শসার পুষ্টি ও উপকারিতা


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১৭ ||

মো. আবদুর রহমান
শসা একটি জনপ্রিয় পুষ্টিকর সবজি। এর ইংরেজি নাম ঈঁপঁসনবৎ এবং বৈজ্ঞানিক নাম ঈঁপঁসরং ংধঃরাঁং. শসায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন এ, বি, সি এবং ক্যালসিয়াম ও লৌহ রয়েছে।
পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, খাদ্য উপযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম শসায় রয়েছে ৯৫.২৩ গ্রাম পানি, আমিষ ১.৬ গ্রাম, শ্বেতসার ৩.৫ গ্রাম, চর্বি ০.১ মিলিগ্রাম, ০.১৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-১ (থায়ামিন), ০.০২ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২ (রাইবোফ্লেভিন), ৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’, ১৪ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১.৫ মিলিগ্রাম লৌহ ও ৪০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন। তাছাড়া এতে ২২ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি থাকে। আমাদের দেহের পুষ্টিসাধনে এসব পুষ্টি উপাদানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
শসায় কিছু পরিমাণে ভিটামিন বি-১ (থায়ামিন) রয়েছে। ভিটামিন বি-১ ¯œায়ুতন্ত্রকে সবল ও স্বাভাবিক রাখে এবং দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি সাধনে সাহায্য করে। ভিটামিন বি-১ এর মারাত্মক অভাব হলে বেরি বেরি নামক রোগ হয়। এ রোগে ¯œায়ুবিক দুর্বলতা দেখা দেয়। ফলে ধীরে ধীরে মানসিক অবসাদ ও হজমশক্তি লোপ পায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। এছাড়া লাউ থেকে ক্যারোটিন পাওয়া যায় না। অথচ শসায় ক্যারোটিন (ঈধৎড়ঃবহব) থাকে। এ ক্যারোটিন হতে আমাদের দেহে ভিটামিন ‘এ’ সৃষ্টি হয়। চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখা ভিটামিন ‘এ’ র প্রধান কাজ। দেহে ভিটামিন ‘এ’ র অভাব হলে চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে যায়, রাতে বেলায় অল্প আলোতে দেখতে অসুবিধা হয়। এ অবস্থাকে বলা হয় রাতকানা রোগ। শরীরে ভিটামিন ‘এ’ র অভাবে আমাদের দেশে এখনও প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ হাজার শিশু অন্ধ হয়ে যায় এবং ১০ লাখ শিশু রাতকানা (হরমযঃ নষরহফহবংং) রোগে আক্রান্ত হয়। শিশু ও ছোট ছেলে-মেয়েদের অন্ধত্ব ও রাতকানা রোগ প্রতিরোধ শসা অত্যন্ত উপকারী সবজি।
শসা থেকে ভিটামিন ‘সি’ পাওয়া যায়। ভিটামিন ‘সি’ আমাদের দাঁত, মাড়ি ও পেশি মজবুত করে। তাছাড়া ভিটামিন ‘সি’ সর্দি-কাশি ও ঠান্ডার হাত থেকে রক্ষা করে এবং দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তাই দেহের ভিটামিন ‘সি’ এর চাহিদা পূরণে শসা ও অন্যান্য ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ শাক-সবজি আমাদের বেশি করে খাওয়া উচিত।
শসায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম রয়েছে। মানব দেহের হাড় ও দাঁতের গঠন এবং মজবুত করা ক্যালসিয়ামের প্রধান কাজ। তাছাড়া সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় প্রসূতি মায়ের খাবারে যথেষ্ট পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকা প্রয়োজন। আবার শসায় কিছু পরিমাণে লৌহ থাকে। দেহে লৌহের অভাব হলে শরীরে অপুষ্টিজনিত রক্তশুন্যতা (ধহধবসরধ) রোগ দেখা দেয়। ছোট ছেলে-মেয়েরা এবং  গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েরা অতি সহজেই এ রোগের শিকার হয়। কাজেই শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়ের সু-স্বাস্থ্যের জন্য দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে শসা এবং অন্যান্য শাক-সবজি থাকা আবশ্যক।
শসার মধ্যে যে পানি থাকে, তা আমাদের দেহের বর্জ্য ও বিষাক্ত পদার্থ অপসারণে অনেকটা অদৃশ্য ঝাটার মতো কাজ করে। শুধু তাই নয়, শসায় বিদ্যমান পানি আমাদের শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে মনকে প্রশান্ত করে তোলে। শসায় উচ্চমাত্রায় পানি ও নি¤œ মাত্রার ক্যালরিযুক্ত উপাদান রয়েছে। ফলে যাঁরা ওজন কমাতে চান, তাঁদের জন্য শসা আদর্শ টনিক হিসেবে কাজ করবে। যাঁরা ওজন কমাতে চান, তাঁরা স্যুপ ও সালাদে বেশি বেশি শসা ব্যবহার করতে পারেন। শসায় এরেপসিন নামক এনজাইম থাকার কারণে এটি হজমের কাজে সহায়তা করে। তাই নিয়মিত পর্যাপ্ত শসা খেলে কোষ্ঠ-কাঠিন্য দূর হয় এবং শরীর সুস্থ থাকে।
শসার আঁশ কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। শসায় রয়েছে স্টেরল নামের এক ধরনের উপাদান, যা কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। শসার পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। এর ম্যাগনেশিয়াম ¯œায়ুতন্ত্র ও পেশিতে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে। এছাড়া রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণেও এর জুড়ি নেই। শসার মধ্যে যে খনিজ সিলিকা থাকে আমাদের চুল ও নখকে সতেজ ও শক্তিশালী করে তোলে। এছাড়া শসার সিলিকন ও সালফার চুলের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে।
শসা বা শসার রস ডায়াবেটিস রোগীর জন্য বেশ উপকারী। শসা ইউরিক এসিডের মাত্রা ঠিক রাখে। তাই নিয়মিত শসা খেলে কিডনি সুস্থ ও সতেজ থাকে। শসার ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস, লিগন্যান্স হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানোসহ জরায়ু ও প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।  পাইরিয়ার কারণে দাঁত ও মাড়ির রোগে শসা উপকারী। শসার পানি মূত্রের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। এটি শরীরে জমানো ক্ষতিকর ও বিষাক্ত উপাদানগুলো অপসারণ করে রক্তকে পরিস্কার রাখে। শসা বুক জ্বলা, পাকস্থলীর এসিডিটি এমনকি গ্যাস্ট্রিক থেকে মুক্তি দিতে পারে।
শসায় উচ্চমাত্রায় পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও সিলিকন আছে, যা ত্বকের পরিচর্যায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। ত্বকের টিস্যুকে শক্তিশালী ও টানটান করে সিলিকা। তাছাড়া এটি দেহকে সজীবতা দেয়। সৌন্দর্যচর্চার অংশ হিসেবে অনেকে শসা গোল করে কেটে চোখের পাতায় বসিয়ে রাখেন। এতে চোখের পাতায় জমে থাকা ময়লা যেমন অপসারিত হয়, তেমনি চোখের জ্যোতি বাড়াতেও কাজ করে ।
প্রধানত: কাঁচা শসা ফলের মতো চিবিয়ে খাওয়া হয়। তাছাড়া সালাদ হিসেবেও কচি শসা খাওয়া হয়। কচি শসার সালাদ অতি মুখরোচক ও পুষ্টিকর। লবণ মরিচ দিয়ে শসা খাওয়া সবার প্রিয়। রান্না করেও এটি খাওয়া যায়। লাউ বা চালকুমড়ার মতো শসা টুকরো করে কেটে তরকারী রান্না করে খাওয়া হয়। পাকা শসা মোরব্বা তৈরিতে কাজে লাগে। শসা দিয়ে আচার তৈরি করা যায়। সালাদ হিসেবে শসা কাঁচা খাওয়া হয় বলে, এতে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানসমূহ অবিকৃত অবস্থায় আমাদের দেহ কর্তৃক গৃহীত হয়।
শসা বর্তমান পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই বিপুল সমাদৃত একটি পুষ্টিকর খাদ্য। সুতরাং দেহের পুষ্টিসাধন এবং দেহকে সুস্থ-সবল ও নিরোগ রাখার জন্য শিশু ও পূর্ণবয়স্ক লোকের প্রতিদিন বেশি করে শসা ও অন্যান্য পুষ্টিকর শাক-সবজি খাওয়া একান্ত প্রয়োজন। লেখক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা।