পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বন


প্রকাশিত : মার্চ ২২, ২০১৭ ||

প্রকাশ ঘোষ বিধান
জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনের গুরুত্ব অপরিসিম। বন ছাড়া জীববৈচিত্র্য তার অস্তিত্ব টিকে রাখতে পারে না। পৃথিবীতে জীবন্ত যা কিছু আছে তাকে প্রধানত ২ ভাগে ভাগ করা যায়। যা জীব জগৎ ও প্রাণি জগৎ। মানুষ ও জীববৈচিত্র্য হচ্ছে প্রকৃতির সন্তান। উদ্ভিদ ও প্রাণি তথা জীববৈচিত্র্যের একমাত্র আশ্রয়স্থল হচ্ছে বন। বন মহাকালের সৃষ্টি, এতে মানুষের কোন হাত নেই। কিন্তু মানুষের অপরিনামদর্শী কর্মকান্ডের কারনে জীববৈচিত্র্য আজ বিলুপ্তির পথে।
বন সুরক্ষায় ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন ২১ মার্চ বিশ্ব বন দিবস পালন করছে। বিশ্বব্যাপী শিল্প বিপ্লবের পর থেকে পরিবেশ দূষণ শুরু হয়। বর্তমানে পরিবেশ দূষণে পৃথিবীর প্রায় সব মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হতে চলেছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে জীববৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। কিন্তু আজ বিশ্ব জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখিন। বিশ্বের মোট ভূমির পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার মিলিয়ন হেক্টর। মোট ভূমির ৭৮ ভাগ চাষাবাদের অনুপযোগী, ২২ ভাগ ভূমি চাষাবাদ যোগ্য। ২০০ বছর আগেও বিশ্বের ৪৭ ভাগ এলাকা বন ভূমিতে পরিবেষ্টিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে ২৯ ভাগ এলাকা বনভূমি রয়েছে। পরিবেশের ভারাসাম্য রক্ষার জন্য একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশে মোট বনভূমির পরিমান রয়েছে ১৭.৪ ভাগ। দেশের মোট আয়তন ১লাখ ৪৮ হাজারা ৩৯৩ বর্গকিলোমিটার এর মধ্যে বনাঞ্চল ২৩হাজার ৯’শ ৯৮বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা চাহিদার তুলনায় বনভূমির পরিমাণ খুবই কম। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছড়ানো-ছিটানো যে অল্প বনভূমি রয়েছে তাও মানুষ নির্বিচারে কেটে সাবাড় করছে। দেশের মানুষের কাঠ ও জ্বালানি কাঠের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে গিয়ে বনভূমি দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে। শুধু বাংলাদেশই নয়, সারা পৃথিবী থেকে দ্রুত বনভূমি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। প্রতি মিনিটে পৃথিবী থেকে ১৯০ একর বন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান নগরায়ন ও শিল্পায়নের প্রয়োজনে পরিবেশ তথা বন ধ্বংস হবার মূল কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।
পৃথিবীর প্রায় ১০০টির বেশী দেশ মরুময়তার শিকার। ড্রাইলান্ডের ৭০ ভাগ ভূমি আজ বন হারিয়ে যাওয়ায় মরুময়তায় চলে যাচ্ছে। এর আয়তন প্রায় ৩.৬ বিলিয়ন হেক্টর। এশিয়ার প্রায় মিলিয়ন হেক্টর জমি মরু বিস্তারের সম্মুখিন। অষ্ট্রেলিয়া সহ অন্যান্য দেশে প্রায় ২.৬ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার মরুভূমির সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবছর এ মরুভূমির ৩-৪ কিলোমিটার করে বাড়ছে। ভারতের থর মরুভূমি প্রতি বছর প্রায় ১ কিলোমিটার বাড়ছে। মানুষের বিভিন্ন কর্মকান্ডের ফলে পৃথিবীর ১০ ভাগ বনও তৃণভূমি মরুময়তার শিকার হচ্ছে, আর ২৫ ভাগ হুমকির সম্মুখীন। প্রতি মিনিটে মরুভূমি গ্রাস করছে ৪৪ হেক্টর উর্বর জমি এবং ২০ হেক্টর বনভূমি বিরান হচ্ছে। বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলে ব্যাপক হারে বন উজাড়ের ফলে মরুময়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পরিবেশ ও বন বিশেষজ্ঞদের ধারনা আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর তাপমাত্রা ১.৫ হতে ৪.৫ সে. সি. বেড়ে যাবে। ফলে মেরু অঞ্চলের জমাট বাধা বরফ পুঞ্জ গলতে শুরু করবে এবং সমুদ্রের পানি উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী সমুদ্র উপকুলীয় নিচু অঞ্চলগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাবে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা যদি ১ থেকে দেড় মিটার বৃদ্ধি যায় তবে বাংলাদেশের উপকুলীয় অঞ্চল সহ এক তৃতীয়াংশ এলাকা বঙ্গপোসাগরের পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। অপর দিকে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মরু অঞ্চল বৃদ্ধি পাবে। উর্বর জমির পরিমান কমে যাবে এবং দেখা দিবে খাদ্যাভাব। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘুর্নিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পরিমাণ বেড়ে যাবে।
ঘুর্নিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ব্যাপক ক্ষতি থেকে বন আমাদের রক্ষা করে। বঙ্গপোসাগরের তীরে গড়ে উঠা ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ভয়ংকর ঘুর্নিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে বার বার উপকুলবাসীকে মায়ের মত আগলে রেখেছে। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাবতীয় প্রয়োজন মিটিয়ে আসছে বৃক্ষ। সভ্যতার সূচনা লগ্ন থেকে বিশ্বের মানুষ ও প্রাণির অস্তিত্ব রক্ষায় বৃক্ষের ভূমিকা অপরিসীম। পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষনে প্রয়োজন বন সু-রক্ষা এবং বনায়ন কার্যক্রম গতিশীল করা। আমাদের জীবন বাচানোর তাগিদে বন সু-রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। তাহলে এ পৃথিবীতে আমরা পাবো দূষণমুক্ত জীববৈচিত্র্য ভরপুর নির্মল পরিবেশ।