শিশু থেকে বঙ্গবন্ধু

নাহিমা সুলতানা

বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তিনি ভাষা-সৈনিক। তিনি বাঙালি জাতির পিতা। বাঙালির অধিকার ও স্বতন্ত্র মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে, এদেশের গণমানুষের মুক্তির জন্য পরিচালিত সকল আন্দোলনের তিনিই ছিলেন প্রধান চালিকাশক্তি। তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালে আমরা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছি এবং দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশন্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করেছি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। তিনি বজ্রকন্ঠের অধিকারী। তিনি সেই সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাপাঁ মহান পুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান। এ-জাতির ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর অবদান ও আত্মত্যাগ চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে।
বাংলাদেশর অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭মার্চের এক শুভক্ষণে গোপালগঞ্জ (সাবেক ফরিদপুর) জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতার নাম শেখ লুৎফর রহমান ও মাতার নাম সায়েরা খাতুন। তাঁর ডাকনাম খোকা।
তিনি গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। অত:পর ১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জ এস.এম. মডেল হাই স্কুল থেকে মাট্রিক পাস করেন। বিএ পাস করেন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে। ১৯৪৭ সালে ঢাকায় এসে তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে কিছুদিন আইনশাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন। আশৈশব রাজনীতিতে তার ছিল ভীষণ নেশা। সম্ভবত সে কারণেই লেখাপড়ায় কৃতিত্ব প্রদর্শন তাঁর  ভাগ্যে জোটেনি।
বঙ্গবন্ধু ছোটদের ভালোবাসতেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিজের চোখে দেখে শিশুরা প্রায় তিনশত ছবি আঁকায় এর মধ্যে বাছাই করা ৭০টি ছবি দাদা ভাই রোকনুজ্জামান দেখায় বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধু ছবিগুলো দেখে শিশুদেরকে খুবই প্রশংসা করলেন। তিনি শিশুদের সঙ্গে সে দিন প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা কাটান এবং যতেœর সাথে খাবার পরিবেশন করেন।
১৯৪০ সালে শেখ মুজিবর রহমান রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এ সময় তিনি নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশন ও অল বেঙ্গল মুসলিম ছাত্রলীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। দেশ বিভাগের পর পরই তিনি মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। প্রথম ভাষা আন্দোলনের সময় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় শেখ মুজিবর রহমান কারাগারে বন্দি থেকে আন্দোলনের প্রতি তিনি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করেন এবং ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনশন ধর্মঘাট করেন। ১৯৫৩ সালে মুক্তিলাভের পর তিনি আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারী নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালের জুন মাসে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য এবং ১৯৫৬ সালে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান মন্ত্রিসভায় শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতি দমন ও শ্রম উন্নয়ন দফতরের মন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৫৮ সালে দেশে সামরিক আইন জারি হলে শেখ মুজিবুর রহমান নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হন। ১৯৬২ সালে জনাব সোহরাওয়াদীর গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজের বীরত্বপূর্ণ আন্দোলন শুরু হলে তিনি আবার বন্দি হন এবং দীর্ঘদিন কারাবরণ করেন।
তিনি ছাত্রজীবন থেকেই দেশ ও দেশের মানুষকে গভীরভাবে ভালোবসতেন। ছাত্রজীবনেই তিনি শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী এবং সুভাষচন্দ্র বসুর সান্নিধ্য লাভ করেন ও রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষার দাবিতে ধর্মঘট ডাকা হলে শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, আজী গোলাম মাহবুবসহ অধিকাংশ নেতা গ্রেফতার হন। বার বার তাঁকে জেলে যেতে হয়। ১৯৬৬ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলের এক সম্মেলনে ৬ দফা কর্মসূচি উপস্থাপন করেন। ৬ দফা আন্দোলনকে দমন করার জন্য পাকিস্থানি শাসকেরা ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা মামলা দায়ের করে। দীর্ঘকাল বঙ্গবন্ধ বাঙ্গালির অধিকার আদায়ের জন্য  সংগ্রাম করেছেন।
১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদের নির্বিচারে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একক বিজয় লাভ করেন। কিন্তু পাকিস্তানি সরকার ক্ষতা না দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করে। ৭ মার্চ, ১৯৭১-এ তিনি ঘোষণা-‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবাবের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, ২৫ মার্চ রাতে তাকেঁ গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পূর্বেই অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে ওয়ারলেস বার্তায় তিনি বাংলাদেশর স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদের রক্ত ২ লাখ বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাংলাদেশকে স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন দেশে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহন করেন। ধ্বংসের উপর নতুন করে দেশ গঠনের কাজ শুরু করেন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুথানের ফলে আইয়ূব খান আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে সব রাজবন্দিকে নি:শর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হন। কারামুক্ত শেখ মুজিবকে ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে বিশাল গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। এ ঐতিহাসিক জন সভায় বাংলার বিপ্লবী ছাত্র সমাজ তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের শতকরা প্রায় আশি ভাগ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়। কিন্তু তাঁকে সরকার গঠন করতে দেওয়া হয় না। ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ জনতার সামনে দাঁড়িয়ে জাতিকে স্বাধীনতা যুদ্ধের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেন।
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু করে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ড। সেই রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। গ্রেপ্তারের পূর্বে অর্থাৎ ২৬ মার্চ ১৯৭১ প্রথম প্রহরেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণ। নয় মাস যুদ্ধের পর ত্রিশ লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় বাঙালির বিজয়।
আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্থান সরকার আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। ফলে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীরা সহিংস অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল চূড়ান্ত অর্জন। আন্দোলনের চরম পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধের সূচনা হয়। নয় মাস চলার পর দেশ স্বাধীনতা লাভ করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি রাষ্ট্র প্রধান হন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্যের আগমনে ও নিষ্ঠুর আঘাতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিারের শহীদ হন। টুঙ্গিপাড়ায় পারিবারিক গোরস্তানে তাকে সমাহিত করা হয়। যে মাটির সান্নিধ্যে ও যে প্রকৃতির পরিচর্যায় তিনি জন্মগ্রহন করেছিলেন, বেড়ে উঠেছিলেন, সেই মাটির সান্নিধ্যে, প্রকৃতির শীতল স্নেহে ও একান্ত স্পর্শে তিনি শেষশয্যা গ্রহন করেছেন।
২০১২ সালে প্রমানিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু বৈচিত্রময় জীবনের অসাধারণ এক খন্ডাংশ আত্মজীবনী। কারাগারে বসে রচিত আত্মচরিতমূলক এই গ্রন্থ তার রাজনৈতিক জীবনের পেক্ষিতে পরিপূর্ণ এক বাংলাদেশের চিত্র ফুটে উঠেছে। এই গ্রন্থে আমরা অন্য এক মাহাত্ম্যে সমুজ্জ্বল বঙ্গবন্ধুর সন্ধান পাই। দেশপ্রেমিক প্রতিটি বাঙালি হৃদয় চির অম্লান হয়ে রয়েছে একটি নাম শেখ মুজিবুর রহমান।
কবি অন্নদাশংকারের ভাষায় বলতে হয়-
যত দিন রবে পদ্মা মেঘনা
গৌরী যমুনা বহমান
ততদিন রবে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবুর রহমান।
দ্বিধাবিভক্ত পরাধীন জাতীকে সুসংগঠিত করে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করা এবং সঠিক নেতৃত্বে দেওয়া সহজ কাজ নয়। অথচ এই কঠিন কাজটি বঙ্গবন্ধু খুব সহজেই করতে পেরেছিলেন। স্বাধীকার থেকে স্বাধীরনতার সংগ্রাম সবই পরিচালনা করেছেন শেখ মুজিবুর রহমান অসীম দক্ষতা ও যোগ্যাতায়। তার ছিল মানুষকে উদুদ্ধ করার মত অসাধারণ বজ্র কণ্ঠ। অনলবর্ষী বক্তা হিসাবে তার ছিল বিপুল খ্যাতি। এই প্রমান পাওয়া যায় তার ৭ মার্চ এর ভাষণে। অকৃত্রিম দেশপ্রেম, সাধারণ জনগনের প্রতি গভীর ভালবাসা, অমায়িক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত বুদ্ধি তাকে বাঙাগি জাতির অবিসংবাদিত নেতায় পরিনত করেছে। স্বাধীনতার পর তিনি বেশি দিন ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পাইনি। যতটুকু সময় ক্ষমতায় ছিলেন তিনি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে পুনগঠনের উদ্দেগ গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালের ১২ ই জানুয়ারি ক্ষমতা লাভের পর কিছুদিনের মধ্যে ভারতীয় বাহিনীর দেশ ত্যাগ করা এবং মুক্তি বাহিনীর অস্ত্র সমর্পন করার ঘোষানা দেন। বিশ্বের ১০৪ টি দেশ স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য পদ জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন ও ইসলামী সম্মেলন সংস্থার সদস্য পদ লাভ করে বঙ্গবন্ধুর আমলে। ১৯৭২ সালে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের নতুন সংবিধান কার্যকর হয়। তার সরকারের সময় ব্যাংক, বিমা সহ শিল্পকারখানার জাতীয়করন করা হয়। ১৯৭৪ সালে তিনি জাতীয় সংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথম বাংলায় বক্তৃতা করেন। তার নেতৃত্বে অর্জিত হয়েছিল বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা বাঙালির জাতীর জীবনে সূচনা করেছে এক নবদিগন্ত। আতœ পরিচয়হীন জাতী খুঁজে পেয়েছে তার অস্তিত্ব ও আত্মমর্যাদা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে যার নাম উজ্জল নক্ষত্রের মতো দীপ্যমান তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবার বহমান। তার দূরদর্শী বিচক্ষণ এবং সঠিক নেতৃত্বেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। তিনি সবকালের সর্বশ্রেষ্ট এবং স্বাধীন বাঙালি জাতির জনক। তিনি নিজের স্বার্থকে কখনোই প্রাধান্য দেননি জাতির কল্যাণের কথাই তিনি সবসময় ভেবেছেন। জেল জলুম ও নির্যাতনের কাছে তিনি কখনো মাথা নত করেননি। সমস্ত জাতিকে তিনি মুক্তি ও স্বাধীনতার চেতনায় ঐক্যবদ্ধ ও উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তার আতœত্যাগ জাতিকে মহান মর্যাদায় অধিষ্টিত করেছে। বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন করে দেওয়া বাঙালি জাতির অস্তিত্বকে অস্বীকার করার শামিল। ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘বাংলাদেশ’ আজ সমগ্র বাঙালিজাতির কাছে এক ও অভিন্ন নাম। নাহিমা সুলতানা, শ্রেণি-১০ম, সাতক্ষীরা আয়েন উদ্দীন মহিলা আলিম মাদ্রাসা