হজরত খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রঃ) ছিলেন একজন সুফি সাধক


প্রকাশিত : মার্চ ২, ২০১৭ ||

মো. আবদুর রহমান
হজরত খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রহ.) ছিলেন একজন মাদারজাত (জন্মগত) আউলিয়া। বিশিষ্ট মহাপুরুষগণের ন্যায় তাঁর জন্মের বহু পূর্বে তাঁর আগমনের ভবিষ্যৎবানী প্রচার হয়েছিল। তাঁর জন্মের পর উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থা ও পারিবারিক কাঠামোর সৌকর্য। বাল্যকাল থেকে তিনি ছিলেন স্বাতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। চাকরি জীবনে দিনে ব্যস্ত থাকতেন সরকারি কাজে আর রাতে হতেন গভীর আরাধনায় নিমগ্ন। কখনে ধর্মালোচনায় এবং ধর্মীয় সংগীতে (গজল) ব্যাপৃত হতেন। চট্টগ্রামে অবস্থানকালে বেড়ে যায় তাঁর হৃদয়ের ব্যাকুলতা ও অস্থিরতা। নির্জনতা তাঁর খুব প্রিয় হয়ে ওঠে। এই ব্যাকুলতায় তাঁর পিতা-মাতা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন। এক নিদারুন ব্যাকুলতার মাঝে সময় অতিবাহিত করতে থাকেন। হঠাৎ এক রাতে স্বপ্নে সাক্ষাৎ পান এক মহাপুরুষের। স্বপ্নের এই মহপুরুষ হযরত গফুর শাহ আল-হোচ্ছামী (রহ.) এর সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ হয় ১৯০৯ সালে কুমিল্লায় ডাকবাংলোতে। হযরত গফুর শাহ আল-হোচ্ছামী (রহ.) ডাকবাংলোতে সুগন্ধভরা বেলিফুল নিয়ে আসেন এবং ফুলগুলো উপহার দেন হজরত খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রহ.) কে।
এই গফুর শাহ আল-হোচ্ছামী (রহ.) ছিলেন তার বিখ্যাত মহাপুরুষ উনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সাধক কুতুবুল আকতাব হাজী হাফেজ সৈয়দ ওয়ারেছ আলী শাহ (রহ.) এর যোগ্য শিষ্য। তিনি গফুর শাহ আল-হোচ্ছামী (রহ.) হাতে সস্ত্রীক বায়াত গ্রহণ করেন। ব্যাকুলতা প্রশমিত হয়ে শুরু হলো তাঁর নতুন যাত্রা, বলিষ্ঠ কর্মজীবনের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক সাধনার নব দিগন্ত।
হজরত খানাবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রহ.) ১৯২০ সালে তাঁর পীরে মুর্শিদ হযরত শাহ আল হোচ্ছামী (রঃ) এর সাথে পবিত্র হজব্রত পালন করেন। নিজের পীরের সাথে হজব্রত পালন দুর্লভ সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর। ক্রমান্বয়ে তিনি আধ্যাত্মিক সাধনার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেন। লয় করে দিয়েছিলেন প্রেমময়ের সেই অনন্ত সত্ত্বার সাথে নিজেকে। হজরত খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রহ.) ১৯২৯ সালে চাকরি থেকে  অবসর গ্রহনের পর বাকি জীবন কলকাতায় কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি তাঁর জন্মস্থান নলতা শরীফে প্রত্যাবর্তন করলেও আত্মপ্রচারে বিমুখ থাকেন। কিন্তু মানুষ স্বপ্নে ইঙ্গিত পেয়ে তাঁর নিকট আসতে থাকে এবং তাদের ব্যাকুলতা প্রকাশ করে। ক্রমে আগন্তকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি মানুষের মানবিক উন্নয়ন, আত্মার উন্নতি এবং তরীকতের শিক্ষা দিতে শুরু করেন। ক্রমে তাঁর রূহানী শক্তির কিঞ্চিত প্রকাশিত হলো। তিনি কখনো ভক্তদের থেকে পয়সা নিতেন না। তাঁর ভক্ত মুরিদদের সম সময় বন্ধুর মর্যাদায় অসীন করতেন। ভক্তদের সার্বিক উন্নয়নের দিকে খেয়াল রাখতেন। তিনি বলতেন-‘বাবারা-মায়েরা আমার খোদাকে চেন, খোদাকেই ইয়াদ কর’। হজরত খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রহ.) এর মধ্যে কি যেন এক মোহনী শক্তি ছিল, যার দ্বারা প্রথম দর্শনেই মানুষ মুগ্ধ হতেন ও তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়তেন। তাঁর চেহারায় ছিল সৌম্যভাব আর অসাধারণ সৌন্দর্যের আলোকচ্ছটা। অনেকেই তাঁকে একবার দেখে সারাজীবনের জন্য ভালোবেসে ফেলেছেন। তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল অভিনব। তিনি বিশ্বাস করতেন বক্তৃতা দ্বারা মানুষ তৈরি হয় না। মানুষ তৈরির জন্য চাই দৃষ্টান্ত। তিনি নিজে সকলের কাছে এক মহা আদর্শের দৃষ্টান্ত ছিলেন এবং তাঁর ভক্তদেরকেও দৃষ্টান্ত হতে উৎসাহিত করতেন।
বহুমুখি প্রতিভার অধিকারী, তীক্ষè মেধা ঐশীশক্তিসম্পন্ন, বিচক্ষণ, বিশ্লেষক, মানবদরদী সমাজকল্যাণকামী এ মনীষী তাঁর পরিচ্ছন্ন, উদার ধর্ম ও সমাজচিন্তার আলোকে সমগ্র মানবসমাজের উন্নয়ন ও আধ্যাত্মিক জীবন গঠনের মহান দায়িত্ব নিয়ে ১৯৩৫ সালে সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা শরীফ নামক গ্রামে ‘নলতা কেন্দ্রীয় আহ্ছানিয়া মিশন’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৫৮ সালে ‘ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। আহ্ছানিয়া মিশনের মূল উদ্দেশ্য ‘¯্রষ্টার এবাদত ও সৃষ্টের সেবা’। উভয় প্রতিষ্ঠান আজ জনকল্যাণমূলক কাজে দেশে একটি উল্লেখযোগ্য স্থানে অবস্থান করছে।
এই বিরল ব্যক্তিত্ব সুলতানুল আউলিয়া কুতুবুল আকতাব গওছে জামান আরেফ বিল্লাহ হজরত শাহ্ সুফী আলহাজ্জ খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রহ.) সকলকে শোক সাগরে ভাসিয়ে ১৯৬৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০:১০ মিনিটে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। তাকে তাঁর জন্মস্থান নলতায় সমাহিত করা হয়। পরে তার সমাধিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে আজকের খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা সমাধি কমপ্লেক্স বা পাক রওজা শরীফ। তাঁর সমাধি বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি। পাক রওজা শরীফটি ইতিমধ্যে একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে সকলের কাছে পরিচিতি লাভ করেছে। তাঁর রওজা শরীফকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক পরিবেশ, পাশাপাশি মানব সেবার একটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত। এটি জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকলে জন্য সদা উন্মুক্ত। নিত্যকালের তীর্থ। দেশ-বিদেশ থেকে তাঁর অসংখ্য ভক্ত ও অনুরাগীরা প্রতিদিন তাঁর রওজা শরীফ জিয়ারতের উদ্দেশ্যে নলতা শরীফে আসেন। এছাড়া প্রতি বছর ২৬, ২৭ ও ২৮ মাঘ তাঁর স্মরণার্থে নলতা শরীফে বার্ষিক ওরছ শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলনে ওরছ শরীফ পরিনত হয় ভক্ত প্রেমিকের এক মিলন মেলা।
মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু রয়ে যায় তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ ও কর্মকান্ড। আদর্শই মানুষের পথ প্রদর্শক। হজরত খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রহ.) আমাদের সম্মুখে রেখে গেছেন মহান আদর্শ। যে আদর্শিক চিন্তা-চেতনা ও জীবন দর্শনকে বহন করে চলেছে তাঁর গ্রন্থসমূহ। তাঁর এই আদর্শকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য রেখে গেছেন ‘আহ্ছানিয়া মিশন’। তাঁর মিশন, তাঁর গ্রন্থ এবং তাঁর রূহানী উপস্থিতি লক্ষ হৃদয়ের আসন গ্রহণ করে আছে। তাঁর এই ত্রিমাত্রিক উপস্থিতি বিশ্ববাসীকে অনাগতকালে সুন্দর ও কল্যানের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এটিই আমাদের প্রত্যাশা। লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা