ভাষা আন্দোলন এবং একুশে ফ্রেব্র“য়ারী বাঙালি জাগরণ


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৭ ||

প্রকাশ ঘোষ বিধান
বাঙালী জাতির ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন ২১ ফেব্র“য়ারি। আজ থেকে ৬৪বছর আগের ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারী। এই দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। আমাদের বাংলা ভাষার অধিকার খুব সহজে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বাঙালী জাতি তার বুকের রক্ত দিয়ে মায়ের ভাষার অধিকার ফিরে পেয়েছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা কি হবে তাই নিয়ে বেশ তর্ক বিতর্ক জমে ওঠে। এর মধ্যে ১৯৪২ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ। এর সভাপতি নির্বাচিত হন ডা. সৈয়দ সাজ্জাত হোসায়েন এবং একই বছর কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত পূর্ব হয় পাকিস্তান রেনেসা সোসাইটি। পাকিস্তান সৃষ্টির আগে থেকে বাংলা ও সাহিত্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে যায়। উল্লেখ্য এই সেই সাজ্জাত হোসায়েন মুক্তিযুদ্ধের সময় কিছুদিন তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। এ সময় তিনি বাঙালী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ৩৭ জন শিক্ষক ও ২ জন কর্মকর্তার নামের একটি তালিকা তৈরী করে ঢাকার সামরিক সদর দপ্তর প্রেরণ করে মৃত্যুদন্ডসহ বিভিন্ন শাস্তির সুপারিশ করেন। ১৯৪৭ সালের ১৭ জুলাই হায়দ্রাবাদে মুসলিম লীগ নেতা চৌধুরী খালেকুজ্জামান এবং তৎকালীন আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচর্য ডা. জিয়াউদ্দীন একই মাসে ঘোষণা দেন যে, উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। ড. মো. শহিদুল্লাহসহ বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা এর প্রতিবাদ করেন। সদ্য সৃষ্ট পাকিস্তান সরকার শুরু থেকে ভাষা নিয়ে জট পাকাতে থাকে। তারা সোজা পথে না এসে বাকা পথে চলতে থাকে। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা শতকরা ৫৬ ভাগ বাঙালী। তাছাড়া পুশতু, পাঞ্জাবী, সিন্ধি ভাষাভাসির লোক রয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানের লোকজনের জন্য উর্দু ভাষা গ্রহণ করা সহজ। পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালী অধ্যুষিত এবং শতকরা ৫৬ ভাগ বাঙালীর ভাষা বাংলা। সেহেতু রাষ্ট্র ভাষা হওয়ার কথা দুটো উর্দু ও বাংলা। কিন্তু পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষাকে পাশ কাটিয়ে উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিয়ে ঝামেলা বাধালো। বাঙালী মুসলমানদের ভোট পাকিস্তান অর্জিত হয়। অথচ বাংলা ভাষা ও বাঙালী সংস্কৃতির নিধনের জন্য সরকার উঠে পড়ে লাগে। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল জিন্নাহ তার ভাষণে বলেন, যে একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন। তখন ছাত্রদের ভিতর থেকে না না বলে প্রতিবাদ জানানো হয়। ভাষার বিষয়টি আরো চরম পর্যায়ে আসতে থাকে। বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৪৮ সালে করাচীতে অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তানের শিক্ষা সম্মেলন ইসলামী আদর্শের ধুয়ো তুলে বাংলা ভাষার জন্য আরবি হরফ প্রচলনের প্রচেষ্টা করা হয়। আর আরবি হরফ প্রচালনের জন্য ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহকে নিয়োগ প্রস্তাব দিলে তিনি তা প্রত্যাখান করেন। পাকিস্তানের গণপরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের সদস্য সংখ্যা ছিল ৪৪। এর মধ্যে ৪জন অবাঙালীকে নির্বাচিত করতে হয়েছিল। ১৯৪৮ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে করাচীতে গণপরিষদের অধিবেশনে ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত প্রস্তাব করেন যে, উর্দুই পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করা উচিত। কিন্তু তারা এ প্রস্তাবে একজন মুসলিম সদস্যও সমর্থন করেননি। অথচ পূর্ববাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করা হোক এই মর্র্মে প্রস্তাব পাশ করা পূর্ব পাকিস্তানের সদস্যদের কর্তব্য ছিল। তাহলে জিন্নাহ এবং লিয়াকত আলী খান ইচ্চামত কথা বলতে পারতেন না। তরুণদের বুকের রক্তের বিনিময়ে যে বাংলা রাষ্ট্র ভাষা অর্জিত হয়েছে তা হয়তো শান্তিপূর্ণভাবে অর্জন করা যেত। হয়তো বা পূর্ব পাকিস্তানের গণ পরিষদের সদস্যরা পরিচয় সংখ্যা ও মানসিক বিভ্রান্তির মধ্যে ছিলেন। তা না হলে তারা এই প্রস্তাবকে সমর্থন দিয়ে পাস করতে পারতেন। ভাষা আন্দোলনে প্রবীনদের চেয়ে নবীনদের ভূমিকা অত্যন্ত প্রবল ছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্র“য়ারী ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অধিকাংশ সদস্য ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে মত দেয়। তবে সেই রাতেই ফজলুল হক হলে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক তরুন নেতা আব্দুল মতিন, গাজীউল হক, মোহাম্মদ তোয়াহ, আব্দুল গফ্ফার চৌধুরী, ফজলে লোহানী, ওলি আহম্মেদ, এমআর আক্তার মুকুল, মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান, শেলী, শামছুর রহমান, হাসান আজিজুর রহমান, হালিমা খাতুন, জিল্লুর রহমান সিদ্দীকি, মুনির চৌধুরী, জহির রায়হান, গোলাম মাওলা আরো সহ আরো অনেকে। উল্লেখ্য ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারী পূর্ববঙ্গ আইন সভায় প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সেকথা মাথায় রেখেই ২১ ফেব্র“য়ারীতে প্রতিবাদ কর্মসূচী পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ফেব্র“য়ারীর ৪ তারিখ থেকে পরবর্তী ২ সপ্তাহ ভাষার দাবীতে বাঙালি ছাত্রদের সাহস ও কর্মকান্ডে অবাঙালি প্রধান প্রশাসক কর্তৃপক্ষ হয়তো কিছুটা ভিতু হয়ে পড়েছিল। তাই ২১ সাদামাটা কর্মসূচী নাস্যাৎ করে দিতে তারা ২১ এর ২১ ফেব্র“য়ারী ১৪৪ ধারা নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ১ মাসের জন্য ঢাকায় সভা-সমাবেশ, মিছিল, বিক্ষোভ সবকিছু নিষিদ্ধ করা হয়। ২০ ফেব্র“য়ারী বিকালে মাইকে ঐ ঘোষণা ছাত্রজনতা সবাইকে অবাক করে দেয়। পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল শুরু করলে পুলিশ মিছিলে গুলি চালায়। ২১ ফেব্র“য়ারি বিকাল ৩টা ১০মিনিটে পুলিশ মিছিলে গুলি চালায়। ২২ ফেব্র“য়ারিতে পুলিশ গুলি চালায় রফিক, শফিক, সালাম, জব্বার, বরকত, শফিউর, ওলিউল্লাহ, আওয়ালসহ বেশ কয়েক জন শহীদ হন। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৪৮, এরপর ১৯৫০ অবশেষে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি মাতৃভাষা মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার দাবিতে আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অধিকার ও সচেতনতা সৃষ্টি হয়। ৫২ এর জাগরণ পরবর্তীতে সামরিক স্বৈরাচার এবং শোষন রঞ্চনা বিরোধী আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে বাঙালীর প্রাণে শক্তি ও সাহস যুগিয়েছে। তারই প্রতিফলন ১৯৫৫ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ঐতিহাসিক ৬ দফা ও ১১ দফার সংগ্রাম, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরোধী আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচনের জনতার রায় ও ৭১ এ বাঙালীর স্বাধিকার সংগ্রাম। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় বাঙালী জাতির স্বাধীনতা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারী মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলন সুচিত হয় বাঙালী আতœমর্যদা বোধ ও স্বাধিকারের চেতনা। ২১ মানেই শ্রদ্ধাঞ্জলী বাঙালী চিত্তের জাগরণ। মহান ভাষা আন্দোলনের অর্জন অজর-অমর ও অক্ষয়। ২১ ফেব্র“য়ারী মহান শহীদ দিবস ও আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালন হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ২১ ফেব্র“য়ারী আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছে। আমার ভাইয়ের রক্তে রায়ানো একুশে ফেব্র“য়ারী আমি কি ভুলিতে পারি। বাঙালী জীবনে একুশ ডাক দিয়ে যায় নব জীবনের। একুশ বাঙালী জাতির মননের বাতিঘর। একুশ মহিমান্বিত করেছে বাঙালী জাতিকে। এইদিনে গভীর শ্রদ্ধায় আমরা স্মরণ করি ভাষা শহীদদের। লেখক: সাংবাদিক