শহীদ মিনার: স্মৃতির প্রতীক


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৭ ||

মো. আবদুর রহমান
অমর একুশে ফেব্রুয়ারি, মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মাতৃভাষা বাংলাকে সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠার জন্য বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি রক্তের অক্ষরে রচিত হয়েছিল এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এই দীপ্ত শ্লোগানে জেগে উঠেছিল দেশের মানুষ, সর্বস্তরের জনগণ। তৎকালিন পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে সাহসী ছাত্র-জনতার মিলিত সংগ্রাম-আন্দোলন এবং বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ স্বৈরাচারী কায়দায় অমানবিক গুলি বর্ষণ করে। ঐ তপ্ত বুলেটে শহীদ হন রফিক, জব্বার, বরকত, সালাম, সফিউরসহ আরও অনেক তরুণ। রক্তের বিনিময়ে মাতৃভাষা বাংলা পায় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা।
এই সব ভাষা শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থেই নির্মিত হয়েছে শহীদ মিনার। ভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী বীর সৈনিকদের স্মৃতির প্রতীক শহীদ মিনার। প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। ভাষা শহীদদের স্মৃতিকে ধারণ করে শহীদ মিনার দাঁড়িয়ে আছে আপন মহিমায়। তবে শহীদ মিনার এ অবস্থায় আসতে বেশ সময় লেগেছে। বাংলাভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের স্বীকৃতির স্মারক শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠায় আছে নানা চাড়াই-উৎরাই। শহীদদের স্মৃতিচিহৃ শহীদ মিনার নির্মাণের রয়েছে এক অসাধারন গল্পঁগাথা।
ভাষা শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে ১৯৫২ সালের ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি অক্লান্ত পরিশ্রম করে ছাত্রজনতা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গনে প্রথম শহীদ মিনার তৈরি করেন। একাজে অংশ নেয় ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের তিনশ’ ছাত্র ও দু’জন রাজমিস্ত্রি। প্রথম শহীদ মিনারটির নকশা তৈরি করেছিলেন বদরুল আলম এবং তাঁর সঙ্গে ছিলেন সাঈদ হায়দার। নকশায় শহীদ মিনারের উচ্চতা নয় ফুট থাকলেও তৈরির পর এটির উচ্চতা হয় এগারো ফুট। শহীদ শফিউরের বাবা ২৪ ফেব্রুয়ারি, আর ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে ‘দৈনিক আজাদ সম্পাদক’ আবুল কালাম শামসুদ্দিন এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। কিন্তু তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী এটা মেনে নিতে পারেনি। তাই উদ্বোধনের দিন অর্থাৎ ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এ শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলে। তবে বাঙালির হৃদয় থেকে তারা এ মিনারের স্মৃতি মুছে দিতে পারেনি। কবি আলাউদ্দিন আল আজাদের ভাষায়- “ ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক/একটি মিনার গড়েছি আমরা চার-কোটি পরিবার।”
১৯৫৩ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত উক্ত স্থানেই কালো কাপড় ঘেরা দিয়ে শহীদ দিবস পালন করা হতো। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার পূর্ব পাকিস্তানে সরকার গঠন করার পর ভাষা শহীদদের স্মৃতি রক্ষার জন্য শহীদ মিনার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। তারই ধারাবাহিকতায় শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও তৎকালীন মওলানা ভাসানীর প্রতিষ্ঠিত দল আওয়ামী লীগের উদ্যোগে যুক্তফ্রন্ট সরকার কর্তৃক ১৯৬৫ সালে সারা পূর্ব-পাকিস্তানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ২১ ফেব্রুয়ারি  পালিত হয়, যার মাধ্যমে শহীদ মিনার নির্মাণের দাবি জোরালো হয়।
১৯৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আবু হোসেন সরকারের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের জন্য মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে স্থান নির্বাচিত হয়। তৎকালীন পূর্ত সচিব আবদুস সালাম খান ‘শহীদ মিনারের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের স্থান নির্বাচিত করেন এবং তার মাধ্যমে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কথা ছিল, তবে উপস্থিত জনতার প্রবল আপত্তির মুখে ভাষা আন্দোলনের অন্যতম শহীদ রিকশাচালক আওয়ালের ৬বছরের মেয়ে বসিরণকে দিয়ে স্মৃতিসৌধের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়, সেই মিনার বানানো সম্পন্ন হয়নি।
নাট্যব্যক্তিত্ব সাঈদ আহমেদের ভাই বিখ্যাত স্থপতি হামিদুর রহমান স্বর্নোজ্জ্বল ইতিহাসের বীর শহীদদের স্মৃতি পবিত্র শহীদ মিনারের নকশা তৈরি করেন ১৯৫৬ সালে। তারপর ১৯৫৭ সালের নভেম্বরে হামিদুর রহমানের নকশা অনুসারে, তিনি ও ভাস্কর নভেরা আহমেদের তত্ত্বাবধানে নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ‘দুইপাশে দুই সন্তানকে নিয়ে মা দন্ডায়মান’।
১৯৬০ সালে সামরিক সরকার ক্ষমতায় বসে শহীদ মিনার নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়। ১৯৬৩ সালে কাজ মোটামুটিভাবে সম্পন্ন হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির তত্ত্বাবধানে শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯৬৩ সালে। ১৯৬৩ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি এ অসমাপ্ত শহীদ মিনারটি পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, জনতার উপস্থিতিতে ভাষা শহীদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম উদ্বোধন করেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শহীদ মিনারটি ধ্বংস করে দেয়। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন হলে ১৯৭২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি আবার শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য কাজ শুরু করে দেয়। খুব দ্রুত নির্মাণের জন্য হামিদুর রহমানের তৈরি মূল নকশাকে পুরোপুরি অনুসরণ না করে শহীদ মিনারের বেদি ও মূল কাঠামো নির্মাণ করা হয়। যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনারা যে ম্যুরালগুলো ধ্বংস করেছিল তা আর তৈরি করা হয়নি। মূল পরিকল্পনায় থাকা জাদুঘর, লাইব্রেরি ও অন্য অংশগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে স্থাপনা থেকে। ১৯৮৩ সালে শহীদ মিনারের আরও কিছু অংশ নির্মাণের পর বর্তমান রূপ লাভ করে। বর্তমান শহীদ মিনারে তিনস্তর বেদির ওপর মাঝখানে ঈষৎ অবনত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বড় একটি স্তম্ভ। দুই পাশে দুটি করে  মোট চারটি স্তম্ভ রয়েছে। মাঝখানের বড় স্তম্ভটি মায়ের প্রতীক, আর ছোট স্তম্ভগুলো সন্তানের প্রতীক। প্রথম দৃষ্টিতেই ধরা দেয়, গৌরবময় রক্তঝরা ইতিহাসের সেই ‘শহীদবীরের স্মৃতিতে’ আজও মাথা নুইয়ে কথা কয় শহীদ স্মৃতি। মাথা নুইয়ে আছে দেশমাতা তার সন্তানদের প্রতি! যারা তাদের বুকের রক্ত ঢেলে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। বর্তমানে এ শহীদ মিনারের আদলেই বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে শহীদ মিনার  নির্মাণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে শহীদ মিনারের  সঠিক সংখ্যা কত এ তথ্য জানা যায়নি। তবে একটি সূত্রে জানা যায়, ‘দেশের প্রতি ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্তত আটটিতেই শহীদ মিনার দেখা যায়।’ আর সরকারি হিসাবে দেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে ২ লাখ ৮২ হাজার ৮০৬ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়া জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, থানা ও ইউনিয়নের মিলিত সংখ্যা ৫ হাজার ৯৪৭ টি। এসবের ৮০ শতাংশেরও বেশিতে যদিও শহীদ মিনার স্থাপিত আছে। এই হিসেবে বাংলাদেশে শহীদ মিনারের আনুমানিক সংখ্যা ২ লাখেরও বেশি। দেশের পাড়া-মহল্লার ক্লাবগুলোর সামনেও শহীদ মিনার দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। একুশের প্রভাতে দেশব্যাপী ছাত্র-তরুণেরা আবেগ ও ভালোবাসায় ঢেলে ইট বা কলা গাছ দিয়ে ক্ষণিকের জন্য হাজার হাজার শহীদ মিনার তৈরি করে।
আমাদের জীবনে যা কিছু সুন্দর, যা কিছু শুভ তার সঙ্গে শহীদ মিনারের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এটি শুধু একটি মিনার নয়, এটি আমাদের প্রেরণার প্রতীক। শুধু ভাষা আন্দোলন নয়, মুক্তিযুদ্ধেও  শহীদ মিনার আমাদের প্রেরণা যুগিয়েছে। আমাদের যুদ্ধজয়ের অন্যতম প্রেরণা একুশে ফেব্রুয়ারি। আমরা যখনই অন্যায়ের শিকার হই; তখনই শহীদ মিনার তার প্রতিবাদ করার জন্য আমাদের প্রেরণা জোগায়।
আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে শহীদ মিনারের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দেশে যখনই কোনো অন্যায় সংঘটিত হয়, তখনই শহীদ মিনারের সামনে থেকে তার প্রতিবাদ করা হয়। বিভিন্ন জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয়। এমনকি কোনো জাতীয় বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের মৃত্যুর পর তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে রাখা হয়।
শহীদ মিনার আমাদের প্রেরণার উৎস। আমরা শহীদ মিনারের দিকে তাকিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ অতীতের কথা ভাবি। আর বর্তমান প্রজন্মের কাছে গর্ব করে সে কথাগুলো বলি। আজ ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেয়েছে। ভাষার জন্য আমাদের আত্মদানের ইতিহাস ছড়িয়ে গেছে বিশ্বব্যাপী। শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। বাঙালির সঙ্গে  সঙ্গে গোটা পৃথিবীর মানুষ আজ শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে ভাষা শহীদদের অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।
আমাদের ভাষা আন্দোলনের একটি বিশেষ তাৎপর্য আছে। সেটা হচ্ছে এ আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা আন্দোলনের পথ খুঁজে পেয়েছি। এটা ছিল সকল আন্দোলনের সোপান স্বরূপ। একুশ নিয়ে প্রথম গান রচনা করেছিলেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। এর প্রথম চরণ ‘ আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি।’ একুশের প্রথম নাটক ‘ কবর’ মুনীর চৌধুরী রচনা করেন ১৯৫৩ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বসে। মূলত: একুশ আমাদের স্বাধীনতার পথ প্রদর্শক, প্রেরণার উৎস। একুশের প্রেরণাকে সামনে রেখেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা