অগ্নিঝরা মার্চ


প্রকাশিত : মার্চ ৬, ২০১৭ ||

ন্যাশনাল ডেস্ক: রক্তঝরা ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। বাঙালী জীবনের এক ঐতিহাসিক দিন। এ দিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন একটি ভিন্নমাত্রা পেয়েছিল। রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ডাকে রক্ত টগবগিয়ে উঠেছিল মুক্তিপাগল বাঙালীর। মুহূর্তেই উদ্বেল হয়ে ওঠে জনতার সমুদ্র। মুহুর্মুহু সেøাগানে কেঁপে উঠে বাংলার আকাশ। নড়ে ওঠে হাতের ঝা-ায় তাদের গর্বিত লাল-সবুজ পতাকা, পতাকার ভেতরে সোনালি রঙে আঁকা বাংলাদেশের মানচিত্র।

ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণই যে স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল তা নিজের লেখায় স্বীকার করে গেছেন তৎকালীন অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক, পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ তৎকালীন দৈনিক বাংলা পত্রিকায় ‘একটি জাতির জন্ম’ শীর্ষক প্রকাশিত জিয়াউর রহমানের লেখা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘…এদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছিল। সামরিক বাহিনীর অন্যান্য বাঙালী অফিসাররা অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। তাদের সবার মনে একটি চিন্তাই পাক খেয়ে ফিরছিল কি করা যায়? কি করবো? …এরপর এলো ৭ মার্চ। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিলেন। বললেন, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত হও। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসাররা একে অস্ত্র তুলে নেবার আহ্বান বলেই মনে করলেন।’

শুধু জিয়াউর রহমানই নয়, গোটা বাঙালী জাতিই ৭ মার্চের ভাষণে বুঝে গেলেন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক ভাষণেই মুক্তিপাগল বাঙালী জাতিকে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করেছিল। একাত্তরের ঐতিহাসিক এই দিনে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ববাংলা সমন্বয় কমিটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার লগ্নে গেরিলা যুদ্ধের আহ্বান জানায়।

কমিউনিস্ট পার্টির প্রচারপত্রে আহ্বান জানানো হয়, ‘আঘাত হানো, সশস্ত্র বিপ্লব শুরু করো, জনতার স্বাধীন পূর্ববাংলা কায়েম করো।’ পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ (মুজাফফর) পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রের জন্য ১৭ দফা প্রস্তাব দেয়। এতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারসহ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দাবি করা হয়।

৭ মার্চ ঢাকা ছিল লাখো মানুষের শহর। বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ ছুটে এসেছিল বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য। ‘বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’- সেøাগানে ঢাকা শহর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। কখন ঘটবে বিস্ফোরণ এমন একটি পরিস্থিতি বিরাজ করে সারা শহরে। শেখ মুজিব নিজ মুখে স্বাধীনতার ঘোষণা করলে তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদীর দায় চাপিয়ে নির্বিচারে বাঙালী নিধনের ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে প্রস্তুত ছিল পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সে সুযোগ দেননি হানাদারদের। টানটান উত্তেজনার মধ্যে রেসকোর্সে অনুষ্ঠিত হয় এই জনসভা।

বিচ্ছিন্নতাবাদীর দায় চাপিয়ে দেশের স্বাধীনতাকে যাতে পাকিস্তানী সামরিক জান্তারা বিলম্বিত করতে না পারে সেজন্য বঙ্গবন্ধু পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ একটি ভাষণ দেন। সরাসরি না দিয়ে বঙ্গবন্ধু পরোক্ষভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। আর বঙ্গবন্ধুর বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠে এ নির্দেশ পেয়েই নিরস্ত্র বাঙালী জাতি সশস্ত্র হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে। বাঙালীর দেশপ্রেমের অগ্নিশিখায় পরাস্ত করে প্রশিক্ষিত পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীকে। এক সাগার রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনে মহামূল্যবান স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। আর বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক এ ভাষণটি স্থান করে নিয়েছে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণের তালিকায়।