বই মানুষের পরম মিত্র


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২, ২০১৭ ||

মো. আবদুর রহমান
সভ্যতা বিকাশের ক্ষেত্রে জ্ঞানই হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম মাধ্যম। আর মানব সভ্যতার অর্জিত জ্ঞান কালান্তরে পৌঁছে যায় বইয়ের মাধ্যমে। বই মানুষকে আলোকিত করে এবং  গোটা বিশ্বকে জানা যায় বইয়ের মাধ্যমে। শৈশবে বই হয় প্রথম বন্ধু। মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চিন্তা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মননশীলতার বিকাশে সেতুবন্ধন রচনা করেছে বই। মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের পর বই হয়ে উঠেছে মানুষের নিত্যসঙ্গী। একটি গ্রহণযোগ্য বিষয়কে বর্ণনা করে একটি বই চিরকাল বেঁচে থাকতে পারে। জীবনকে সুন্দরভাবে গঠন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে বইয়ের ভূমিকা অপরিসীম। গ্রন্ধলব্ধ জ্ঞান মানুষের চিন্তা-চেতনাকে শক্তিশালী করে। কাজেই বই পড়া একটি অপরিহার্য বিষয়।
বই পড়া নিয়ে বিশ্বের জ্ঞানী-গুণীজন গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, বই লেখাটা নিষ্পাপ বৃত্তি এবং এতে করে দুষ্কর্ম থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ধনবল, আয়ুবল, অন্যমনস্ক ব্যক্তির বাহুবল, সংসারের যত কিছু মরনশীল পদার্থ আছে, বাংলা বই হচ্ছে সকলের সেরা। পল্লীকবি জসিমউদ্দিন বলেছেন, বই জ্ঞানের প্রতীক, বই আনন্দের প্রতীক। বই আপনাকে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সকল কালে নিয়ে যেতে পারে। ভিক্টর হুগো বলেছেন, বই বিশ্বাসের অঙ্গ, বই মানব সমাজকে টিকিয়ে রাখবার জ্ঞানদান করে। অতএব বই হচ্ছে সভ্যতার রক্ষাকবচ। বই পড়া সম্পর্কে প্রমথ চৌধুরী  বলেছেন, “ জ্ঞানের ভান্ডার যে ধনের ভান্ডার নয় এ সত্য তো প্রত্যক্ষ। কিন্তু সমান প্রত্যক্ষ না হলেও সমান সত্য যে, এ যুগে যে জাতির জ্ঞানের ভান্ডার শুন্য, সে জাতির ধনের ভাঁড়েও ভবানী। তারপর যে জাতি মনে বড় নয়, সে জাতি জ্ঞানেও বড় নয়; কেননা, ধনের সৃষ্টি যেমন জ্ঞান সাপেক্ষ তেমনি জ্ঞানের সৃষ্টিও মন সাপেক্ষ।” মানুষের এই মন সচল ও সমৃদ্ধ হয় বই পড়ার মাধ্যমে। তাই জ্ঞানার্জন ও ধনার্জনের জন্য বই পড়া প্রয়োজন।
জীবন ও বই পরস্পর নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ। মানব জীবনের বড় আকুতি হল জ্ঞানচর্চা। বই পাঠের মূল উদ্দেশ্য জ্ঞানলাভ ও মানসিক উন্নতি। বই সত্য, সুন্দর ও আনন্দময় অনুভূতিতে পাঠক চিত্তকে ভরিয়ে তোলে। বই মানুষের পরম মিত্র। পরম সুহৃদ। প্রতিদিনকার সহযাত্রি।  বই কখনোই কারও সাথে বৈরিতা করে না। কেবল মিত্রতা দিয়ে যেতে থাকে। মানুষের ভেতরের হিংসা, দ্বেষ, গ্লানি, ক্ষুদ্রতা, সীমাবদ্ধতা ও সংকীর্ণতা সরিয়ে দিয়ে হৃদয়ের সবখানে জ্বালিয়ে দেয় অনির্বাণ দীপশিখা। সেখানে আসে হিংসার পরিবর্তে প্রীতি, সখ্য ও ভালোবাসা। বই হতাশাগ্রস্ত কিংবা বিভ্রান্ত মানুষকে জীবনের মহৎ প্রাঙ্গণে পেঁৗঁছে দিতে পারে। বই আমাদের আশা জাগায়, স্বপ্ন দেখায় এবং জীবনের সঠিক পথের নির্দেশনা দেয়। বই মানুষের মনুষ্যত্ববোধকে জাগ্রত করে। বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েই মানুষ গড়ে তুলতে পারে উন্নত ও আনন্দপূর্ণ আদর্শ জীবন।
অজ¯্র-অনাবিল আনন্দ পুস্তকাগারে স্থবির হয়ে আছে। এ স্থবিরতা ভেঙে সেখান থেকে পাঠককে আনন্দরস আস্বাদন করতে হবে। বই থেকে আনন্দ লাভের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। ভূ-গর্ভের অন্ধ জঠরে লুকিয়ে আছে কত সোনা, কিন্তু প্রকৃতি সহজে তা মানুষকে দান করে না- এর জন্য চাই শ্রম, অদম্য উৎসাহ ও মনের একাগ্রতা। তেমনি বইয়ের পৃথিবী থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং আনন্দ লাভ করতে হলেও তাকে অধ্যবসায়ী হতে হবে এবং বেশি করে বই পড়তে হবে। কিন্তু দু:খের বিষয় ইদানিং আমাদের বই পড়ার অভ্যাস অনেকটাই কমে গেছে। টিভি, ইন্টারনেট, ফেসবুক এবং মোবাইল ফোন আমাদের বই পড়ার অভ্যাস থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন করে চলেছে। তাই বই পড়ার জন্য এখন আর কেউ সময় দিতে চাইছে না। বই না পড়ার ফলে অসংস্কৃত ও অমার্জিত মানুষজনের সংখ্যা ক্রমশঃ বাড়ছে। আপরদিকে সুভদ্র, রুচিশীল, সংবেদনশীল ও হৃদয়বান মানুষের সংখ্যা দিনে দিনে কমে আসছে। ফলশ্রুতিতে মানুষের জীবনে আজ এক গভীর আত্মসংকট দেখা দিয়েছে।
আসুন, আবার আমরা বইয়ের কাছে ফিরে যাই। মানুষকে বইমুখী করা তথা বইয়ের পাঠক তৈরির জন্য ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরী, প্রকাশনা উৎসব, বই পড়া প্রতিযোগিতা, জন্মদিন, বিবাহ-শাদি সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কৃতি ছাত্র-ছাত্রীদেও বই উপহার প্রদানের প্রবণতা সৃষ্টি প্রভৃতি আকর্ষনীয় ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা  প্রয়োজন। বই পড়ার নিয়মিত অভ্যাস থাকলে স্মৃতিশক্তি প্রখর হয় এবং মন প্রফুল্ল থাকে। এই অভ্যাস আমাদের মানসিক অবসাদ ও ক্লান্তি দুর করে এবং মন সংযোগ বাড়িয়ে তোলে। বইয়ের কাছেই আমাদের ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের সব অশান্তি, অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা দূরীকরনের চাবিকাঠি। কাজেই আমাদের বই পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনতেই হবে। কেননা, বই-ই আমাদের প্রয়োজনীয় ও নি:স্বার্থ বন্ধু। তাই জীবনকে অধিকতর সুন্দর, ও সাফল্যমন্ডিত করার জন্য আমাদের সকলেরই বই পড়ার অভ্যাস বাড়ানো উচিত। সর্বোপরি, বই হোক আমাদের নিত্যসঙ্গী, বই হোক জাতির উন্নতির সহায়ক। লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা