শিক্ষা সংস্কার ও বাংলা সাহিত্যে হযরত খানবাদুর আহ্ছানউল্লা (রহ.) এর অবদান


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৭ ||

মো. আবদুর রহমান
হযরত খানবাহাদুর আহছানউল্লা (রহ.) ছিলেন বহুমুখি প্রতিভার অধিকারী একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, ধর্মতত্ত্ববিদ এবং সমাজ সেবক। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন একজন সুফি সাধক। হযরত খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রহ.) ছিলেন নীরব সাধক ও আত্মাপ্রচার বিমুখ কর্মবীর।
তিনি ১৮৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসের কোন এক শনিবার প্রত্যুষে সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা গ্রামে এক ধার্মিক ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুন্সী মো. মফিজ উদ্দিন এবং মায়ের নাম মোছা. আমিনা বেগম। তাঁর পিতা একজন ধার্মিক, ঐশ্বর্য্যবান ও দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর পিতামহ মো. দানেশও একজন ধর্মপ্রাণ ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন।
হযরত খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রহ.) ছিলেন পিতামহের একমাত্র পুত্রের জ্যেষ্ঠ সন্তান। ফলে তাঁর শিক্ষার জন্য পিতা ও পিতামহের আপ্রাণ চেষ্টা ও আগ্রহ ছিল। তাঁর বয়স পাঁচ বছর পূর্ণ না হতেই প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় মতিলাল ভঞ্জ চৌধুরী নামে একজন গ্রাম্য পন্ডিতের কাছে। ১৮৮১ সালে তিনি ‘গ-মিতিয়’ (বর্তমান দ্বিতীয় শ্রেণির সমমান) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একটি রূপার মুদ্রা পুরস্কার পান। এরূপে পাঠশালা শিক্ষা শেষ করে তিনি নলতার মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয় হতে তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ ভাগ অধ্যয়ন করেন। এরপর তিনি ভারতের টাকী গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে চতুর্থ (বর্তমান সপ্তম) শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৮৮৮ সালের শেষ ভাগে কলকাতায় (ভবানীপুর) লন্ডন মিশন সোসাইটি ইনস্টিটিউশনে সেকেন্ড ক্লাসে (বর্তমানে নবম শ্রেণি) ভর্তি হন এবং এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ১৮৯০ সালে কৃতিত্বের সাথে এন্ট্রাস (বর্তমানে এস.এস.সি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ও বৃত্তি লাভ করেন। তিনি হুগলী কলেজ থেকে ১৮৯২ সালে এফ.এ (বর্তমানে এইচ. এস. সি) এবং ১৮৯৪ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সাফল্যের সাথে বি. এ পাশ করেন। আর ১৮৯৫ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দর্শন শাস্ত্রে এম. এ ডিগ্রী লাভ করেন।
শিক্ষা জীবন শেষ করে তিনি ১৮৯৬ সালে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে মাসিক ২ হাজার টাকা বেতনের চাকরির প্রস্তাবে রাজি না হয়ে তিনি মাসিক ৫০ টাকা বেতনে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে ‘সুপার নিউমারারি’ (অতিরিক্ত) শিক্ষক হিসেবে তাঁর চাকরি জীবন শুরু করেন। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তিনি রাজবাড়িতে স্কুল সাব-ইন্সপেক্টর, এর ছয় মাসের মধ্যে ফরিদপুরে অতিরিক্ত ডেপুটি ইন্সপেক্টর অব স্কুলস হিসেবে পদোন্নতি পান। এরপর বাকেরগঞ্জের ডেপুটি ইন্সপেক্টরের স্থায়ী পদে বদলি হন। একাধিক্রমে তিনি ৭ বছর বরিশালে অবস্থান করেন। ১৯০৪ সালে তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের হেড মাস্টার পদে নিয়োগ পান। ১৯০৭ সালে তাকে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় ইন্সপেক্টর অব স্কুলস্ পদে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯১২ সালে প্রেসিডেন্সি ডিভিশনে অতিরিক্ত ইন্সপেক্টরের দায়িত্ব নিয়ে তিনি কলকাতায় যান। ১৯১৯ সালে তিনি আবার চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় ইন্সপেক্টর পদে বদলী হন।
১৯২৪ সালে তিনি অবিভক্ত বাংলা ও আসামের শিক্ষা বিভাগে সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ লাভ করেন। পাঁচ বছর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। হজরত খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রহ.) এর শিক্ষা বিভাগের সহকারী পরিচালক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তি ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার মুসলিম ইতিহাসে এক নতুন মাইল ফলক। একজন  সাধারণ শিক্ষক থেকে শিক্ষা বিভাগের সর্বোচ্চ পদে আসন গ্রহণ পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠার এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমা ছিল সত্যিই অনন্য। তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত থাকাকালে এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন ও সংস্কার সাধন করেন। ১৯২৯ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
হযরত খানবাহাদুর আহছানউল্লা (রহ.) এর দীর্ঘ চাকরি জীবনের সম্পূর্ণটাই কেটেছে শিক্ষা বিভাগে। তাঁর এই দীর্ঘ সময়ের দিনগুলো ছিল বর্ণাঢ্য, পরিশ্রম ও সাফল্যের সমাহার। অফিসের প্রতিটি দায়িত্ব যথাযথভাবে সম্পাদন করাকে তিনি ধর্ম পালনের অংশ হিসেবে মনে করতেন। তিনি যখন যেখানে যে দায়িত্ব থাকতেন সে অঞ্চলের শিক্ষা প্রসারের জন্য সার্বিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতেন। পাশাপাশি সমাজ সংস্কার তথা সমাজের সার্বিক উন্নয়নের প্রতিও তিনি ছিলেন সচেষ্ট। আধ্যাত্মচর্চা ও অধ্যাত্মিক জীবন-যাপনের প্রতি বাল্যকাল থেকেই তাঁর প্রবল আকর্ষণ লক্ষণীয়। তিনি রাজবাড়ির অতিরিক্ত ডেপুটি ইন্সপেক্টর থাকাকালীন পায়ে হেঁটে মফস্বলে স্কুল পরিদর্শন করতেন। কখনো কখনো তাকে রমজান মাসে ২০ মাইল পর্যন্ত হাঁটতে হয়েছে।
অবিভক্ত বাংলা ও আসামে শিক্ষা বিভাগের সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার সময় খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রহ.) বহুমুখি শিক্ষা সংস্কার করে মুসলমানদের শিক্ষা গ্রহণের পথ সুগম করেন। এ সময় তিনি অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হোস্টেল প্রতিষ্ঠা করেন। কর্মজীবনের শুরুতেই ১৯০৪ সালে মুসলমান ছাত্রদের আবাসিক সমস্যা সমাধানের লক্ষে অনেক প্রতিকূলতার মাঝে তিনি রাজশাহীতে ফুলার হোস্টেল প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। হোস্টেলটি রাজশাহীর মুসলিম শিক্ষা প্রসারে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কলকাতায় মুসলিম ছাত্রদের জন্য বেকার হোস্টেল, টেলার হোস্টেল, কারমাইকেল হোস্টেল ও মুসলিম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ১৯২৮ সালে কলকতায় মুসলিম অ্যাংলো ওরিয়েটাল গার্লস কলেজ প্রতিষ্ঠায়ও তাঁর প্রশংসনীয় অবদান রয়েছে। এছাড়াও তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুলগুলোর মধ্যে রয়েছে-গভর্নমেন্ট মুসলিম হাইস্কুল, চট্টগ্রাম (১৯০৯), মাধবপুর শেখ লাল হাইস্কুল, কুমিল্লা (১৯১১), রায়পুর কে,সি হাইস্কুল (১৯১২), চান্দিনা পাইলট হাইস্কুল, কুমিল্লা (১৯১৬), কুটি অটল বিহারী হাইস্কুল, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া (১৯১৮), রেলওয়ে সরকারি হাইস্কুল, ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়া (১৯২০), চন্দনা কে. বি হাইস্কুল, কুমিল্লা (১৯২০) ও চৌদ্দগ্রাম এইচ. জে পাইলট হাইস্কুল (১৯২১) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রহ.) ছিলেন পরীক্ষার খাতায় পরীক্ষার্থীর নামের পরিবর্তে রোল নম্বর লেখার প্রবর্তক। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক পরীক্ষার খাতায় পরীক্ষার্থীর নাম লেখার রীতি প্রচলিত ছিল। ফলে কলিকাতা বিশ্বাবদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্ররা ভালো পরীক্ষা দিয়েও শীর্ষ মেধাস্থান বা প্রথম বিভাগ পেতো না সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণে। খানবাহাদুর আহছানউল্লা (রহ.) এর উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় প্রথমে অনার্স ও এম. এ পরীক্ষার উত্তরপত্রে পরীক্ষার্থীর নামের পরিবর্তে রোল নম্বর লেখার পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়। পরবর্তীতে আই. এ এবং বি. এ পরীক্ষার ক্ষেত্রেও রোল নম্বর লেখার পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়। সে সময় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের মাদ্রাসা পাশ করা ছাত্ররা কলেজে ভর্তি হতে পারতো না। তিনি স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষার মান সমন্বয় করেন। ফলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়। এছাড়া সে সময় সব স্কুল-কলেজে মৌলবির পদ ছিল না। তিনি সব স্কুল-কলেজে মৌলবির পদ সৃষ্টি করেন এবং পন্ডিত ও মৌলবির বেতনের বৈষম্য রহিত করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার খসড়া বিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেটে উত্থাপনের পর দারুণ বিরোধ সৃষ্টি হয়। পরে তা বিবেচনার জন একটি স্পেশাল কমিটি গঠিত হয়। খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রহ.) এই কমিটির সদস্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অবিস্মরনীয় অবদান রাখেন। এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটে আরো বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তাঁর। যা এদেশের মানুষ চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। তৎকালীন সরকার মুসলিম শিক্ষার ভার হযরত খানবাহাদুর আহাছানউল্লা (রহ.) ওপর ন্যস্ত করেন। ফলে বহু মক্তব, মাদ্রাসা, মুসলিম হাইস্কুল এবং কলেজ তাঁরই তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়াও অমুসলিম স্কুলে মুসলিম শিক্ষকের নিযুক্তি এবং অন্যান্য সরকারি বিভাগে মুসলিম কর্মচারী নিয়োগ তাঁর হাতেই ন্যস্ত ছিল। এই সুযোগ তিনি স্বতন্ত্র মক্তব পাঠ্য নির্বাচন ও মুসলিম ছাত্রদের শিক্ষার জন্য একমাত্র মুসলিম লেখকের প্রনীত পুস্তক প্রচলনের নিয়ম প্রবর্তন করেন এবং সরকারের অনুমতি নেন। ফলে মুসলিম শিক্ষায় নব প্রেরণা আসে। হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলিম শিক্ষার্থী সমভাবে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ লাভ করে।
তাঁর প্রচেষ্টায় মুসলিম ছাত্রদের জন্য বৃত্তির ধারা নির্দিষ্ট হয়। বিদ্যালয়ের সকল শ্রেণির বৃত্তি বন্টনের পূর্বে তাঁর মতামত গ্রহণ করা হত। এছাড়া পরীক্ষকদের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা নির্ধারিত হয়। মুসলমানদের জন্যও বৃত্তির পরিমাণ বর্ধিত হয়। তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুসলিম ছাত্রের বৃত্তির আনুপাতিক সংখ্যা নির্ধারণ ও দরিদ্র ছাত্রদের বর্ধিত হারে বিনা বেতনে শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করেন। মুসলিম লেখকদের পাঠ্য পুস্তক লেখার সুযোগ দেওয়া হত। ফলে মুসলিম সাহিত্যের বিপুল প্রসার লাভ করে। মুসলমান সাহিত্যিকগণ নতুন প্রেরণা পান। বৈদেশিক শিক্ষার জন্য মুসলিম শিক্ষার্থীদের সাহায্য প্রদানের নিয়ম নির্ধারিত হয়। টেক্সটবুক কমিটিতে মুসলমান সদস্য নিযুক্ত হয় এবং মুসলিম পাঠ্যে ইসলামী শব্দ প্রয়োগ হতে থাকে। মুসলিম নারীদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিশেষ বিশেষ স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পরবর্তী যুগের খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের মধ্যে আহ্ছানউল্লা (রহ.) অন্যতম। তিনি জীবনী, ইতিহাস, কোরআন ও হাদিস, ইসলামি বিধান, তাছাওয়াফ ভাষা ও সাহিত্য, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষানীতি বিভিন্ন ধর্মের আলোচনা, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ কাহিনী, কবিতা, শিশু সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়ের ওপর বহু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। আহ্ছানউল্লা (রহ.) দর্শনের ছাত্র হলেও ইতিহাস, সমাজ চিন্তা, পত্র সাহিত্য, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞান, সৃষ্টিতত্ত্ব, শিশুপাঠ্য, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, তাছাউফ ইত্যাদি ছিল তার লেখার বিষয়বস্তু। জাতীয় জীবনের পুর্ণজাগরণের পথ প্রশস্ত করাই ছিল তাঁর সাহিত্যের মূল বৈশিষ্ট্য। ঐতিহ্য, আধুনিকতা আর মুক্ত ধর্মীয় চেতনা ছিল তাঁর পুর্ণজাগরণের প্রধান উদ্দীপক। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হলো: হযরত মোহাম্মাদ (সা.), ইসলামের দান, মোসলেম জগতের ইতিহাস, ঐরংঃড়ৎু ড়ভ ঃযব গঁংষরস ড়িৎষফ, আমার জীবন ধারা, আমার শিক্ষা ও দীক্ষা, তরীকত শিক্ষা, ভক্তের পত্র, মোছলেমের নিত্য জ্ঞাতব্য, মহাপুরুষদের অমিয় বাণী, স্মৃতিতে ছুফী সাধক, বঙ্গভাষা ও মুসলিম সাহিত্য, টিচারর্স ম্যানুয়েল, সৃষ্টিতত্ত্ব, হেজাজ ভ্রমণ, আহ্ছানিয়া মিশনের মত ও পথ, পেয়ারা নবী, ইছলাম ও আদর্শ মহাপুরুষ, শিক্ষা ক্ষেত্রে বঙ্গীয় মোছলমান, আউলিয়া চরিত্র, আল-ওয়ারেছ, বাংলা মৌলুদ শরীফ, বাংলা হাদিছ শরীফ (১ম ও ২য় খন্ড), পাঁচ ছুরা ইত্যাদি।
শুধু নিজের লেখা সাহিত্য নয়, নতুন নতুন লেখক তৈরির জন্য তিনি কলকাতায় ১৯১৫ সালে মখদুমি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। এ লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা মুসলিম শিক্ষা ও সাহিত্য বিস্তারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। মখদুমি লাইব্রেরির উৎসাহ ও উদ্দীপনায় অনেক মুসলমান লেখক সৃজনশীন লেখার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। বহু সাহিত্যিক, লেখক ও কবি এই লাইব্রেরির সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েন। তৎকালীন আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ‘আনোয়ারা’ ও ‘বিষাদ সিন্ধু’ এই লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিত হয়। এছাড়াও এই লাইব্রেরি থেকে কাজী নজরুল ইসলামের ‘জুলফিকার’ ‘বনগীতি’, কাব্য আমপারা’, খ্যাতনামা কথা শিল্পী আবু জাফর শামসুদ্দিনের ‘পরিত্যক্ত স্বামী’, সৈয়দ আলী আহ্ছানের ‘নজরুল ইসলাম’ আশরাফ উজ-জামানের ‘খেয়া নৌকার মাঝি’ শেখ হাবিবুর রহমানের ‘বাঁশরী’ ‘নিয়ামত’ প্রভৃতি বই প্রকাশিত হয়। এই লাইব্রেরি থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণির বহু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। শুধু তাই নয় অনেক নতুন লেখকের লেখা গ্রন্থও এখান থেকে প্রকাশিত হয়। মখদুমি লাইব্রেরির কার্যক্রম তৎকালীন মুসলিম সমাজে সাহিত্য সৃষ্টি ও সাহিত্য প্রসারের ক্ষেত্রে একটি দ্রুত ও মৌলিক পরিবর্তন আনতে সমর্থ হয়েছিল। মখদুমি লাইব্রেরি ছাড়াও খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লার (রহ.) পৃষ্ঠপোষকতায় আহ্ছানউল্লা বুক হাউজ, প্রভিন্সিয়াল লাইব্রেরি ও ইসলামিয়া লাইব্রেরির মতো প্রচুর প্রকাশনা সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় মুসলিম লেখক-সাহিত্যিকরা প্রেরণা লাভ করেন।
হজরত খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রহ.) তাঁর কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা ও প্রতিভার বিরল স্বীকৃতি অল্প সময়ের মধ্যেই অর্জন করেন। ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক তাঁকে ‘খানবাহাদুর’ উপাধি প্রদান করা হয়। তিনি চাকরিতে প্রবেশের মাত্র ১৫ বছরের মধ্যে এ সাফল্য অর্জন করেন। ১৯১১ সালে তিনি জড়ুধষ ঝড়পরবঃু ভড়ৎ বহপড়ঁৎধমবসবহঃ ড়ভ ধৎঃং, সধহঁভধপঃঁৎবং ্ পড়সসবৎপব এর সদস্য পদ লাভ করেন। ১৯১৭-১৮ সালে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ১৯১৯ সালে প্রথম মুসলমান হিসেবে ইন্ডিয়ান এডুকেশন সার্ভিসভুক্ত (আই,ই,এস) হন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এক দশকেরও বেশি সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোর্টের (বর্তমান সিনেট) সদস্য ছিলেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি লগ্নে ড. নাখান সাহেবের অধীনে ঞবধপযরহম কমিটির সদস্য ছিলেন। বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্ট ও বহুমুখি অবদানের স্বকৃতি স্বরূপে বাংলা একাডেমি তাঁকে ১৯৬০ সালে সম্মানসূচক ‘ফেলোশিপ’ প্রদান করেন। সমাজ সেবা ও সমাজ সংস্কৃতিতে বিশেষ করে দীন প্রচারের কাজে অবিস্মরনীয় অবদানের জন্য ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ তাঁকে ১৯৮৬ সালে মরণোত্তর পুরস্কারে ভূষিত করে। লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা