মান-বাংলায় অপ(মান) যোগ। প্রমিত বাংলা ? বকান্ড প্রত্যাশা


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৭ ||

কামরুজ্জামান
(১) অধ:পতনে নিমজ্জিত ‘টাউন শ্রীপুর শরচ্চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়’, টাউন শ্রীপুর, দেবহাটা, সাতক্ষীরা প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে অজস্র ভুলে ভরা ও নষ্ট বাংলায় লিখিত আমন্ত্রণপত্রে (হালখাতার চিঠি বললে অত্যুক্তি হয় না) মাতৃভাষার দৈন্যদশা অবলোকন করে, যাদের ভাষাজ্ঞান নেই বললেই চলে, তাদেরও মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সমগ্র দেশের চিত্রও ভিন্ন কিছু নয়। অজ আমগাছে উঠে আম খায় আর গাছগরু গাছে চড়ে ঠ্যাং দোলায়। তথাপি আমাদের লোক দেখানো একুশে পালন করার ক্ষেত্রে কোন কমতি নেই। বরং আদিখ্যেতার আতিশায্যে ‘অতিভক্তি চোরের লক্ষণ’ প্রকাশ পায়।
আমন্ত্রণপত্রটির ৪র্থ পৃষ্ঠায় ‘বিদ্যুৎসাহী’ এবং ২য় পৃষ্ঠায় ‘রেজিষ্ট্রেশন’ ও ‘র‌্যালী’ বানান লেখা হয়েছে। ৩য় পৃষ্ঠায় ‘উদযাপন’ বানানে দ-এর নিচে হস্ চিহ্ন নেই এবং মাঝখানে স্পেস দিয়ে উপসচিব, শতবর্ষ, প্রাণপ্রিয়, একশতÑ এমন শব্দসমূহ লেখা হয়েছে। ২য় পৃষ্ঠায় ‘সূচী’ (ঊ-কার ও ঈ-কার সহকারে), অথচ ৩য় পৃষ্ঠায় ‘সুচি’ ( উ-কার ও ই-কার সহকারে)। মুচীকর্মই বটে ! ২য় পৃষ্ঠায় ‘অনুষ্ঠান সূচী’ আগেই বর্ণনা করে, পরে ৩য় পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে, ‘নি¤œবর্ণিত অনুষ্ঠান সুচিতে আপনাকে সপরিবারে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’ ‘নি¤œবর্ণিত’ কেন ? আমন্ত্রণÑ অনুষ্ঠানে নাকি ‘অনুষ্ঠান সুচিতে’ ? এখানে ‘সপরিবারে’ বলতে কার পরিবারÑ আমন্ত্রিতের নাকি আমন্ত্রণকারীর? বাক্যে ব্যাকরণের ‘ক্রিয়া যার স তার’ নিয়মানুযায়ী আমন্ত্রণকারী ও তার পরিবার মিলে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে শুধু ‘আপনাকে’, আপনার পরিবারকে কিন্তু নয়। কী চমৎকার দেখা গেল, খেয়াল করে দেখ রে ! ৩য় পৃষ্ঠায় স্পষ্ট হয়Ñ আবুল কালাম আজাদ শতবর্ষ উদ্যাপন কমিটির প্রধান শিক্ষক, বিদ্যালয়ের নয়। ‘অন্যতম’ কয়জন হতে পারে ? উত্তরÑ সবাই। কী লজ্জা ! সীমাহীন বিস্ময় ! অনুষ্ঠান ও উৎসব এবং বছর ও বৎসরের মধ্যে যে কিঞ্চিৎ পার্থক্য রয়েছে, সে কান্ডজ্ঞান লক্ষ্য করা যায় না। বরং শব্দচয়ন ও বাক্যগঠনে চন্ডালদিগের চরম অদক্ষতা ও অযোগ্যতাই দৃশ্যমান। পরন্তু যতিচিহ্নের জঘন্য যন্ত্রণায় পাঠক ‘প্রাচীরপাদে প্র¯্রাব করিবেন, না করিলে—–।’ অত:পর প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থের কথা কী আর কহব, কহতব্য নয়, কহনে না যায়। পান্ডিত্যের উৎপাতে শিক্ষার ‘উচিত শিক্ষা’ হয়েছে ; পচা প্রলাপের দুর্গন্ধে ‘ত্রাহি মধুসূদন’ অবস্থা। হায়, এর কোন কপি যখন নদী ইছামতির বিভেদরেখা পার হয়ে প্রয়াত শরৎ বাবুর উত্তরপুরুষদের হাতে ভারতে (মহাভারতে) পৌঁছাবে, তখন দেশ ও দশের মাথা কি লজ্জায় হেঁট হয়ে যাবে না ? কেলেঙ্কারি আয়োজনে অবলরা কেউ উদ্যোগী হয়ে মুখে চুনকালি মাখেনি ভাগ্যিস! বিদ্যা বিদায়, বিদ্যালয়-ভবনও ধ্বংস। চৌদ্দপুরুষ সাধনা করে যে ভবন নির্মাণ করা সম্ভব হয় না, সেই মজবুত ভবন, ঐতিহাসিক স্থাপনা প্রয়োজনে সংস্কার করা যেতে পারে, ভেঙে ফেলার হেতু কী ? দুর্নীতি ! তুমি মোরে করেছ মহান।
(২) সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ জামে মসজিদ। মসজিদে প্রবেশ ও বের হওয়ার দোয়া, বাংলা উচ্চারণ ও অনুবাদে সুস্পষ্ট ও মারাত্মক ভুল। প্রবেশের দোয়ায় ‘বাব’Ñএর বহুবচন ‘আব্ওয়াবা’র অনুবাদ করা হয়েছে ‘দরজা’। প্রকৃতপক্ষে ‘দরজাসমূহ’ হবে। আল্লাহ্র রহ্মাতকে বড় করে দেখার সুযোগ আছে, কিন্তু সংকুচিত করে অপব্যাখ্যা করার অধিকার কারো নেই। মূল দোয়ায় রহ্মাতের ‘অনেক দরজা’ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু অনুবাদে শুধু ‘দরজা’। একটি স্বনামধন্য বিরাট বিদ্যাপীঠ পরিচালিত মসজিদের জন্য এমন ভুল কোন মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। অনুরূপভাবে বের হওয়ার দোয়ার অনুবাদে অতিরিক্ত ‘আপনার নিকট’ কথাটুকু সংযুক্ত হওয়া উচিত। প্রবেশের দোয়ার উচ্চারণে ‘আল্লাহুম্মাফ্তাহ্লী’র মাঝখানে স্পেস দেওয়া ঠিক হয়নি। অপরপক্ষে বের হওয়ার দোয়ার ক্ষেত্রে ‘মিন’ ও ‘ফাদ্লিক’ শব্দদুটিকে একসাথে একশব্দে লেখা একদম ভুল হয়েছে। প্রবেশের দোয়ায় যে কারণে ঈ-কার দিয়ে ‘তাহ্লী’ লেখা হয়েছে, ঐ একই কারণে বের হওয়ার দোয়ায় ‘ইন্নি’ স্থলে ‘ইন্নী’ হওয়া অতীব জরুরী। এছাড়া মূল দোয়ায় যথাক্রমে ‘আব্ওয়াবা’ শব্দে আলিফের উপর যবর নেই এবং ‘আস্আলুকা’ শব্দে লামের উপর পেশ স্থলে সুকুন লাগানো হয়েছে। অর্থবিকৃতিসহ আরো অসংখ্য ভুল। সংশোধন কাম্য।
(৩) শুদ্ধিশালায় অশুদ্ধ বাংলা। যথাÑ ‘লালবাতি জ্বলা  কালিন  সুন্নাতের নিয়্যাত করিবেন না’  ইত্যাদি।
আলোকিত ও আলোচিত সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটা উপজেলার ঘলঘলিয়া রহিমপুর গ্রামে অবস্থিত প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ‘রতেœশ্বরপুর পাঁচপোতা রহিমপুর জামে মসজিদ’টি সম্প্রতি ভক্তিগদগদ-অতিভক্ত খাদেমসাহেবগণ তথা পাড়াগাঁয়ের বুঝন মোড়ল, নিধিরাম সর্দার, বিদ্যাসাগর-বুদ্ধিভান্ডার, পন্ডিতবর-রতেœশ্বরগণের ‘রতনে রতন চেনা’ রুচিশীল (মুচীশীল) কর্মকান্ড(ধর্মকা-)প্রসূত ভাষাবিভ্রাটে পড়িয়া আপন ঐতিহ্য-অহং হারাইতে বসিয়াছে। মসজিদটির  দেওয়ালে-ওয়ালে, তোরণে-ফটকে ‘ড ড নং’ পান্ডিত্যের বহিঃপ্রকাশ হেতু হরেক রকম ‘হরে কর কমবা’ মার্কা অতীব হাস্যকর অশুদ্ধ বাংলালিখন জমকালো-সাদাকালো ফলকে, দৃশ্যমান হরফে, ‘শিব গড়িতে হনুমান’ অবয়বে শোভা পাইতেছে ; যাহা দর্শনে টু-ক্লাসের প্রথম পাঠের বাংলা পড়ুয়া ‘আজিকার শিশু’টিও ভিরমি খাইতেছে। ধর্মতলার ধর্মসভার কমিটি দাবিদার, সভাপতি-সভাকবি পদধারী, একগন্ডা, অর্ধগন্ডা, গন্ডা গন্ডাÑএকুনে গন্ডাকতক ডালকাটা কালিদাস পন্ডিত (!) কর্তৃক মাতৃভাষায় রচিত ও মসজিদগাত্রে অঙ্কিত উক্ত জ্ঞানগর্ভ শ্লোকাদি (!) পঠনে অধমজনেও মরমে অবগত হয়েন যে, বাক্যগঠন বেঠিক, বানান ভুল, বিরামচিহ্ন Ñ উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে, গুরুচন্ডালী দোষে দুষ্ট শব্দসম্ভার ; আর ব্যাকরণ তো অকারণ, অনেক অনেÑক দূরের কথা ; অতঃপর ভাষাশৈলী (চাষাশৈলী)Ñতথৈবচ ! কী (ছি!) ‘মচৎকার’ বচনামৃত (পচনামৃত) ! রচনামৃতের কাব্যরস-সাহিত্যকষ যেন গেঁজাইয়া উপচাইয়া গাঁজাভান্ডের গাত্র বহিয়া গড়াইয়া পড়িতেছে। হতভাগিনী বাংলাভাষা পড়িয়াছে ‘বাঙ্গালী’র খপ্পরে। মান-বাংলা ধর্মশালায় কেন নয়, কেন উপেক্ষিত ! ‘হেতো আফালি-তাফালিংবাজ’ বুদ্ধুজ্ঞানরাজ ‘হাবাঙালী’র পাল্লায় পড়িয়া অসহায়া-কাঙালিনী বাংলাভাষার আজি ‘ ধরণী দ্বিধা হও’ অবস্থা হইয়াছে।
ওরা বায়ান্নর খুনি, আমরা বারোমাসের;
ওরা ভাষাশহীদের খুনি, আমরা ভাষের।
‘মুগ্ধ জননী’র কণ্ঠ রুদ্ধ, দেহ ফালাফালা।
হায়, প্রমিত বাংলা নাকি প্রহৃত বাংলা?