চুকনগরে ঘ্যাংরাইল নদীটি এখন মৃত প্রায়


প্রকাশিত : March 2, 2017 ||

চুকনগর (খুলনা) প্রতিনিধি: চুকনগরে ঘ্যাংরাইল একটি নদীর নাম। এ নদীর অস্তিত্ব এখন বিলীন প্রায়। জানা যায় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক দিয়ে নদীটির গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষাবিদ ও চুকনগর ডিগ্রী কলেজের সাবেক অধ্যাপক হাসেম আলী ফকিরের বর্ণনা মতে ঘ্যাংরাইল নদীর উৎপত্তিস্থল যশোর-খুলনা জেলার সীমানা বিভাজনকারী বুড়ি-ভদ্রা নদীর খুলনা জেলার সর্ব পশ্চিমের গ্রাম নরনিয়া অলিপুর মহাশ্মশান নামক স্থান থেকে। এরপর চুকনগর পাতোখোলার বিলের মাঝামাঝি দিয়ে চুকনগর, চাকুন্দিয়া, দক্ষিণ গোবিন্দকাটি, মঠবাড়িয়া, নীচুখালি, কুলবাড়িয়া, বয়ারসিং হয়ে সরাসরি শিবসা নদীতে গিয়ে পতিত হয়েছে। এরপর নিচের দিকে বিভিন্ন নদ-নদীর সাথে মিলিত হয়ে সুন্দরবনের বুক চিরে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এই নদীটি তার অস্তিত্ব হারিয়ে এখন মৃত প্রায়। কথিত আছে এই নদীর রুপ এতটাই ভয়ংকর ছিল যে, তার নাম নিলেই মানুষ চমকে উঠত। কেননা তার ¯্রােতের বিপরীতে চলার সাধ্য মানুষের তো দূরের কথা কোন যন্ত্রযানও ছিল না। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মাষ্টার গাজী মোতাহার হোসেনের ভাষায় স্পিড বোর্ডের মত জলযানও ঘ্যাংরাইল নদীর ¯্রােতের বিপরীতে চলতে পারত না। কেননা তার ¯্রােতের গতি এত বেশি ছিল যে, যন্ত্র চালিত যানও তার ¯্রােতের কাছে অসহায় ছিল। এই ঘ্যাংরাইল নদী খুলনা সাতক্ষীরা অঞ্চলের জনপদের মানুষের একদিকে যেমন আর্শিবাদ ছিল অন্যদিকে তেমন দু:খ দুদর্শারও কারণ ছিল। তারপরও এই নদী ঘিরে এই অঞ্চলের মানুষের সভ্যতা সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। ব্যবসা বাণিজ্য সভ্যতা সংস্কৃতি এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অনবদ্য অসামান্য অবদান রাখে এই ঘ্যাংরাইল নদী। ১৯৭১সালে খুলনা জেলার সর্ব পশ্চিম সীমান্তে চুকনগর গণহত্যার চাক্ষুক সাক্ষী এই ঘ্যাংরাইল নদী। কারণ একসাথে পৃথিবীর কোন নদী এত রক্ত তার গর্ভে কোনদিন ধারণ করেননি। কিন্তু এই অঞ্চলের মানুষের দু:খ দুর্দশা কথা বিবেচনা করে পাকিস্তানী আমলে তৎকালীন সরকারের কর্ম পরিকল্পনায় মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নের লক্ষ্যে ঘ্যাংরাইল নদী বাঁধের সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। সে সময় থেকে বারবার বাঁধের উদ্যোগ নেয়া হলেও তা সফল হয়নি। পরবর্তীতে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৮১ সালে সফলভাবে কুলবাড়িয়া নামকস্থানে বাঁধ নির্মান করা হয়। এর ফলে এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের উন্নতি হলেও হারিয়ে যায় মানুষের জীবনের স্বাচ্ছন্দ। নদীর নিজস্ব উৎপাদিত মাছের বিশাল অংশ এখন আর নেই। প্রকৃতির নিময়ে এই নদী এখন আর প্রবাহিত হয় না। এই নদীটিতে বাঁধ হওয়ার পরবর্তী ৩৫ বছরে ঘ্যাংরাইল নদী আর নেই। শুষ্ক মৌসুমে নদীটি একেবারেই শুকিয়ে যায়। এ সময় মানুষ নদীর উপর দিয়ে হেটে চলাচল করে। বাঁধটির আধা কিলোমিটার অভ্যন্তরে তেলিগাতি নদীর সংযোগস্থলে দুই ফোকরের একটি স্লুইস গেট নির্মান করা হয় আবদ্ধ ঘ্যাংরাইলের পানি নিষ্কাষণের জন্য। কিন্তু সেটি মৎস্যজীবিদের ইজারা দেয়ার নাম করে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ, জনপ্রতিনিধি, অপদার্থ কিছু অসাধু কর্মকর্তার মাধ্যমে নামকাওয়ান্তে ইজারা দেয়া হয়। সেই সকল ইজাদার নিজেদের মুনাফা লাভের আশায় বছরের বেশির ভাগ সময় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে জোয়ার ভাটার পানি জোয়ান দেয়ার কারণে পানির সাথে পলি উঠে নদী ভরাট হয়ে গেছে। তাছাড়া কতিপয় স্বার্থলোভী ব্যক্তি নদীর দুই পাশে অবস্থিত খাস জমি বিভিন্ন কৌশলে সরকারের কাছ থেকে বন্দোবন্ত নিয়ে এখন সেখানে ধান রোপন ও ঘের তৈরি করছে। ফলে নদীর আকার আগের তুলনায় অনেক ছোট হয়ে গেছে। তবে বর্ষার মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলার তালা ও কলারোয়া উপজেলা, যশোর জেলা ঝিকরগাছা, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার বন্যার পানি বিভিন্ন মারফত অর্থাৎ নদী নালা খাল বিল দিয়ে এসে ঘ্যাংরাইলে পতিত হয়। বিশাল এই অঞ্চলের পানির সাথে পলি জমাট বেঁধে দীর্ঘ জলাবন্ধতার সৃষ্টি করে। কিন্তু সেটি বিবেচনা না করে খাস জমি বন্দোবন্ত নীতিমালার দোহাই দিয়ে কতিপয় অসাধু জনপতিনিধিদের মাধ্যমে নদীর উভয় চর ব্যক্তি বিশেষের মাধ্যমে বন্দোবন্ত দেয়া হয়। জানাযায় এরমধ্যে অধিকাংশ ব্যক্তি প্রভাবশালী ও ক্ষমতাশালী। তাছাড়া বর্তমানে এ নদীটিতে প্রায় শতাধিক পাটা ও ১০/২০হাত অন্তর ডালের পালা দেয়া হয়েছে। এতে করে নদীর স্বোত একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে।
তাই এই নদীটি এখনই পুনরায় খননের উদ্যোগ না নিলে এক সময়ের প্রমত্তা এই নদীটি কফিন বন্ধ হয়ে যাবে। বিশাল এই জনপদের মানুষের জীবন ও জীবিকার ক্ষতি সাধন হবে। মারাত্মক ঝুকির মধ্যে পড়বে এ অঞ্চলের অর্থনীতি। তাই সময় থাকতে এই নদী খননের উদ্যোগ যদি নেয়া না হয় তাহলে হাজার হাজার বিঘা আবাদী জমির ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে। তাই এলাকার মানুষের প্রাণের দাবি প্রভাবশালীদের কাছ থেকে নদীর চর পুনরায় উদ্ধার করে নদীটি খনন করা হোক। নদীটি খনন বাঁচানো হোক ¯্রােতস্বীনি এই ঘ্যাংরাইল নদীটি। বাঁচানো হোক এই অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে। আর এটুকুই এতদাঞ্চলের মানুষের দাবি।