বাঁচাতে হবে মাটির ফুল


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৭ ||

মো. আবদুর রহমান
শিশুরা আমাদের আনন্দ, সৌন্দর্য ও ভবিষ্যৎ জীবন ধারার এক শ্রেষ্ঠ সম্পদ। পুষ্টি ও সুস্বাস্থ্য নিয়ে সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠা তাদের জন্মগত অধিকার। অথচ ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এ বাংলাদেশের মাটির ফুলরূপ শিশুরা আজ মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে।
ইউনিসেফ এর এক তথ্য মতে, এদেশের প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৯ জনই অপুষ্টির শিকার। যাদের বয়স অনুর্ধ ৫ বছর। অপুষ্টির কারণে দেশে প্রতিদিন ৬ বছর বয়সের প্রায় ৭শ’ শিশু অপরিণত বয়সে  মারা যায়। প্রায় ৭০ শতাংশ শিশু লৌহের অভাবে রক্তশূন্যতায় ভুগছে। আবার ভিটামিন ‘এ’র অভাবে আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার শিশু অন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া অপুষ্টির জন্য এদেশের শিশুরা রাতকানা, চর্মরোগ, ম্যারাসম্যাস, কোয়াশিয়কর, বেরিবেরি, মুখ ও ঠোঁটের কোণে ঘা, স্কার্ভি প্রভৃতি রোগে আক্রান্ত হয়।
সম্মানিত পাঠক, আপনি কী চান, দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার অমিত সম্ভাবনাময় মাটির ফুলরূপ দেশের শিশুরা অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয়ে অকালে ঝরে যাক? নিশ্চয়ই না। ইসলামে সন্তান-সন্ততির যেসব অধিকারের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে সন্তানের বেঁচে থাকার অধিকার অন্যতম। আর সন্তানের বেঁচে থাকার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন মায়ের বুকের দুধ পান, প্রতিপালন ও স্বাস্থ্য সেবার। কাজেই প্রতিটি শিশুর জীবন বাঁচাতে জন্মের পর থেকে মায়ের বুকের দুধসহ সব সময় শিশুর পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্য ও তার স্বাস্থ্য পরিচর্যার প্রতি সকল মা-বাবারই বিশেষ লক্ষ্য রাখা একান্ত অপরিহার্য।
শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধ পৃথিবীর সেরা পুষ্টিকর খাদ্য। মায়ের বুকের দুধ শিশুর জন্য একটি হক-একটি জন্মগত অধিকার। তাই ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর পরই নবাজত শিশুকে মায়ের বুকের প্রথম দুধ বা শাল দুধ খেতে দিতে হবে। শিশুর জন্য এই শাল দুধ খুবই পুষ্টিকর, নিরাপদ ও রোগ প্রতিরোধক। এত রয়েছে অতিরিক্ত প্রোটিন ও ভিটামিন ‘এ’। শালদুধ কোষ্ঠ পরিস্কার হিসেবে কাজ করে এবং শিশুকে বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করে। নবজাত শিশুর জন্য শাল দুধ ছাড়া অন্য কোন খাবারের প্রয়োজন নেই। জন্মের পর থেকে পাঁচ মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়ালে শিশুকে অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন রোগের হাত থেকে রক্ষা করা যায়। কারণ, শিশুর জন্য অত্যাবশ্যকীয় সকল পুষ্টি উপাদান যথাঃ-প্রোটিন, শর্করা, ভিটামিন, ¯েœহ পদার্থ, খনিজ লবণ ও পানি মায়ের দুধে সঠিক পরিমাণে বিদ্যমান থাকে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ইউনিসেফ শিশুদের পাঁচ মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধই উপযোগী খাবার বলে অনুমোদন করেছে। মায়ের দুধ পান করার ফলে শিশুদের দেহে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। এজন্য জন্মের পর থেকে পাঁচ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধুমাত্র  মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত।
শিশুর বয়স পাঁচ মাস পূর্ণ হলে শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ শিশুর শরীরের চাহিদা মেটে না। তাই পাঁচ মাস পূর্ণ হলে শরীরের প্রয়োজন মেটানোর জন্য মায়ের দুধের পাশাপাশি শিশুকে অন্যান্য খাবারও খাওয়াতে হয়। এ সময় ভাত, রুটি, ডাল, শাক-সবজি, মাছ, মাংস, ডিম, আলু ও মৌসুমী ফল তার উপযোগী করে খাওয়াতে হবে। চাল, ডাল ও শাক-সবজি অল্প তেল দিয়ে রান্না করা নরম খিঁচুড়ি শিশুর জন্য খুব উপকারী খাবার। শিশুর দেহের ক্ষয়পূরণ ও বৃদ্ধি সাধনের জন্য তাদের প্রতিদিনের খাদ্যে প্রোটিনের দরকার অত্যন্ত বেশি। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল, বরবটি, সীমের বীচি এসব  খাবার খাওয়ালে শিশুদের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ হয়। এছাড়া শিশুদের খাদ্যে শর্করা ও ¯েœহ জাতীয় খাবারও দরকার। ¯েœহ ও শর্করা জাতীয় খাদ্য দেহে তাপ ও শক্তির যোগান দেয়। এজন্য শিশুদের খাদ্য তালিকায় পরিমাণ মতো ভাত, রুটি, আলু, সুজি, ঘি,  মাখন ইত্যাদি থাকতে হবে।
শিশুর দেহের জন্য ভিটামিন ‘এ’ একটি অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান। শিশুর চোখের দৃষ্টিশক্তি ভাল রাখা ভিটামিন ‘এ’র প্রধান কাজ। ভিটামিন ‘এ’র অভাবে শিশুর রাতকানা রোগ হয়। এদের অনেকেই রাতকানা রোগে ভুগতে ভুগতে অন্ধ হয়ে যায়। শিশুকে অকাল অন্ধত্ব ও রাতকানা রোগের হাত থেকে বাঁচাতে শিশুদের প্রতিদিন  নিয়মিত ও পরিমাণমতো ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়াতে হবে। মাছ, মাংস, ডিমের কুসুম, কলিজা, দুধ এবং গাঢ় সবুজ ও হলুদ রঙের শাক-সবজি ও ফলমূল বিশেষ করে পাকা আম, কাঁঠাল, পেঁপে, কলা, আনারস, কচুশাক, পুঁইশাক, ডাটাশাক, পাটশাক, লালশাক, পালংশাক, বাঁধাকপি, গাজর, টমেটো, মিষ্টি কুমড়া থেকে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন ‘এ’ পাওয়া যায়। এসব খাবার নরম করে শিশুদের খাওয়াতে হবে। ভিটামিন ‘এ’ যেহেতু তেলে দ্রবনীয়, তাই ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে তেল দিয়ে রান্না করে শিশুদের খেতে দেয়া উচিত। সাম্প্রতিককালের বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, দেহে আদর্শ মাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ গ্রহণ করলে শিশুর শুধু রাতকানা ও অন্ধত্বই নিবারন হয় না, সেই সাথে ডায়রিয়া, আমাশয়, হাম, নিউমোনিয়া ইত্যাদি সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করে শিশু মৃত্যুর হার শতকরা ২৩ থেকে ৪৫ ভাগ পর্যন্ত হ্রাস করে।
ভিটামিন ‘সি’ এর চাহিদা পূরণে প্রতিদিন শিশুদের পাতিলেবু, কাগজী লেবু ও বাতাবীলেবুর রস খেতে দিতে হয়। এছাড়া সহজলভ্য মৌসুমী ফলমূল ও গাঢ় সবুজ রঙের শাক-সবজি থেকেও প্রচুর ভিটামিন ‘সি’ পাওয়া যায়। ভিটামিন বি-২ (রাইবোফ্লেভিন) এর অভাবে শিশুদের মধ্যে প্রায়ই মুখের দু’কোণে ঘা এর প্রকোপ দেখা দেয়। ঘা যুক্ত মুখে খাবার দিলে জ্বালা-পোড়ার ভয়ে শিশুরা খেতে চায় না। এতে শিশুর পুষ্টিহীনতা বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত  হয়। মুখের দু’কোণে ঘা যাতে না হয় তার জন্য শিশুকে ভিটামিন বি-২ (রাইবোফ্লেভিন) ও লৌহ সমৃদ্ধ খাবার যথাঃ- কলিজা, ডিমের কুসুম, দুধ, মাছ, মাংস, ডাল, সীম, আটার রুটি, ঢেঁকি ছাঁটা চালের ভাত, গুড়, কাঁচকলা, কচুশাক, লালশাক, ডাঁটাশাক, পুঁইশাক এবং অন্যান্য সবুজ শাক-সবজি ও টাটকা ফলমূল ইত্যাদি শিশুর উপযোগী করে প্রচুর পরিমাণে খেতে দিতে হবে। শিশুর হাড় ও দাঁতের স্বাভাবিক গঠন ও সুস্থতার জন্য ভিটামিন ‘ডি’ ও ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। তৈলাক্ত মাছ, ডিমের কুসুম, মাখন ও চর্বিযুক্ত খাদ্য থেকে যথেষ্ট পরিমাণে ভিটামিন ‘ডি’ পাওয়া যায়। মাছ, মাংস ডিমের কুসুম, দুধ, কলিজা, ডাল, সবুজ শাক-সবজি ও ফলমূলে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকে। তাই শিশুদের এসব খাবার তার উপযোগী করে নিয়মিত খাওয়ানো উচিত।
দেহের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার ছাড়াও শিশুর শরীর সুস্থ ও সবল রাখার জন্য শিশুকে কতগুলো প্রতিষেধক টিকা দেয়া অত্যন্ত জরুরি। আমাদের দেশে প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার, হুপিংকাশি, পোলিও এবং হাম ইত্যাদি রোগে মারা যায়। এই ৬টি সংক্রামক রোগের হাত থেকে রক্ষার জন্য শিশুদের সবগুলো টিকা দিতে হবে। এছাড়া শিশুর নিয়মমতো ঘুম ও বিশ্রামের ব্যবস্থাসহ পরিবারের সকলেরই অকুন্ঠ ভালবাসা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ পারিবারিক সম্পর্কের পরিবেশ  সৃষ্টি করে শিশুর সুষ্ঠু মানসিক বিকাশে সহায়তা করা উচিত।
পরিশেষে শিল্পীর গানের সুরে বলতে চাই-‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি,/মোরা একটি মুখের হাসির জন্য, যুদ্ধ করি’….। আর দেশের মাটির ফুলরূপ শিশুর এই নির্মল হাসি মুখ দেখতে হলে জন্মের পর থেকে প্রতিটি শিশুকে মায়ের বুকের দুধ এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে অন্যান্য পুষ্টি কর খাবার নিয়মিত খেতে দিতে হবে। এছাড়া শিশুর স্বাস্থ্য পরিচর্যা এবং আদর-যতœ দিয়ে তাদের লালন-পালনের প্রতি সকল মা-বাবারই আরও বেশি সচেষ্ট ও যতœবান হওয়া একান্ত অপরিহার্য। এর ফলে শিশু ফুলের মতো বিকাশিত হয়ে ভবিষ্যতের জন্য একজন সুস্থ-সবল, কর্মক্ষম ও বুদ্ধিমান নাগরিক হয়ে বেড়ে ওঠে দেশ ও জাতির কল্যাণ বয়ে আনতে সক্ষম হবে। আর এটাই আমাদের একান্ত কাম্য।
লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা।