আট নম্বর সেক্টর আর্মির ইতিবৃত্ত


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৭ ||

মীর রিয়াছাত আলী

১৯৭১ সালের ৭ মার্চে সোমালিয়ায় বসে ‘বঙ্গবন্ধু’র’’ ভাষণ শুনে মনটা বড় ব্যাকুল হয়ে উঠল। অবশ্য পূর্ব থেকেই আমরা প্রস্তুত ছিলাম। শুধু অপেক্ষা করেছিলাম ৭ মার্চের ভাষণের। আর যেভাবেই হোক আমি ১৭ মার্চ দেশের মাটিতে পা রেখে দেখলাম ঢাকার রাস্তাঘাট শূন্য। তবুও কোন মতে একটি রিকশা জোগাড় করে সায়েন্স ল্যাবরেটরীতে আমার বন্ধুর বাসায় যেয়ে শুনলাম আমার বন্ধু দেশে চলে গেছে। ঢাকা থেকে রাত ১০টার ট্রেনে চড়ে ঈশ্বরদী এবং যশোর হয়ে আমি চলে আসলাম সাতক্ষীরার বাড়িতে ১৯ তারিখে পোঁছালাম। আর ২১তারিখ খুলনায় গেলাম পরিস্থিত জানবার জন্য। সেখানে যেয়ে শুনলাম ২৩ শে মার্চ খুলনায় পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে ফেলা হবে। সে সময় আমার সাথে আমার মা ছিলেন। মাকে নিয়ে ২২ তারিখে সাতক্ষীরায় চলে আসলাম। থানার পামেই বাড়ি। থানা কর্তৃপক্ষ জানত আমি নিজ বাড়িতে এসেছি। সে সুযোগ এলো ২৫ মার্চের কালো রাতে। মধ্যরাতে থানা থেকে লোক এসেছে আমাকে ডাকতে। আমি তাদের সাথে থানায় গেলাম। সেখানে আমার বড় ভাই ইসু মিয়া, চেয়ারম্যান এম এ গফুর, রুহুল আমিন, সাকী উপস্থিত ছিলেন এবং সকলের সামনে থানার দারোগা আমাকে বসতে দিলেন। আমি ওয়্যারলেস সেটের কাছে বসে ম্যাসেজ শুনতে লাগলাম, কিন্তু দেখলাম কোনো কনক্রিট রিপলাই দিচ্চে না। আমি তখন অপারেটরকে বললাম বঙ্গবন্ধুর বাসায় কোনো পোস্ট আছে কিনা, যদি থাকে তার পজিশন জানার জন্য ঐ টাই ধরেন। আমি তখন সেট নিয়ে কথা বলছি এবং তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কোথা থেকে, কে বলছেন? উত্তরে তিনি বললেন, আমি বঙ্গবন্ধুর বাসার পেছনের বাগানের একটি দো-চালা ঘরের পোস্ট এম-১। আমার নাম মান্নান। আমি ওয়্যারলেস অপারেটর। আমার সাথে একজন হাবিলদার আছে। আমি তাকে প্রশ্নের মাধ্যমে শেখ সাহেবের অবস্থান জানতে চেয়েছিলাম? তিনি উত্তরে আমাকে বললেন উনাকে পাকিস্তান আর্মিরা  রাত প্রায় ১২টার দিকে ধরে নিয়ে গেছে। এখন আমরা কি করবো? তখন আমি বললাম তোমরা সেট ফেলে ইউনির্ফোম চেঞ্জ করে যেভাবে পার নিজের আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে যাও এবং বড় যুরেও জন্য প্রস্তুতি নাও। তারপর তিনি ইয়েস স্যার বলে সেট ছেড়ে দেন। আর যোগাযোগ হয়নি। ২৬মার্চ সকাল ১১টার দিকে বড় ভাইয়ের এক বন্ধু ই.পি.আর এর নায়েব সুবেদার আইয়ুব সাতক্ষীরা থানায় আসেন। আমার বড় ভাই আমাকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। সাথে সাথে আমার মাথার খেলে গেলো তাকে সামনে রেখে কাজ করা যাবে। আমি বিন্দুমাত্র অপেক্ষা না করে আইয়ুব ভাইকে বললাম, আপনি উইন্স এ যত ই.পি.আর আছে সবাইকে করুন। সমস্ত বি.ও.পি থেকে ই.পি.আর ক্লোজ করে আনা হল। ই.পি.আর ক্যাম্পে একটি রুমকে কন্ট্রোল রুম করলাম। এক পাকিস্তানী ক্যাপ্টেন ছিল বুঝতে পেরে সে জীপ নিয়ে বেলা ১১টার মধ্যে পালিয়ে যশোর ক্যান্টনমেন্টে চলে যায়। সবাই যখন সাতক্ষীরা হেড কোয়াটারে পোঁছে গেছে সবাই কে করার পর দেখলাম এক কোম্পানী হয়েছে আমি ও আইয়ুব ভাই যশোর ক্যান্টনমেন্ট এ্যাটাক করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। আমরা ২৭ মার্চ রাতে দক্ষিণ দিক থেকে যশোর ক্যান্টনমেন্ট এ্যাটাক করলাম এবং ই.পি.আর যশোর হেড কোর্য়াটারের সাথে যোগাযোগ করি এবং যারা আমাদের এ্যাটাক করার কথা বলে তাদেরকে এ্যাটাক করতে বলি এবং পশ্চিম দিকে কে আছে জানতে চাইলে চুয়াডাঙ্গা মেজর আবু ওসমান চৌধুরী আছেন। তাকেই আমাদের সাথে লড়াইয়ের জন্য পশ্চিম দিক থেকে এ্যাটাক করার জন্য বলি। মেজর আবু ওসমান চৌধুরী ২৮ তারিখে সকালে পশ্চিম দিক থেকে যশোর ক্যান্টনমেন্ট এ্যাটাক করেন এবং সাত দিন অবরোধ করে রাখি এবং এর মাঝে বি.এস.এফ এর সাথে যোগাযোগ করি। ২৯ মার্চ ব্যাটেলিয়ান কমান্ডিং অফিসার কর্নেল কে গুলির স্যম্পেল দেই। পরের দিন ৩০০০ হাজার ৩০৩ এর বুলেট ও চারটি ৮এমএম এস.এম.জি ও কিছু গুলি পাই। ২৯ তারিখে ই.পি.আর হেড কোর্য়াটার যশোরে যাই। সেখানে চারটি ৬ পাউন্ডার ছিল। ঐ চার এর মধ্যে ২টি অকেজো হয়ে যায়। যশোর টাউন হলে যাওয়ার সময় ধান ক্ষেতের কালভাটের পার্শ্বে অসংখ্য লাশ পড়ে থাকতে দেখি। যশোরের বিহারীরা আশ্রয় নিয়েছে ক্যান্টনমেন্টের পূর্ব, পশ্চিম এবং দক্ষিণ দিক থেকে অবরোধ করে রাখা হয়েছিল। পাকিস্তান বাহিনীর কাছে ভারী দুরপাল¬ার কামান থাকা সত্বেও রাইফেলের আগাই আমরা সাত দিন ক্যান্টনমেন্ট অবরোধ করে ৩ এপ্রিল পিছিয়ে আসি, পেছাতে পেছাতে আমরা বেনাপোলে চলে যাই। যশোর থেকে ফিরে আসার সময় ৩০জনের একটি গ্রুপ বেনাপোলের পরিবর্তে সুবেদার আইয়ুবের নেতৃত্ব সাতক্ষীরায় চলে আসে। অবশ্য বেনাপোলে আমার মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর সাথে পরিচয় হয় এবং আমার কোম্পানী মেজর ওসমানের কাছে রেখে আমুদে বর্ডার দিয়ে সাতক্ষীরায় চলে আসি।
সাতক্ষীরায় ফিরে এসে এক সাথে বেশ কতগুলো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এস.ডি.ও পাকিস্তানী ছিল, তাকে সাথে নিয়ে ট্রেজারী ভেঙ্গে আর্মস এমুনিশন নেওয়া হয় এবং তাকে আটকাবার চেষ্টা করলে চেয়ারম্যান গফুর তার বাড়িতে রাখবেন বলেন। এদিকে খুলনা থেকে আগত এম.এন.এ গফুর ও বরিশাল আওয়ামী লীগের এম.এন.এ এড. নুরুল ইসলাম মঞ্জু আমাদের সাথে যোগ দেন। নায়েব সুবেদার আইয়ুবসহ ৩০ জন ই.পি.আর এর কিছু  ছাত্র তার মধ্যে রবি, এনামুল, কাজল, হাবলু মিলে ন্যাশনাল ব্যাংক ভেঙ্গে এক কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা ও যথেষ্ট পরিমাণ সোনা গহনা ৬ ই এপ্রিল বশিরহাট এস.ডি.ও এর মাধ্যমে সে রিজার্ভ ব্যাংক ইন্ডিয়াতে জমা করা হয় এবং সাতক্ষীরা এস.ডি.ও কে ইন্ডিয়ার কাছে তুলে দেওয়া হয়। প্রথম থেকেই আমি মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ রেখেই চলেছি। টাকা জমা দিয়ে আর সাতক্ষীরায় আসা হল না। যেহেতু সাতক্ষীরায় পাকিস্তানী আর্মি এসে গেছে। ভোমরা কাষ্টমস্ অফিসে ক্যাম্প করলাম। বর্ডারের খালের ধারে ভেঁড়িবাঁধের উপর বাঙ্কার করলাম। পাকিস্তানীরা আমাদের থেকে তিন চার মাইল দুরে আলীপুরে আর্টিলারীসহ ক্যাম্প করে। ১৩ মে হঠাৎ আমাদের পজিশনের উপর পাকিস্তানী সেনারা আক্রমণ করে। সে আক্রমণে লেফট ফ্লাঙ্কে ই.পি.আর এর এল.জি.এম ম্যান ইস্যু মিয়া (বাড়ি সিলেট) মারা যায় এবং আমরা কয়েকজন ছাড়া যুদ্ধের পজিশন ছেড়ে রঙ্গিন টিনের বাস্ক নিয়ে সবাই দৌড়াদৌড়ি করছিলাম। ইস্যু মিয়ার পাজরের মধ্যে গুলির পরিবর্তে ১২হাজার টাকা পাওয়া যায়। তখন আমার টনক নড়ল এবং সন্দেহ হলো বাস্ক এর মধ্যে টাকা গহনা আছে এবং এদের দিয়ে যুদ্ধ করা সম্ভব হবে না।
কাউকে কিছু না বলে মেজর আবু ওসমান চৌধুরী ওয়্যারলেস করে আমার সাথে ঘোজাডাঙ্গায় ফোর্টো উইথ দেখা করতে বলি। অবশ্য আবু ওসমান চৌধুরী ম্যাসেজ পেয়েই পরের দিন সকাল ১০টায় আসেন। তাকে আলাদা ভাবে সকল ঘটনা বলে আমি এদেরকে চাই না বলে দেই। পরামর্শে এই সিদ্ধান্ত হয় আগামীকাল এক প¬াটুন এখানে আসবে। পুরাতন যারা আছে তারা এক সপ্তাহ এক নাগাড়ে ডিউটি করবে। পরের সপ্তাহে নতুন প্ল¬াটুন ডিউটি করবে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে বাকি লোক এসে যাবে। আমার ডিমান্ড ছিল মোট এক কোম্পানীর। পুরাতন লোকদের পুরা প্রোগ্রাম জানিয়ে দেওয়া হল, তারা খুবই খুশি। কয়েকদিন পরে মেজর আবু ওসমান চৌধুরী ৪০ জন লোক ই.পি.আর সদস্যসহ অস্ত্র এবং ৪ জন এল.এম.জি ম্যানসহ এলেন। নতুন লোক যার যার আর্মস নিয়ে চলে গেলেন। পুরাতনরা ফিরে এলে তাদেরকে রাইফেল জমা দিয়ে মাঠে এসে বসতে বলা হয়। এবং তাদের সকলকে বলা হয় মেজর আবু ওসমান চৌধুরী আপনাদের উদ্দেশ্য কিছু বলবেন। পরে তারা রাইফেল জমা দিয়ে মাঠে এসে বসে। সাথে সাথে চার জন এল.এম.জি ম্যান চার কোণে পজিশন নেয়। এক এক করে প্রত্যেকের কাছ থেকে চাবি নিয়ে তাদের বাস্ক খুলে এই ত্রিশ জনের কাছ থেকে বিশ লক্ষ হাজার টাকা এবং অনেক সোনার গোহনা উদ্দার করে মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর সাহায্যে বাংলাদেশের একাউন্টে জমা দেওয়ার জন্য পাঠায়। এবং নায়েব সুবেদার আইয়ুব সহ এই ত্রিশ জন ই.পি.আরকে মেজর ওসমান চৌধুরী নিয়ে চলে যান। ই.পি.আর দের কন্টোল করার জন্য একজন ক্যাপ্টেন চেয়ে পাঠায়। কয়েক দিন পর মেজর আবু ওসমান চৌধুরী ফুল কোম্পানীর সাথে ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিনকে পাঠিয়ে দেন।
২৪ জুন ভোর সাড়ে তিনটায় পাকিস্তানী বাহিনী দ্বিতীয় বার আমাদের উপর বড় ধরণের আক্রমণ করে। এই আক্রমণে আমাদের পজিশন ভাল ছিল। আমাদের পিছনে ছিল ইন্ডিয়ান আর্টিলারী। কথা ছিল তারা দুইশত শেলিং করবে এবং কভারিং দেবে। তারা সকাল ৭টা পর্যন্ত ৩০টা শেলিং করার পর আর্টিলারী ফায়ারিং বন্ধ করে দেয়। আমি ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিনকে ফ্রন্টে রেখে জীপ নিয়ে গিয়ে দেখি ইন্ডিয়ান আর্মি এর ডোগড়া রেজিমেন্টের মেজর জামাল গান রেখে ফোর্স নিয়ে চলে গেছে। ফিরে এসে তেঁতুলিয়া ব্রিজে সেকেন্ড গ্রুপ ছিল, তাদেরকে কভারিং এর কথা বলায় তারা ব্যবস্থা করে। কিন্তু খুবই ধীরে ধীরে বিকাল ৫টা পর্যন্ত যুদ্ধ চলে এবং এই যুদ্ধে পাকিস্তানীদের ট্রাক ভরে লাশ গেছে। আমরা লস করেছি ২ জন তাও আবার পাকিস্তানীদের তিনটা লাশ আনতে গিয়ে। তাদের মদ্যে একজনের নাম কাসেম এবং অপর দুইজন ই.পি.আর এর লোক। অল্প সময়ের মধ্যে এই খবর কলকাতা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানী আর্মির লাশ দেখার জন্য অত্যধিক মানুষের ভীড় দেখা যায়। এই তিনটি লাশের মধ্যে একজন ক্যাপ্টেন, একজন সুবেদার ও একজন সিপাই। সন্ধ্যায় কলকাতা থেকে প্রধান সেনাপতি জেনারের ওসমানী, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ আরো অনেক ব্যক্তি লাশ দেখার জন্য আসে এবং আমাদের বাহ বা ও উৎসাহ দেন।
পারুলিয়া ব্রিজ ভাঙ্গার জন্য পথে এন্টি ট্যাঙ্ক মাইন বসানো হয়। যার দ্বারা সাতক্ষীরা চেয়ারম্যান গফুর এর বড় ছেলে সিরাজ পাকিস্তানীদের সাথে দালালি করতে যেয়ে পথিমধ্যে এক পা হারায়। এরই মধ্যে দিন রাত ২৪ ঘন্টা বিভিন্ন জায়গা অপারেশন করে পাকিস্তানীদের মনোবল চূর্ণ-বিচূর্ণ করতে থাকে।
ইতোমধ্যে ক্যাম্পে খবর এলো কমিশন দেওয়া হবে। তার জন্য কল্যাণীতে পরীক্ষা দিতে হবে। আমি ও যশোরের একটি ছেলে নজরুল উভয়ের কমিশন র‌্যাঙ্ক এর পরীক্ষা দেওয়ার জন্য কল্যাণীতে গিয়েছিলাম। সেখানে বহু লোক আটটি সেক্টর থেকে পরীক্ষা দিতে এসেছে। তার মধ্যে নজরুল অস্টম এবং আমি ষোড়শ তম স্থান অর্জন করি। নজরুল সরাসরি আর্মিতে চলে যায় এবং আমাকে লেফটেন্ট্যা র‌্যাঙ্ক নিয়ে দশ নম্বর সেক্টরে নৌ বাহিনী গঠনের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়।