ভাই-বোনের খাবার


প্রকাশিত : মার্চ ১২, ২০১৭ ||

মো. আবদুর রহমান
হাসান ও সখিনা দু’ভাই বোন। ওদের বাবা আব্দুল লতিফ মিয়া গ্রামের একজন কৃষক। মা জাহানারা বেগম গৃহিনী। হাসানের বয়স বারো বছর। আর সখিনার বয়স এগারো বছর। হাসান গ্রামের এক হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। সখিনা স্কুলে লেখাপড়া করতে চেয়েছিল। কিন্তু তার বাবা বললেন, সখিনা তুমি তোমার মাকে সংসারের কাজে সাহায্য কর। মেয়েদের স্কুলে পড়ার দরকার নেই।
মা-বাবার সংগে দু’ভাই বোন খেতে বসে। কিন্তু ওদের মা সখিনার চেয়ে হাসানের পাতেই বেশি করে ভাল ভাল পুষ্টিকর খাবার তুলে দেন। আর বলেন, হাসান ছেলে মানুষ বড় হয়ে সে আয় রোজগার করবে। তাই তার ভাল ভাল খাবার খাওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, মেয়েরা তো বড় হয়ে আয় রোজগার করবে না। এজন্য মেয়েদের কম খেলেও চলে। ওদের মা বলেন, সখিনা সংসারের কিছু কাজকর্ম শেখো। তোমাকে তো আর কিছুদিন পর স্বামীর ঘরে যেতে হবে। এমনিভাবে ছেলে সন্তান হাসানের চেয়ে কিশোরী কন্যা সন্তান সখিনা তার শরীরের জন্য যে পরিমাণ পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার দরকার তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর ফলে সে প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে অপুষ্টিতে ভুগছে এবং স্বাস্থ্যহীন ও দুর্বল হয়ে বেড়ে উঠছে। এমনকি সখিনা শিক্ষার আলো ও অধিকার থেকেও বঞ্চিত। অথচ হাসানের মতো কিশোরী সখিনারও পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার, স্বাস্থ্য সেবা এবং আদর-যতœ ও শিক্ষা গ্রহনের সমান অধিকার রয়েছে।
বস্তুত: দারিদ্র্য, অশিক্ষা, অসচেতনতা এবং আরও নানা বৈষম্য ও অবহেলার কারণে বাংলাদেশে সখিনার মতো অসংখ্য কিশোরী কন্যা সন্তান তার সমবয়সী একজন কিশোর ছেলে সন্তানের চেয়ে কম পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার এবং স্বাস্থ্য সেবা ও যতœ পেয়ে থাকে। অথচ এসময়েই মানুষের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ পরিপূর্ণতা লাভ করে। জীবনের এই বয়ঃসন্ধিক্ষণে কিশোরীদের বাড়ন্ত শরীরে প্রয়োজন সঠিক ও পরিমাণমতো খাদ্য ও পুষ্টি এবং উপযুক্ত স্বাস্থ্য পরিচর্যা। আজকের স্বাস্থ্যবান কিশোরী মেয়েটি আগামী দিনের সুস্থ সন্তান জন্মদাত্রী। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পুষ্টি নির্ভর করছে আজকের কিশোরী মেয়ের পুষ্টির ওপর। তাই কিশোরীদের জন্য পুষ্টি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
কিশোরীর স্বাস্থ্য ভাল রাখতে হলে সঠিক ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি প্রয়োজন। বিশেষ করে কৈশোরকালীন অবস্থায় দ্রুত বৃদ্ধি পায়। দেহের কাঠামোগত বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন প্রোটিন জাতীয় পুষ্টি উপাদান। প্রোটিন ছাড়া দেহের বৃদ্ধি হয় না। আর উদ্ভিদ থেকে যে সমস্ত প্রোটিন পাওয়া যায় তাকে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন বলা হয়। দুধ, দই, ছানা, মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদি হলো প্রাণিজ প্রোটিন। বিভিন্ন প্রকার ডাল, মটরশুঁটি, বরবটি, সিম, সিমের বীচি, চীনাবাদাম ইত্যাদি হলো উদ্ভিজ্জ প্রোটিন। দেহের বৃদ্ধির জন্য এ দু’প্রকার প্রোটিনই প্রয়োজন হয়। কম খরচের প্রোটিন হিসেবে আমরা ডালকে গ্রহণ করতে পারি। মাছ অথবা মাংসের দাম বেশি বলে সব সময় তা খাওয়া যায় না। তবুও যদি সপ্তাহে দু’দিন অল্প পরিমাণে ছোট মাছ খাওয়া যায়, তবে প্রাণিজ প্রোটিনের চাহিদা অনেকাংশে পূরণ হয়। চালের প্রোটিন ও ডালের প্রোটিন একত্রিত হয়ে উন্নতমানের প্রোটিন তৈরি হয়। তাই ভাত ও ডাল একত্রে খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ভাল। প্রতিদিন ভাতের সাথে প্রচুর ডাল খাওয়ার অভ্যাস করলে স্বাস্থ্য ভাল থাকবে এবং দেহের বৃদ্ধি পাবে।
প্রোটিন জাতীয় খাদ্যের সাথে প্রয়োজনীয় ভিটামিন না পেলে কিশোরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমে যায়। কিশোরীদের শরীরে ভিটামিন ‘এ’র অভাব যাতে না হয় সে জন্য তাদের প্রচুর পরিমাণে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, কলিজা, মাখন এবং গাঢ় সবুজ ও হলুদ রঙের শাক-সবজি ও ফলমূল বিশেষ করে পাকা আম, পেঁপে, কাঠাঁল, কলা, পেয়ারা, আনারস, কচুশাক, পুইশাক, ডাঁটাশাক, লালশাক, বাঁধাকপি, টমেটো, মিষ্টিকুমড়া ইত্যাদি খেতে হবে। কৈশোর বয়সে বিভিন্ন রকম খনিজ লবণের প্রয়োজন হয়। এর ভেতরে ক্যালসিয়াম ও লৌহ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। গুড়, ডিম, দুধ, দই, শুঁটকি মাছ, ডাল, কাঁটাসহ ছোট মাছ ইত্যাদিতে বেশি ক্যালসিয়াম আছে। ক্যালসিয়ামের অভাব হলে মেয়েদের কোমরের হাড় ঠিকমত বড় হয় না। হাত পায়ের হাড়ও ঠিকমতো বড় হয় না। এর ফলে কিশোরী মেয়েরা বেশি লম্বা হয় না। যে সব মেয়েরা পাঁচ ফুটের বেশি লম্বা হয় না তাদের সন্তান প্রসবে কষ্ট হয়। অনেক সময় মা ও শিশু উভয়ে মারাও যেতে পারে। এজন্য মেয়েদের কমপক্ষে ৫ ফুটের বেশি লম্বা হওয়া প্রয়োজন। কৈশোর বয়সে ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খেলে মেয়েরা লম্বা হয়। গুড় একটি খুব ভাল ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার। প্রত্যেকদিন গুড়  দিয়ে রুটি, মুড়ি, চিড়া, অথবা অন্য যে কোন খাবার খাওয়া খুব ভাল। এক গ্লাস দুধে যে পরিমাণ ক্যালসিয়াম আছে, এক চামচ ঝোলা গুড়ে সেই পরিমাণ ক্যালসিয়াম থাকে। প্রতিদিন এক চা চামচ করে ঝোলা গুড় তিনবার করে খেলে শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাব হয় না।
সাধারণতঃ ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কম থাকে। আমাদের দেশের অধিকাংশ কিশোরীই ঋতুচক্র শুরু হলে রক্তস্বল্পতায় ভোগে। এই ঘাটতি পূরণের জন্য কচুশাক, লাউশাক, পাটশাক, লালশাক, পালংশাক, ডাঁটাশাক, পুইশাক ইত্যাদি সকল প্রকাল সবুজ শাক-সবজিতে প্রচুর লৌহ আছে। গুড়, কলিজা, ডিম, শুঁটকি মাছ ইত্যাদিতেও  প্রচুর লৌহ জাতীয় পুষ্টি উপাদান থাকে। লৌহ সমৃদ্ধ খাবার খেলে শরীরে রক্ত হয়। রক্ত কম থাকলে দেহের বৃদ্ধি হয় না। দেহের সুষ্ঠু বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত প্রতিদিন সবুজ শাক-সবজি খাওয়া প্রয়োজন। ভিটামিন ‘সি’ জাতীয় খাবার লৌহকে দেহের ভেতরে যেতে সাহায্য করে। তাই কিশোরীরা যদি প্রতিদিন নিয়মিত একটু ভিটামিন ‘সি’ বা টক জাতীয় খাবার যথা- আমলকি, পেয়ারা, লেবু, আমড়া, কামরাঙ্গা, কুল ইত্যাদি খায় তবে রক্তস্বল্পতা খুব সহজেই দূর করতে পারবে। পানি পরিপাক ক্রিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য উপকরণ। স্বাভাবিক হজমের জন্য প্রচুর পানি পান করা উচিত। এছাড়া পূর্ণ বয়স্কদের তুলনায় কিশোরীরা ছুটাছুটি বেশি করে বলে তাদের শরীর থেকে অতিরিক্ত ঘাম নির্গত হয়। দেহে পানির সমতা ঠিক রাখার জন্য কিশোরীদের প্রতিদিন অন্তত: ৭-৮ গ্লাস আর্সেনিকমুক্ত বিশুদ্ধ পানি ও তরল খাবার গ্রহণ করা উচিত।
এক তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় দেড় কোটিই হলো কিশোরী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানব জীবনের ১০-১৯ বছর পর্যন্ত বয়সকে বলা হয় কিশোর কাল। এদেশের বেশির ভাগ মহিলারই কিশোরী অবস্থায় বিয়ে হয়, যা মোটেও কাম্য নয়। ফলে একজন কিশোরী যৌবন প্রাপ্ত হবার আগেই হন ‘কিশোরী মা’। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কিশোরী মা একজন অপুষ্ট মা। এই অপুষ্ট মায়ের কোল জুড়ে যে সন্তান আসে, সেই সন্তানও হয় অপুষ্ট। ফলশ্রুতিতে মা এবং শিশু উভয়ের জীবন হয় বিপন্ন। এভাবে কিশোরী মা ও শিশুর মৃত্যুহার বেড়ে যায়। তাই কিশোরী অবস্থায় কোনো মেয়ের বিয়ে দেয়াও ঠিক নয়। আঠারো বছরের পর বিয়ে দিলে মা এবং সন্তানের অপুষ্টিতে ভোগার আশঙ্কা কমে যায়।
তাছাড়া কিশোরীর পুষ্টি নিশ্চিত করতে কিশোরী কন্যা সন্তাকে তার সমবয়সী একজন কিশোর ছেলে সন্তানের ন্যায় একই পরিমাণ পুষ্টিকর খাবার খেতে দেয়া উচিত। শিক্ষা মানব জীবনকে সার্থক ও সুন্দর করে। তাই মেয়েদের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য লেখাপড়া শেখার জন্য ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই স্কুলে পাঠাতে হবে। মেয়েরা শিক্ষিত হলে তারা সুন্দরভাবে সংসার পরিচালনা করতে পারে। তাদের সন্তানদের ভালভাবে যতœ নেয়া এবং পরিবারের সকলের খাদ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্যের প্রতিও লক্ষ্য রাখতে পারে। কাজেই পুষ্ট এবং সুস্থ-সবল ও শিক্ষিত জাতি গঠন কিশোরী মেয়েদেরকে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার ও আদর-যতœ দিয়ে তাদের লালন-পালনের প্রতি সকল মা-বাবারই আরও সচেষ্ট ও সচেতন হওয়া উচিত। লেখক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা