মহান একুশ: প্রেক্ষাপট ও আজকের প্রতিপালন ‘আমার দু:খিনী বর্ণমালা গো তোমায় মুক্ত করে পেলাম’


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৭ ||

পঞ্চানন মল্লিক
দাদার বয়সী বুড়ো বট গাছটায় প্রতি শীতে পাতা ঝরে যায়। ফাগুন এলে আবার একটা দুটো করে জাগে। পাশে পলাশ গাছে থোকায় থোকায় লাল ফুল ফুঁটে থাকে। পলাশের লাল ফুল দেখলে মনে পড়ে, ৮ফাল্গুনে মাতৃভাষার জন্য বাঙালির সেই মহান আত্মত্যাগের কথা। ভাষা শহীদদের কথা। বড় গর্বের, ঐতিহ্যের আর ভাষার জন্য রক্ত দানের বৃহৎ ত্যাগে ভাস্বর এই দিনটি। ভাষার জন্য জীবন দানে, বিরল ত্যাগে, সালাম, রফিক, বরকতের সোপার্জিত প্রাণে মাতৃভাষার শৃঙ্খল মুক্তির দিন। তাই বিশ্বের মাঝে অনন্য, অসাধারণ, ঐতিহাসিক এ দিনটি। মাতৃভাষার জন্য পৃথিবীর আর কোন জাতিকে এভাবে অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে কিনা জানিনা, তবে বাঙালি তা পেরেছিল অত্যন্ত বীর দর্পে। আমার দু:খিনী বর্ণমালা গো তোমায় মুক্ত করে পেলাম, এমন প্রাণের অনুরণন মিশে আছে এ দিনটির গায়। দিনটি তাই বাঙালির জীবনে চির স্মরণীয়। বেদনার নীল রং দিয়ে ধোয়া তবু স্মৃতিময় একুশ বারবার ফিরে আসে আমাদের জীবনে। অবশ্য এ দিনটির রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস বা প্রেক্ষাপট। ১৯৪৭ সালের ১৪ এবং ১৫, আগস্ট ইংরেজদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন-স্বার্বভৌম রাষ্টের জন্ম হলেও বাংলার আকাশ থেকে পরাধীনতার মেঘ তখনো কাটেনি। এদেশের মানুষের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠির বিমাতাসুলভ আচরণ, চাকরি বাকরি, ব্যবসা বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রে বাঙালির অধিকার তারা হরণ করে রেখেছিল। বাঙালির কথা বলার অধিকার ছিল খর্বিত, ন্যায্য দাবি, ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত এমন কি বাঙালির মুখের ভাষাও সেদিন আক্রান্ত হয়েছিল ওদের দ্বারা। সে এক স্বাধীনতার স্বপ্ন ভঙ্গের ইতিহাস, যার গায়ে লেগেছিল কেবল অবজ্ঞা আর বঞ্চনা পরিহাস। মূলত পাকিস্তান সৃষ্টির পর তৎকালীন শাসক গোষ্ঠি চেয়েছিল উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বানাতে। যদিও পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা ছিল বেশি এবং উর্দুর চল এখানে তেমন ছিলনা। তবু তারা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল উর্দুকে এদেশের মানুষের উপর। কিন্তু বাঙালি জাতি তা মেনে নিতে পারিনি। তাদের প্রাণের অনুরননে, অস্তিত্বে যে কেবল বাংলা ভাষার বসবাস। প্রাণের ভাষার উপর এই অমানবিক আচরণ বাঙালিকে বিদ্রোহী করে তুলেছিল। তাই বাংলা ভাষার মর্যাদার দাবিতে শুরু হলো ভাষা সংগ্রাম। ১৯৪৭ সালে করাচি জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাপত্রে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসাবে উর্দুকে ব্যবহারের সুপারিশ এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী ফজলুর রহমান মানিক উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বানানোর তৎপরতা শুরু করলে পূর্ব পাকিস্তানে তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে। ঐ বছর ৮ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বরে ছাত্ররা একটি বিশাল সমাবেশ করে। ঐ সমাবেশ থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে মর্যাদা দানের আনুষ্ঠানিক দাবি জানানো হয়। ১৯৪৭ সালের শেষের দিকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সমর্থনে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। দু:খিনী বর্ণ মালার অন্তরপোড়া আকুতি যে বাঙালির নাড়ির স্পন্দনে প্রতিনিয়ত স্পন্দিত হয়, আর যাই হোক শাসকের রক্ত চক্ষুর ভয়ে তারা কখনো নিশ্চুপ থাকতে পারে না। তাইতো ১৯৪৮ সালের ২৩, ফেব্রুয়ারি তারিখে পাকিস্তান গণ পরিষদের নির্ভিক বাঙালি সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, অধিকাংশ জাতি গোষ্ঠির ভাষা হিসেবে উল্লেখ করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবি তোলেন। ইংরেজি ও উর্দুৃর পাশাপাশি সদস্যদের বাংলায় বক্তৃতা প্রদান ও সরকারি কাজে বাংলাভাষা ব্যবহারের জন্য তিনি একটি সংশোধনী প্রস্তাবও উত্থাপন করেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন সংসদীয় দলের সদস্যদের আপত্তির কারনে তাঁর সংশোধনীটি গৃহিত হয়নি।
১৯৫২ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় এসে ২৭, জানুয়ারি পল্টন ময়দানের ভাষনে জিন্নাহ্ সাহেবের কথার পুনরুক্তি করে বলেন,“ পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।” এর আগে ১৯৪৮ সালের ২১, মার্চ ঢাকার এক ভাষনে এবং ২৪, মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ঘোষণা করেছিলেন,“ উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা।” জিন্নাহ্র এমন বৈষম্যমূলক বিরূপ বক্তব্যে সেদিন যেমন তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন ও কার্জন হলে না, না বলে তীব্র চিৎকারে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন উপস্থিত ছাত্ররা তেমনি নাজিমুদ্দিনের এ বক্তৃতার প্রতিবাদে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২৯, জানুয়ারি ঢাকায় প্রতিবাদ সভা ও ৩০, জানুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট পালন করে। ঐদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় সমবেত হয়ে ৪ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ও প্রতিবাদ সভা এবং ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপি হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত নেয় ছাত্রসহ নেতৃবৃন্দ। ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের বার লাইব্রেরি হলের সভায় মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে গঠিত ৪০ সদস্যের সর্বদলীয় কেন্দ্রিয় রাষ্ট্রভাষা কর্মী পরিষদ, ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল,সমাবেশ ও মিছিলের বিস্তারিত পরিকল্পনা গ্রহন করে। টের পেয়ে সরকার স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ১৪৪ ধারা জারি করে ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মাসের জন্য ঢাকা শহরে সভা, সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করে। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ঐ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে পুলিশ দানবীয় কায়দায় নির্বিচারে তাঁদের উপর গুলি চালায় । এতে আব্দুস সালাম, আব্দুল জব্বার, আবুল বরকত সহ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁদের নিথর দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। শহীদ হন তাঁরা। ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় ভাষা আন্দোলন আরও জোরালো হলে অবশেষে ১৯৫৪ সালের ৯ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সরকার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
১৯৫২ সালে ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি প্রতিপালিত হয় মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে। এ উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করে। প্রভাতফেরি, শহীদ মিনারে পুষ্প স্তবক অর্পন, দোয়ামাহফিল,আলোচনাসভা, চিত্রাঙ্কন, শুদ্ধ বানান, সুন্দর হস্তাক্ষর, কুইজ প্রতিযোগিতা ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয় এ দিবসে। বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে স্মরণিকা, সংকোলন প্রকাশেরও চলে তোড়জোড়। ঢাকার কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীসহ সাধারণ জনতা ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। এ সময় “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি” এই হৃদ স্পন্দিত গানটি বাজতে থাকে।
৫২’র ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল মাতৃভাষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ থেকে। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে সেদিন জেনে শুনেই মৃত্যু কুপে ঝাপ দিয়েছিল বাংলার দামাল ছেলেরা। শাসকের রক্ত চক্ষু, ভয় ভীতি কোন কিছুই তাদের পিছু হটাতে পারেনি। সেই একুশের শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে বাঙালি আজ এগিয়ে গেছে বহুদুর। এদেশের মানুষ একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করে স্বত:স্ফুর্ত ভাবে, শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে। শহরের মত গ্রামের মানুষও আজ সচেতন। সেখানেও নানা আয়োজনে উয্যাপিত হয় দিবসটি।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে মাতৃভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালি যে চেতনার বীজ বপন করেছিল আজ তা দেশের গন্ডী পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনোস্কোর প্যারিস অধিবেশনে ২১ ফ্রেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পৃথিবীর অনেক দেশই এখন বাঙালির মত একুশের প্রথম সকালে ৫২’র ভাষা আন্দোলনে শহীদদের প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা জানায়। বিদেশে একুশ পালনের খবর জানার এক বাঙালি পিতার আকাঙ্খা, কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে এভাবে,“অয়নিকার জন্য তুলে রাখো একগুচ্ছ লাল ফুল/ মহাবিদ্যালয়ের মাঠ, কড়া লিকারের বক্তৃতা,/….মিনার চত্ত্বরে একুশ পালনের টুকরো আলোচনা।/ বিদেশ-বিভূঁইয়ে অয়নিকা যে ডিগ্রী আনতে গেছে,/ ওখানে সবাই প্রাণের ভাষা বলেনা, বাঙালি সাজেনা/ বিদেশি হালচালে থাকে।/ তবে ইউনোস্কোকে মানে,আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালে/ আমার ভাষাকে সালাম জানায়।/ শুনেছি অয়নিকা ওখানে পাঠ করেছে গুগল খুঁজে/ ৮-ই ফাল্গুনের কবিতা।/ দেশে ফিরলে শোনাব আরো, শোনা যাবে ঢের!/ ভাষার স্বীকৃতি গাথা।/ অয়নিকা আসবে, প্রভাতফেরিতে হাঁটবে, সাথে হাঁটবে/ গৌরবময় সকাল।” আজ  বিদেশে একুশ প্রতিপালনের খবর শুনে গর্বে হৃদয় ভরে ওঠে। এভাবে অনন্তকাল বাঙালির জীবনে একুশ চেতনার বাতিঘর হয়ে জেগে থাকবে।
লেখক: কলামিস্ট ও কবি