের সর্বশেষ্ঠ বন্ধু হলো বই। কেবল তাই নয়, বই মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ মাধ্যম। প্রাচীনকাল থেকে মানুষ তার চিন্তা-ভাবনা, গবেষণা ও অভিজ্ঞতার বিবরণ লিখিত ও মুদ্রিত আকারে অন্যের নিকট উপস্থাপন করে আসছে। এ উপস্থাপিত জ্ঞানের ধারক ও বাহক হচ্ছে বই। অন্যভাবে বলা যায় গ্রন্থ বা বই হচ্ছে মানুষের চিন্তা ভাবনা, গবেষণা ও অভিজ্ঞতার লিখিত ও মুদ্রিত নির্যাস, যা অন্যের নিকট উপস্থাপিত হয়ে সিন্ধান্ত গ্রহনে সহায়তা করে। বই পড়ার মাধ্যমে মানুষ বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারে এবং অজানাকে জানার সর্বোত্তম আনন্দ লাভ করতে পারে। বই মানুষকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিয়েছে চিরকাল। তাই মানব জীবনে বই পাঠে গুরুত্ব অপরিসীম।
বই সুন্দর ও শুভ চিন্তা ভাবনার কথা বলে। মনের স্বপ্ন জাগিয়ে তোলে। মনকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে। আমাদের মনে শুভ ভাবনার প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়। সেই আলোয় আমরা ভালো-মন্দ বিচার করতে পারি। স্বার্থপরতা ও মন্দ চিন্তাকে দূর করে ভালো মানুষ হয়ে উঠি। তাই কবি হুমায়ুন আজাদ তাঁর “বই” নামক কবিতায় লিখেছেন -‘বইয়ের পাতায় প্রদীপ জ্বলে / বইয়ের পাতা স্বপ্ন বলে।’’প্রকৃত অর্থে বই যে কোন দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির  ধারক ও বাহক। বই মানুষের মনের সকল কপাট খুলে দেয়, দৃষ্টিকে করে প্রসারিত ও সুদূরগামী। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎতের মধ্যে সেতু বন্ধন করে বই। ¯্রষ্টা, সৃষ্টি, সভ্যতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইত্যাদি সম্পর্কে পরিচয় পাওয়া যায় বইয়ের মাধ্যমে। তাই সমাজ বিনির্মাণে, মানব সম্পদ  উন্নয়নে, মেধা ও মনন বিকাশে তথা জাতি গঠনে বইয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জীবন ও বই পরস্পর নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ। মানবজীবনের বড় আকুতি হল হল জ্ঞানচর্চা। বই পাঠের মূল উদ্দেশ্য জ্ঞানলাভ ও মানসিক উন্নতি। বই সত্য, সুন্দর ও আনন্দময় অনুভূতিতে পাঠক চিত্তকে ভরিয়ে তোলে। বই হতাশাগ্রস্ত কিংবা বিভ্রান্ত মানুষকে জীবনের মহৎ প্রাঙ্গণে পৌঁছে দিতে পারে। বই আমাদের আশা জাগায়, স্বপ্ন দেখায় এবং জীবনের সঠিক পথের নির্দেশনা দেয়। বই মানুষের মনুষ্যত্ববোধকে জাগ্রত করে। বইয়ের সঙ্গে সর্ম্পক গড়েই মানুষ গড়ে তুলতে পারে উন্নত ও আনন্দপূর্ণ আদর্শ জীবন। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে মানব জীবন ও বইয়ের সর্ম্পক ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। সুশিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রই স্বশিক্ষিত। যথার্থ শিক্ষিত হতে হলে মনের প্রসারতা দরকার, যা বই পাঠের অভ্যাসের মাধ্যমেই কেবল সম্ভব। একজন স্বশিক্ষিত মানুষ সকল নীচুতা, স্পর্শকারতা ও হিংসা- বিদ্বেষের উর্ধে। সে নিজের জীবনের মধু নিজে আস্বাদন করতে পারে। তাই বেশি করে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কারন, বই মানুষের সার্বক্ষণিক এবং সর্বশেষ্ঠ সঙ্গী। প্রকৃতপক্ষে বইয়ের মতো এমন আনন্দদায়ক সঙ্গী পৃথিবীতে আর নেই।
বইয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে প্রখ্যাত দার্শনিক ও সাহিত্যিক লিও টলষ্টয় বলেছেন, “ঞযৎবব ঃযরহমং ধৎব বংংবহঃরধষ ভড়ৎ ষরভব, ধহফ ঃযবংব ধৎব-ইড়ড়শং, নড়ড়শং ধহফ নড়ড়শং” অর্থাৎ ‘জীবনে তিনটি বস্তু প্রয়োজন, তা হচ্ছে বই, বই আর বই।’ আর বইয়ের এই প্রয়োজন জ্ঞানবৃদ্ধ হবার জন্য যতখানি নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দ লাভের জন্য। প্রকৃতপক্ষে বই পাঠ আনন্দের মধ্যদিয়ে মানুষকে বহুমুখী কল্যাণের ছোঁয়া দিয়ে থাকে। তাই সুপ্রাচীনকাল থেকে আনন্দ-অনুষঙ্গরূপে মানুষের পাশে পাশে রয়েছে বই। জীবনের সকল বস্তুগত উপকরণ হারিয়ে যায়, ফুরিয়ে যায় কিংবা হয়ে যায় ধুলো-মলিন। কিন্তু বই রয়ে গেছে নতুন, চির যৌবনরূপে। মানব জীবনে বইয়ের স্থানকে কবি-দার্শনিক ওমর খৈয়াম নির্ধারণ করেছেন এভাবে- “রুটি মদ ফুরিয় যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত যৌবনা-যদি তেমন বই হয়।” এখানে বইয়ের শ্রেষ্ঠত্ব অনস্বীকার্য।
বই পড়া সম্পর্কে প্রমথ চৌধুরী  বলেছেন, “ জ্ঞানের ভান্ডার যে ধনের ভান্ডার নয় এ সত্য তো প্রত্যক্ষ। কিন্তু সমান প্রত্যক্ষ না হলেও সমান সত্য যে, এ যুগে যে জাতির জ্ঞানের ভান্ডার শুন্য, সে জাতির ধনের ভাঁড়েও ভবানী। তারপর যে জাতি মনে বড় নয়, সে জাতি জ্ঞানেও বড় নয়; কেননা, ধনের সৃষ্টি যেমন জ্ঞান সাপেক্ষ তেমনি জ্ঞানের সৃষ্টিও মন সাপেক্ষ।” মানুষের এই মন সচল ও সমৃদ্ধ হয় বই পড়ার মাধ্যমে। তাই জ্ঞানার্জন ও ধনার্জনের জন্য বই পড়া প্রয়োজন।
বেঁচে থাকার স্বার্থেই মানব জীবনে আনন্দ প্রয়োজন। বই একমাত্র সর্বশেষ্ঠ আনন্দ মাধ্যম। বই মানুষের অবসাদ ক্লিষ্ট মুহুর্তকে ভুলিয়ে দিতে পারে আনন্দের অমিয় ধারায় প্লাবিত করে দিয়ে। বইকে তাই বলা হয় অবসর যাপনের উৎকৃষ্ট সঙ্গী। বই পাঠের আনন্দে মানুষের মনের দিগন্ত উন্মোচিত হয়, হৃদয়-মন ও আত্মা প্রসারিত হয়। রাশিয়ার বিখ্যাত সাহিত্যিক ম্যাক্সিস গোর্কি বই পাঠের আনন্দ এবং প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে বলেন “আমার মধ্যে উত্তম বলে যদি কিছু থাকে, তার জন্যে আমি বইয়ের কাছেই ঋনী।” প্রকৃতপক্ষে বইয়ের মতো এমন আনন্দদায়ক সঙ্গী পৃথিবীতে আর নেই।
বই থেকে মানুষ যেমন জ্ঞান লাভ করতে পারে, তেমনি বই পড়ে মানুষ অনাবিল আনন্দও পেয়ে থাকে। বই পাঠের আগ্রহ বা অভ্যাস না থাকলে বইকে নিত্যসঙ্গী করা যায় না। বই পড়ার অভ্যাস গড়ার জন্য ব্যক্তিকে সৎ ও নিষ্ঠাবান, একাগ্রচিত্ত এবং অধ্যবসায়ী হতে হবে। মননশক্তি ও হৃদয়বৃত্তিকে সম্পূর্ণরূপে জাগ্রত করে বই পাঠের মধ্যমেই বইকে নিত্যদিনের সঙ্গীকরা য়ায়। তাই মানুষ যত বেশি বই পড়বে, ততই আনন্দ লাভ করবে এবং জ্ঞানের স্বর্গরাজ্যে প্রবেশের সুযোগ পাবে। এ প্রসংগে সৈয়দ মুজতবা আলী যথার্থই বলেছেন, ‘বই কিনে কেউ দিউলিয়া হয় না।’ কারণ বই মানুষের জ্ঞান ঐশ্বর্যকে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
মানব জীবনের অসময়ের সাথী বই। ইংরেজিতে একটি কথা  আছে “ইড়ড়শং ধৎব সবহ’ং নবংঃ পড়সঢ়ধহরড়হং রহ ষরভব” অর্থাৎ ‘মানব জীবনের উৎকৃস্ট সঙ্গী বই’। আমরা বাস্তব জীবনে অনেক সময় বিপদাপন্ন হই। বিপদ আসে বাইরে থেকে, বিপদ আসে মনের  অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ থেকেও । আর সেই বিপদ মুহূর্তে অন্য মানুষের কাছে পরামর্শ নিতে গেলে অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে থাকি। কিন্তু প্রকৃত বই বিপদের সময় যথার্থ বন্ধুর মতো আমাদের সঠিক পরামর্শ দান করে। কোনো কোনো বই পাঠককে হাসাতে পারে, আনন্দ দিতে পারে এবং কোনো কোনো বই জ্ঞান ও নতুন তথ্য দিতে পারে। তাই প্রত্যেককেই বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। বইয়ের সান্নিধ্যে আসা মানেই মহা-মানীষীদের সান্নিধ্য লাভ। বই পাঠের মাধ্যমেই মানুষ মহা-মনীষীদের জীবনের সংস্পর্শে এসে সমস্ত কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে মুক্ত মনের অধিকারী হয়, মানুষকে আপন করে ভাবতে শেখে। দু:খ ও দ্বন্দ্ব, সংশয় ও চাঞ্চল্য, হতাশা ও নৈরাজ্য মানুষের জীবন বিষিয়ে তোলে। তখন প্রয়োজন পড়ে চালিত ও উদ্দীপিত করার, আশা ও সান্তনার বানী শোনাবার মতো কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুর। বই সেই অকৃত্রিম বন্ধু। দার্শনিক ও নাট্যকার বারট্টান্ড  রাসেল আমাদের জীবনের রূঢ় বাস্তবতা ও জটিলতা থেকে মুক্তি পেতে আমাদের বইয়ের মাঝে ডুব দিতে পরামর্শ দিয়েছেন। বইয়ের নির্দেশনায় মানুষ খুঁজে পায় সংগতি ও সামঞ্জস্য এবং অগ্রগমনের পন্থা। মানুষ যখন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে, বার্ধক্যে জরা ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে তখন সে বড় বেশি নি:সঙ্গ ও একাকী হয়ে পড়ে। মানুষের সেই নি:সঙ্গ মুহূর্তে কেবল একটি সুন্দর বই-ই প্রকৃত আনন্দ দিতে পারে, একাকীত্ব দূর করতে পারে। আনন্দের প্রলেপে সে মানুষকে শক্তি, সাহস কিংবা প্রেরণা যোগায়, দেখায় সঠিক পথের দিশা।
বিচিত্র বিষয়ের বিচিত্র ধরনের বই থেকে মানুষ আনন্দ লাভ করে। তাই সভ্য সমাজের মানুষের জন্য চাই অজ¯্র গ্রন্থরাজির সঙ্গ। সাহিত্য, ইতিহাস, ভ্রমণ কাহিনী, দর্শন, ভূগোল, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, প্রাচীনঐতিহ্য, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ব বাঙালীদের জীবনী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, আইন প্রভৃতি বিষয়ের বই থেকে মানুষ লাভ করে আনন্দ, শিক্ষা ও জ্ঞান। এক এক ধরণের বই মানুষকে এক এক ধরণের আনন্দ ও জ্ঞান দিয়ে থাকে। অতীতের ঐতিহ্য, নানা চিন্তার অনুশীলন ও বিচিত্র ভাবধারা সংরক্ষিত রয়েছে গ্রন্থরাজির মাঝে। বইয়ে স্থান পেয়েছে বিভিন্ন জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য, বিচিত্র জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প সাহিত্যের ¯্রােত ধারা, সে ধারার সঙ্গে মিলনেই ঘটে মানুষের আত্মপ্রকাশ। মোটকথা, বিচিত্র ধরণের বই পাঠ করেই মানুষ আনন্দের অনুভূতি লাভ করে থাকে।
উৎকৃষ্ট বই মানুষকে অকৃত্রিম আনন্দ ও প্রকৃত সুখ দান করে। মানুষের উন্নতর বৃত্তিগুলো চায় সত্য, জ্ঞান ও আনন্দের আলো। কিন্তু আনন্দালোকে পৌঁছানো তথা পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের জন্য বই নির্বাচনে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। আর এই বই পড়ার আনন্দ পরিপূর্ণভাবে লাভ করতে হলে অগণিত বই থেকে পাঠকে ভালো মানের বই নির্বাচন করে নিতে হয়। এব্যাপারে বইয়ের পাঠককে যথেষ্ট সতর্ক ও সচেতন হতে হয়। আগ্রহপূর্ণ দৃষ্টি, অনুচিন্তন, কৌতূহল, পরিমিত পাঠ সবকিছু মিলে গ্রন্থপাঠ উপভোগ্য হয়ে ওঠে। ছাপাখানার কল্যাণে প্রতিনিয়ত অজ¯্র বই ছাপা ও প্রকাশিত হচ্ছে। এর মধ্যে ভালো-মন্দের সমাবেশ আছে। পাঠের আনন্দ পেতে হলে ভালমানের বই বাছাই করতে হবে, না হলে পন্ডশ্রম হবে। বই নির্বাচনের অস্থির অবস্থা আয়ত্তে আনার জন্য অভিজ্ঞ পাঠক, গ্রন্থগারিক ও শিক্ষকদের সুপরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। বিজ্ঞাপনের চাতুরিপনা কিংবা গ্রন্থনামে প্রলুদ্ধ হওয়া উচিত নয়। ভালো বই মানুষকে আনন্দ দান করে, সেজন্য ভাল বই নির্বাচন করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
ভালো মানের বই পড়ার পর জীবনের মোড় পাল্টে দেয়- একথা নতুন নয়। সেই পুরনো কথাটি নতুন করে বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমাণ করেছেন মার্কিন গবেষকরা। তাঁদের ভাষায় মস্তিষ্কের বিশেষ কিছু অংশে পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন আনে ভালো একটি বই। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার আটলান্টায় অবস্থিত এমোরি ইউনিভার্সিটির গবেষকরা জানান, একটি উপন্যাস পাঠ মস্তিষ্কের ‘বিশ্রাম অবস্থার’ পরিবর্তন ঘটাতে পারে। আর এই পরির্বতনের স্থায়িত্ব হতে পারে কয়েক দিন। এ গবেষণার মুখ্য লেখক গ্রেগরি বের্নস বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রেই গল্প আমাদের জীবনেকে গুছিয়ে দেয়। ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব নির্ধারণে সহায়তা করে গল্প। এই গল্প কী করে মস্তিষ্কের মধ্যে ঢুকে তার পরিবর্তন ঘটায়, সেটাই বুঝতে চাইছিলাম আমরা।’ ব্রেইন কানেকটিভিটি নামক সাময়িকীতে সমীক্ষাটি প্রকাশ করা হয়। এ গবেষণায় ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রিসোনেন্স ইমেজিং (এফএমআরআই) পদ্ধতির ব্যবহার করা হয়। বই পড়ার পর এফ এম আর আই করে দেখা হয়, মস্তিষ্কে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির ১২ শিক্ষার্থীর ওপর এই পরীক্ষা করে দেখা হয়। তাঁদের রবার্ট ্র হ্যারিসের বিখ্যাত উপন্যাস ‘পম্পেই’ পড়তে দেওয়া হয়। প্রাচীন ইতালির এ নগরীর ভিসুভিয়াস পর্বতের অগ্নুৎপাতের কাহিনী নিয়ে উপন্যাসটি লেখা হয়। উপন্যাস পড়ার সময় শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কের এফ এম আর আই করা হয়। এতে দেখা যায়, মস্তিষ্কের বাম টেমপোরাল কর্টেক্স এলাকায় বেশ পরিবর্তন এসেছে। নির্দিষ্ট ব্যক্তি ভাষা কতটুকু গ্রহণ করবে, তা নির্ধারণ করে এ অঞ্চল। মস্তিষ্কের সেন্ট্রাল সালকাস এলাকায়ও পরিবর্তন দেখা গেছে। শরীরের সংবেনশীলতা নিয়ন্ত্রণ করে এ অঞ্চল।
নৈতিকতা ও মূল্যবোধের যে অবক্ষয় ঘটেছে-সেখানে থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায় তরুণ সমাজের হাতে ভালো বই পৌঁয়ে দেয়া। অপ্রাপ্ত বয়স্ক বা তরুণ সমাজকে অবশ্যই পাঠ উপযোগী বই বেছে নেয়া উচিত। সৃষ্টিশীল, জীবনধর্মী, নীতিকথামূলক ও সুপাঠা বই সংগ্রহ করে পড়তে হবে। এধরণের বই ব্যক্তিমানসের যেমন খোরাক যোগায় তেমনি জ্ঞান দান করে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায়। কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল বই পাঠে যুব সমাজ সাময়িক আনন্দ পেলেও তা সার্বিক বিচারে দেশ ও জাতির জন্য ধ্বংস ডেকে আনে। তাছাড়া এগুলো সামাজিক মূল্যবোধকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিনষ্ট করে দেয়। আমাদের দেশের স্কুল-কলেজগামী যুবক-যুবতীরা তাদের বয়সের কারণে কুরুচিপূর্ণ বই-পুস্তক, বিচিত্র উপন্যাস, গল্প ইত্যাদি পাঠ করে বিপদগামী হয়। সুতরাং বয়সভেদে উপযুক্ত বই পাঠকের হাতে গেলে পাঠকবৃন্দ একদিকে আনন্দ লাভ করবে ও অন্যদিকে জ্ঞান অর্জন হবে। কাজেই সুষ্ঠুভাবে বই নির্বাচন করে সব ধরণের পাঠকরা যাতে অনাবিল আনন্দ পেতে পারে সে জন্য বই নির্বাচনে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা একান্ত আবশ্যক।
অজ¯্র-অনাবিল আনন্দ পুস্তকাগারে স্থবির হয়ে আছে। এ স্থবিরতা ভেঙে সেখান থেকে পাঠককে আনন্দরস আস্বাদন করতে হবে। বই থেকে আনন্দ লাভের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। ভূ-গর্ভের অন্ধ জঠরে লুকিয়ে আছে কত সোনা, কিন্তু প্রকৃতি সহজে তা মানুষকে দান করে না- এর জন্য চাই শ্রম, অদম্য উৎসাহ ও মনের একাগ্রতা। তেমনি বইয়ের পৃথিবী থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং আনন্দ লাভ করতে হলেও তাকে অধ্যবসায়ী হতে হবে এবং বেশি করে বই পড়তে হবে। কিন্তু  দু:খের বিষয় ইদানিং আমাদের বই পড়ার অভ্যাস অনেকটাই কমে গেছে। টিভি, ইন্টারনেট এবং মোবাইল ফোন আমাদের বই পড়ার অভ্যাস থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন করে চলেছে। তাই বই পড়ার জন্য এখন আর কেউ সময় দিতে চাইছে না। বই না পড়ার ফলে অসংস্কৃত ও অমার্জিত মানুষজনের সংখ্যা ক্রমশঃ বাড়ছে। আপরদিকে সুভদ্র, রুচিশীল, সংবেদনশীল ও হৃদয়বান মানুষের সংখ্যা দিনে দিনে কমে আসছে। ফলশ্রুতিতে মানুষের জীবনে আজ এক গভীর আত্মসংকট দেখা দিয়েছে।
আসুন, আবার আমরা বইয়ের কাছে ফিরে যাই। মানুষকে বইমুখী করা তথা বইয়ের পাঠক তৈরির জন্য ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরী, প্রকাশনা উৎসব, বই পড়া প্রতিযোগিতা, জন্মদিন, বিবাহ-শাদি সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কৃতি ছাত্র-ছাত্রীদেও বই উপহার প্রদানের প্রবণতা সৃষ্টি প্রভৃতি আকর্ষনীয় ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বই পড়ার নিয়মিত অভ্যাস থাকলে স্মৃতিশক্তি প্রখর হয় এবং মন প্রফুল্ল থাকে। এই অভ্যাস আমাদের মানসিক অবসাদ ও ক্লান্তি দুর করে এবং মন সংযোগ বাড়িয়ে তোলে। বইয়ের কাছেই আমাদের ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের সব অশান্তি, অরাজকতা ও বিশৃঙ্গলা দুরীকরনের চাবিকাঠি। কাজেই আমাদের বই পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনতেই হবে। কেননা, বই-ই আমাদের প্রয়োজনীয় ও নি:স্বার্থ বন্ধু। তাই জীবনকে অধিকতর সুন্দর ও সাফল্যমন্ডিত করার জন্য আমাদের সকলেরই স্কুল ছাত্রী সেতুর মতো বই পড়ার অভ্যাস বাড়ানো উচিত। সর্বোপরি, বই হোক আমাদের নিত্যসঙ্গী, বই হোক জাতির উন্নতির সহায়ক। লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা।