আর নয় আত্মহত্যা


প্রকাশিত : মার্চ ৬, ২০১৭ ||

মো. আবদুর রহমান
যুগে যুগে যেসব মানসিক ব্যাধি ব্যক্তি ও জাতিকে ভুগিয়েছে তার মধ্যে আত্মহত্যা অন্যতম। নিজেই যখন নিজের মৃত্যুর কারণ হয়, তখন সেটাকে আমরা বলি আত্মহত্যা। কোনো কোনো সময় রাগ, ক্ষোভ, হতাশা, আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আবেগ জর্জরিত মানুষই আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যায়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ব্যর্থতাই মানুষকে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করে। আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজেকে আড়াল করা যায় কেবল; কিন্তু এর দু:খ পরিবারকে বয়ে বেড়াতে হয় সারা জীবন।
বিশ্বখ্যাত মনোবিশ্লেষক ও মনোচিকিৎসক সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, মানুষের মধ্যে অবচেতনে থাকে ‘মৃত্যু প্রবৃত্তি’- পরিবেশ পরিস্থিতির প্রভাবে এই মৃত্যু প্রবৃত্তি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে আর তখনই ‘মরিবার সাধ’ হয় তার। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের আরেক গবেষণায় দেখা যায়, মানব মস্তিষ্কের সেরিব্রোস্পাইনাল তরলের মধ্যে ‘৫ হাইড্রোক্সি ইনডোল এসেটিক এসিড’ নামক একটি রাসায়নিক পদার্থের পরিমাণ কমে গেলে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়। আত্মহত্যা করার জন্য প্রথকে বিক্ষিপ্তভাবে মনের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা আসে। এরপর এই বিক্ষিপ্ত চিন্তাগুলো বারবার আসতে থাকে। ব্যক্তি এই চিন্তা থেকে সহজে মুক্ত হতে পারে না। আত্মহত্যার চিন্তা তার স্বাভাবিক কাজকর্মের ওপর প্রভাব ফেলে এবং তার আত্মহননের ইচ্ছা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। সে ভাবে ‘কেন আমি বেঁচে থাকবো’? সে চিন্তা করে জীবনের ইতি টানার’ এবং এক সময়ে তার মনে হয় এখনই তার মরে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত সময়।
বাংলাদেশে ইদানিং আশংকাজনক হারে বাড়ছে আত্মহত্যার ঘটনা। বিষপান, গলায় আঁস লাগিয়ে, চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে, ঘুমের বড়ি খেয়ে, শরীরে আগুন লাগিয়ে এবং নদীতে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করছে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। এক তথ্যে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন নারী-পুরুষ ও শিশু আত্মহত্যা করছে। বয়স্ক নারী-পুরুষের পাশাপাশি স্কুল-কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া মেধাবী শিক্ষার্থীরাও আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এদেশে পুরুষের চেয়ে নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ও হার বেশি। পৃথিবীতে সবচেয়ে কম মানুষ আত্মহত্যা করে মিসর, জর্দান ও হাইতেতে (প্রতি বছর লাখে ০.০ থেকে ০.১ জন)।
মানুষ কেন আত্মহত্যা করে এর ব্যাখ্যা দেয়া কঠিন। তবে পরিবার থেকে মানুষ যে শিক্ষা পায় তা তার সারা জীবনের পাথেয়। পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে গেছে অনেক ক্ষেত্রে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক ক্ষুদ্র পরিবার তৈরি হচ্ছে যেখানে মায়া-মমতা ও ভালবাসার পরিবর্তে হিংসা-বিদ্বেষ ও বিষন্নতার বিষ বাষ্প ছড়িয়ে পড়েছে। সমাজস্তরের বিভাজন, ক্ষমতা লিপ্সুতা, স্বার্থচিন্তা, বিত্ত-বৈভব, অর্থ ও ক্ষমতা অর্জনের প্রতিযোগিতায় কারো সুখ নেই। এক্ষেত্রে স্বজন বিচ্ছিন্নতা কম দায়ী নয় এক্ষেত্রে। মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে। কর্মজীবী নারী-পুরুষের মধ্যে ব্যক্তিত্বের সংঘাত, বিচ্ছিন্ন বসবাস ও আস্থাহীনতাও পরস্পর বিরোধী অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে। উপরন্তু, পার্শ্ববতী দেশের টিভি সিরিয়াল গুলোর কাহিনী, পরকীয়া প্রেম, অসম কিছু করার কাহিনী আমাদের সমাজে এক ধরনের অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে। যে জীবন মানুষ যাপন করতে পারেনি সে জীবনের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক আগ্রহ থাকে। স্বপ্নে সে ঐ জীবন যাপন করতে চায় তা অসম্ভব হয়ে পড়লে আত্মহত্যা করে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার উপর ঘৃণা ছুঁড়ে দেয়। মাদকদ্রব্য ব্যবহার মানুষকে কল্পনার জগতে নিয়ে যায়। সহজলভ্য মাদকদব্য আত্মহত্যা সংঘটের উপকরণের সুলভ প্রাপ্তি ‘আত্মহত্যার’ সহায়ক হয়ে উঠেছে। নি:সঙ্গতা, বেকারত্ব, সঙ্গীর বঞ্চনা ‘আত্মহত্যা’ প্রবণতা বাড়িয়ে দিয়েছে। দাম্পত্য কলহ, সন্তানদের লেখা-পড়ার খরচ বহন করার অক্ষমতা, সামাজিক অসম পণ্য প্রাপ্তির প্রতিযোগিতা মানুষেকে অসৎ হিসেবে জীবন-যাপন করতে বাধ্য করছে। মানুষে মানুষে বিশ্বাস যোগ্যতা কমে গেছে। প্রতারণা বেড়েছে। যৌন কাতরতা মানুষের মানসিক বহুগামিতা ব্যক্তি জীবনের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
দেশে-কাল ভেদে আত্মহত্যার কারণও নানারকম হতে পারে। কোথাও হয়তো দারিদ্র্যের কারণে, কোথাও প্রাচুর্যের কারণেও হতে পারে। আমেরিকাতে যুবকদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রচন্ড প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। জাপানের স্কুলগুলোতে র‌্যাগিং সহ্য করতে না পেরে অনেক শিশু আত্মহত্যা করে। এ রকম নানা জায়গায় নানা কারণ থাকে। পাশ্চাত্যে মধ্যবয়সী বা শেষ বয়সী মানুষেরা একাকিত্বে ভোগেন-যাকে বলা হয় বসঢ়ঃু হবংঃ ংুহফৎড়সব । এই একাকিত্বের কারণে সেখানে ৪০-৫০ বছর বয়সী পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। আর বাংলাদেশে ১১-২৫ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। ইউরোপ-আমেরিকায় অবিবাহিত বা বিধবা বিপতœীকদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি হলেও বাংলাদেশে বিবাহিত নারীদের মধ্যে আত্মহত্যা তুলনামূলক বেশি। সেই সঙ্গে এদেশে কম শিক্ষিতদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি হলেও উন্নত রাষ্ট্রে শিক্ষিত পেশাজীবীদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা বেশি ঘটে থাকে।
সাধারণত দুইভাবে আত্মহত্যা সংঘটিত হয়ে থাকে। অধিকাংশই পরিকল্পনার মাধ্যমে আত্মহত্যা করে। আর একটি হলো তাৎক্ষণিক উত্তেজনা বা আবেগ তাড়িত হয়ে আত্মহত্যা। পরিকল্পনাকারীদের মনে প্রথমে আত্মহত্যার ইচ্ছা জাগে, ইচ্ছার পর পরিকল্পনা করে সে, তারপর আত্মহত্যার সিন্ধান্ত নেয়। বড় ধরণের বিষন্নতা রোগের শেষ পরিণতি হচ্ছে পরিকল্পার মাধ্যমে আত্মহত্যা। এক তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রজননক্ষ বিবাহিত নারীদের মধ্যে শহরে ১৪ শতাংশ ও গ্রামের ১১ শতাংশ নারী আত্মহত্যার কথা চিন্তা করে।
বাংলাদেশে সম্প্রতি আত্মহত্যার ঘটনা ব্যাপক হারে বাড়ছে। যেখানে প্রায় দুই দশক আগে মাঝে মধ্যে ২/১ জনের আত্মহত্যার খরব পাওয়া যেত, সেখানে এখন প্রায় প্রতিদিনই ২/১ জনের আত্মহত্যার খবর পাওয়া যায়। লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের গবেষক প্যাটেলের আশংকা, আত্মহত্যার এই পরিস্থিতির পরিবর্তন না ঘটলে আর কিছু দিনের মধ্যেই তরুণ প্রজন্মের মৃত্যুর এক নম্বর কারণ হয়ে উঠবে আত্মহত্যা। কাজেই আত্মহত্যা প্রতিরোধে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সকল ধর্মগ্রন্থে আত্মহত্যাকে মহাপাপ বলা হয়েছে। মানুষ আবেগের উত্তাপে ভরপুর। মন বহুগামী ও পরিবর্তনশীল। ধর্ম পালন অনেক খারাপ কাজ থেকে আমাদের বিরত রাখে। আমরা যে ধর্মেরই অনুসারী হই না কেন সে ধর্ম প্রতিপালনের মধ্যে আমাদের মুক্তি নিহিত আছে। নিয়মের শৃঙ্খলে আমাদের সবাইকে আবদ্ধ হতে হবে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশ নেয়া ও পরিবারের ভিত্তিটি শক্তিশালী করতে পারলে আত্মহত্যা প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তদুপরি আত্মহত্যার প্রবণতা কমিয়ে আনার জন্য উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদের দেশেও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নীতিমালা প্রয়োজন। এছাড়া বাবা-মাকে অবশ্যই তাদের সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় ও সঙ্গ দিতে হবে। সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিরাপত্তা এবং গণসচেতনা গড়ে তুলতে পারলে আত্মহত্যার প্রবণতা কমবে। তাই আসুন আমরা পৃথিবীর সকল সুন্দর উপলদ্ধি করতে শিখি, নিজেকে ভালোবাসতে শিখি। অতএব, আর নয় আত্মহত্যা সকল সমস্যাকে জয় করে এগিয়ে যাই সামনের দিকে, হাতে হাত রেখে গড়ে তুলি সুস্থ-সুন্দর নির্মল জীবন। আর কবির ভাষায় বলি;‘সুন্দর হে, দাও সুন্দর জীবন। হোক দূর অকল্যাণ সকল অশোভন’। লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা