ভাষা আন্দোলনে সাতক্ষীরা ছাত্র সমাজের অবদান


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৭ ||

আব্দুল ওয়ারেশ খান চৌধুরী
ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে আমাদের জাতীয় জীবনের এক অতিগুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটা ছিল পূর্ববঙ্গবাসীদের প্রথম  স্বাধিকার আন্দোলন। এই ভাষা আন্দোলনের সিড়ি বেয়েই ৬৬’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯’র এর গণআন্দোলন এবং সর্বশেষ মুক্তিযুদ্ধের ভিতর দিয়ে বাংলাদেশ একটা স্বাধীন দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। ইতিহাসের ধারায় তাই এর গুরুত্ব অপরিসীম।
ভাষা আন্দোলন মুলত: দুটি পর্বে বিভক্ত আটচল্লিশ এবং ৫২। আট চল্লিশকে বলা হয় ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্ব বায়ান্নোর চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছাতে যার অবদান ছিল খুবই বেশী। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত কর্তৃক আনীত সংশোধনী প্রস্তাবকে প্রত্যাখান করে পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন যে ‘উর্দুই হবে পুর্ব বাংলার একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারী স্বত:স্ফূর্তভাবে ঢাকায় ছাত্রধর্মঘাট পালিত হয়। ১১ মার্চ সারা পুর্ব বাংলায় সাধারণ ধর্মঘাটের আহবান জানানো হয়।
দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ফজলুল হক হলে পুর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কর্মী সম্মেলনে এর ১৪ সদস্য বিশিষ্ট যে সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয় তার একজন ছিলেন এ অঞ্চলের বাগেরহাটের শেখ আ. আজিজ। দেশের পাক সরকার বিরোধী প্রথম ছাত্র সংগঠন এ পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ পরে (শুধু ছাত্রলীগ) যারা জাতীয় পর্যায়ে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশ বিভাগের পর দক্ষিণের অনুন্নত পশ্চাদপদ মহকুমা তখন সাতক্ষীরা। তবু এখানকার সচেতন মানুষ জেগে উঠেছিলেন ঢাকার সাথে সঙ্গতি রেখে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে। এ সময় ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সাতক্ষীরার মানুষকে জাগ্রত করে জাতীয় চেতনার সাথে সম্পৃত্ত করা এবং এখানে আন্দোলনের মুল¯্রােত নির্মাণ করার কাজটি করেছিলেন সুশোভন আনোয়ার আলী। মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর রাজনৈতিক চেতনার অনুসারী এবং আত্মীয় ছিলেন রহিম বকস। তিনি কৃষক প্রজাপার্টির সমর্থক, ১৯৪৮ সালে রহিম বকসের পুত্র শামসুল হক (২), সাতক্ষীরা কলেজের উচ্চমাধ্যমিক ২য় বর্ষের ছাত্র। পিতার অনুপ্রেরণায় ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন তিনি। ৪৮ সালে ঐতিহাসিক সামসুল হক (২) তার সহপাঠি তারাপদ রায় চৌধুরীকে নিয়ে একাদশ প্রথম বর্ষের শ্রেণি কক্ষে যান এবং ছাত্র ছাত্রীদের ভাষা আন্দোলনের অংশ নিতে আহবান জানান। তখন শ্রেণি কক্ষে উপস্থিত শিক্ষক রাখাল দাস হালদার ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমাদের বড় ভাইয়েরা এসেছে। তারা ঢাকার ডাকে সাড়া দিয়ে আন্দোলনে নেমেছে। আমাদের উচিত এই ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়া, তবে অংশনেবে কিনা সেটা তোমাদের ব্যাপার। একথা বলার পর ৩০ থেকে ৪০ জন ছাত্র-ছাত্রী ক্লাস ত্যাগ করে বেরিয়ে আসেন এবং শাসকগোষ্ঠির বিরুদ্ধে বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে একটা মিটিং করেন। কোন মিছিল করা হয়নি। তখন সাতক্ষীরার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বলতে কৃষক প্রজাপার্টির এনায়েত উল্লাহ ও তোফাজ উদ্দীন আহমেদ, মুসলিম লীগের বারি খান ও তোফাজ খান।
সেদিন এমন ধারনা সাতক্ষীরাতেও ছড়ানো হয়েছিল যে, মুসলিমলীগের বিরুদ্ধে যে কথা বলবে সে ভারতের দালাল সে পথভ্রষ্ট পাপী। মুসলিমলীগের বিরুদ্ধে কথা বলা পাপ করারই সমান।

21 fev

শামসুল হক উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে উচ্চতর শিক্ষার জন্যে ঢাকায় চলে যান এবং সেখানে ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হিসাবে কাজ শুরু করেন। ১৯৫০ এর দিকে জোরালোভাবে আন্দোলনের কাজ শুরু করেন সুশোভন আনোয়ার আলী। সৈয়দ জালাল উদ্দীন হাশেমীর পুত্র সৈয়দ কামাল বখত ছাকী খূলনা বিএল কলেজের ছাত্র তখন, সুশোভন আনোয়ার আলী, সৈয়দ কামাল বখত ছাকী, পাইকগাছার আ. গফুর এর নেতৃত্বে সাতক্ষীরা ভাষা আন্দোলনের পক্ষে বৃহদাকার একটা মিছিল করা হয়। মিছিল শেষে পলাশপোল গুড় পুকুরের পাশে বটতলায় মিটিং করা হয়। তখন সাতক্ষীরার সকল জনসভা, রাজনৈতিক সভা অনুষ্ঠিত হতো এই বট তলায়। মিটিং ও মিছেলে অংশ নিয়েছিলেন অনেকের মধ্যে রসুলপুরের গোলেরা বেগম ও সুলতানা চৌধুরী। এরা দুজনেই তখন স্কুল ছাত্রী ছিলেন। এই মিছিল ও মিটিংয়ের কিছু দিন পর গ্রেপ্তার হন সুশোভন আনোয়ার আলী। ১৯৫২’র ২২ এপ্রিল ঢাকায় মিছিল থেকে গ্রেপ্তার হন শামসুর হক (২)। শেখ আমানুল্লাহ যশোরে পড়তেন। তিনি ওখানকার নেতৃস্থানীয় ছাত্র নেতা ছিলেন। সাতক্ষীরায় আরো এক জন ছাত্র গ্রেপ্তার হন বাগের হাট থেকে। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মিছিলে গুলি হলে বাগেরহাটে পি সি কলেজের ছাত্র এম. মুনছুর আলী (পরে মন্ত্রী) এক জনসভায় বক্তিতার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আর একটা প্রসঙ্গের পর কিঞ্চিৎ আলোচনা না করলে ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ অসম্পন্ন রয়ে যায়। এই সময় সাতক্ষীরার জন সাধারণকে বাংলাভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে এক ধরনের জাগরণী গান রচনা করে গলায় হারমনিয়াম ঝুলিয়ে তার গান রাস্থায় রাস্থায় গেয়ে বেড়ানো হতো। এ কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সুশোভন আনোয়ার আলী। তার সাথে ছিলেন খোকন সহ আরো অনেকে। এল্লারচর স্টীমার ঘাট নৌ টার্মিনাল তখন সাতক্ষীরা থেকে খুলনা বা ঢাকায় যাওয়ার এক মাত্র পথই ছিলো ওটাই।